মানিকগঞ্জের সাটুরিয়া উপজেলার ভাঙ্গাবাড়ি গ্রামের দর্জি আলী হোসেনের স্ত্রী আলেয়া বেগম (৪৩) দীর্ঘদিন ধরে মানসিকভাবে অসুস্থ। প্রায় তিন মাস আগে তিনি হঠাৎ বাড়ি থেকে নিখোঁজ হন। এরপর আত্মীয়স্বজনের বাড়ি থেকে শুরু করে রেলস্টেশন, মাজার, হাসপাতাল, পথঘাট, কোথাও খোঁজা বাদ রাখেননি আলী হোসেন। অবশেষে সামাজিক মাধ্যমের একটি ভিডিওর সূত্র ধরে তিন মাস পর স্ত্রীকে ফিরে পেয়েছেন তিনি।
গত ২৭ সেপ্টেম্বর পাশের সিংগাইর উপজেলার গোবিন্দল এলাকায় রাস্তার পাশে এক অসহায় নারীকে ঘোরাঘুরি করতে দেখেন স্থানীয় কনটেন্ট ক্রিয়েটর রবিউল হক। তিনি "ভয়েস অব রবিউল ভাই" পেজে ওই নারীর দুই মিনিটের একটি ভিডিও প্রকাশ করেন। ভিডিওটি সামাজিক মাধ্যমে ছড়িয়ে পড়লে পরদিন ২৮ সেপ্টেম্বর তা আলী হোসেনের চোখে পড়ে।
ভিডিও দেখে তিনি বুঝতে পারেন, রাস্তার পাশের ওই নারী তার স্ত্রী আলেয়া। সঙ্গে সঙ্গে তিনি সিংগাইরে ছুটে যান। তিন মাস পর স্ত্রীকে সামনে পেয়ে আবেগ ধরে রাখতে পারেননি আলী হোসেন, জড়িয়ে ধরে কান্নায় ভেঙে পড়েন। আলেয়াও স্বামীকে চিনতে পারেন। ওই মুহূর্তের আবেগঘন দৃশ্য উপস্থিত লোকজনকেও আপ্লুত করে।
পরিবার জানায়, আলী হোসেন ২০০১ সালে আলেয়া বেগমকে বিয়ে করেন। তাদের দুই ছেলে ও এক মেয়ে রয়েছে। প্রায় ছয় বছর আগে আলেয়া প্রথম মানসিকভাবে অসুস্থ হয়ে পড়েন। তখন ঢাকার একটি মানসিক হাসপাতালে চিকিৎসা নিয়ে তিনি সুস্থ হয়ে বাড়ি ফেরেন। তবে তিন বছর আগেও একবার নিখোঁজ হয়েছিলেন, সেবার ৯ দিন পর তাঁর সন্ধান মেলে। সর্বশেষ প্রায় তিন মাস আগে তিনি আবারও বাড়ি থেকে নিখোঁজ হন।
আলী হোসেন বলেন, "প্রায় তিন মাস ধরে আত্মীয়স্বজনের বাড়ি, হাটবাজার, বাসস্ট্যান্ডসহ সব জায়গায় খুঁজেও তার কোনো সন্ধান পাইনি। বাধ্য হয়ে পোস্টারিং করে নিখোঁজের খবরও প্রচার করি। স্ত্রীকে না পেয়ে খুব দুশ্চিন্তায় দিন কাটছিল।"
স্থানীয়রা জানান, আলেয়া নিজের নাম-ঠিকানাও ঠিকমতো বলতে পারছিলেন না। গোবিন্দল এলাকার মানুষ তাকে কয়েক দিন ধরে রাস্তায় ঘোরাঘুরি করতে দেখেছেন। কখনো মানুষের কাছে খাবার চেয়ে খেতেন, রাত কাটাতেন রাস্তার পাশেই।
আলী হোসেন আরও বলেন, "ফেসবুকে ভিডিওটি দেখার পর এক মুহূর্তও দেরি করিনি, পরদিনই সেখানে ছুটে যাই। গিয়ে দেখি সত্যিই আমার স্ত্রী! আমাকে দেখেই সে চিনতে পারে। তিন মাসের সব কষ্ট এক নিমেষেই দূর হয়ে যায়। স্ত্রীকে উদ্ধার করে সন্তানদের কাছে ফিরিয়ে দিতে পেরেছি, এটাই আমার সবচেয়ে বড় আনন্দ।"
আলেয়াকে সাটুরিয়া উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে ভর্তি করা হয়েছে। পরিবারের ভাষ্য, তিনি এখন মানসিকভাবে অনেকটাই সুস্থ এবং পরিবারের সদস্যদের চিনতে পারছেন। চিকিৎসক ডা. মোহাম্মদ মনিরুজ্জামান জানান, আলেয়ার প্রাথমিক চিকিৎসা চলছে। উন্নত চিকিৎসার জন্য তাঁকে মানসিক রোগ বিশেষজ্ঞ দেখানোর পরামর্শ দেওয়া হয়েছে।
আলেয়ার ছেলে মাহফুজুর রহমান বলেন, "মাকে হারিয়ে এই তিন মাসে আমাদের পরিবারের সুখ-শান্তি শেষ হয়ে গিয়েছিল। এক পর্যায়ে আশাই ছেড়ে দিয়েছিলাম। সামাজিক মাধ্যমের একটি ভিডিও আজ মাকে আমাদের কাছে ফিরিয়ে দিয়েছে।"
ভিডিও নির্মাতা রবিউল হক বলেন, "রাস্তার পাশে অসহায় নারীটিকে দেখে তাকে পরিবারের কাছে ফিরিয়ে দেওয়ার কথা মনে হয়েছিল। সেই ভাবনা থেকে ভিডিওটি বানিয়ে ফেসবুকে প্রকাশ করি। শেষ পর্যন্ত ওই নারীর স্বামী এসে তাঁকে নিয়ে যাওয়ায় আমি নিজেও আবেগাপ্লুত। পরিবারের কাছে এটিই সবচেয়ে বড় আনন্দের বিষয়, আর আমার ভিডিও করাটাও সার্থক হয়েছে।"
আলেয়া ফেরার পর ভাঙ্গাবাড়ি গ্রামে আলী হোসেনের বাড়িতে গিয়ে দেখা যায়, স্বজনেরা আলেয়াকে ঘিরে আছেন। খবর পেয়ে প্রতিবেশীরাও তাঁকে দেখতে আসছেন। দীর্ঘদিন বাড়ির বাইরে থাকায় পরিবারের সদস্যরা তাঁর শারীরিক ও মানসিক স্বাস্থ্যের প্রতি বাড়তি নজর রাখছেন।
শুক্রবার সন্ধ্যায় স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে আলেয়া বেগম বলেন, "স্বামী ও সন্তানদের কাছে পেয়ে আমি এখন অনেকটাই সুস্থ বোধ করছি।"