চলতি বছরের জুলাই থেকে সেপ্টেম্বর-এই তিন মাসে দেশে মব সহিংসতা ও গণপিটুনির ১৩৭টি ঘটনায় নিহত হয়েছেন অন্তত ৫৪ জন, আহত হয়েছেন ১৪৫ জন। এ ছাড়া তিন মাসে কারাগারে ৩৭ বন্দীর মৃত্যু হয়েছে।
একই সময়ে রাজনৈতিক সহিংসতার ১৮৩টি ঘটনায় ১৭ জন নিহত হয়েছেন। আহত হয়েছেন ১ হাজার ২২৭ জন।
সোমবার (১২ অক্টোবর) মানবাধিকার সংগঠন হিউম্যান রাইটস সাপোর্ট সোসাইটির (এইচআরএসএস) প্রকাশিত প্রতিবেদন থেকে এ তথ্য জানা যায়। সংস্থাটির ত্রৈমাসিক মানবাধিকার পর্যবেক্ষণ প্রতিবেদনে এসব তথ্য উঠে এসেছে।
সংগঠনটি জানায়, দেশের ১৬টি জাতীয় গণমাধ্যমে প্রকাশিত সংবাদ, নিজস্ব তথ্য সংগ্রহ এবং অনুসন্ধানী প্রতিবেদন বিশ্লেষণ করে ২০২৬ সালের জুলাই-সেপ্টেম্বরের মানবাধিকার পরিস্থিতি নিয়ে এ প্রতিবেদন তৈরি করা হয়েছে।
প্রতিবেদনে বলা হয়, রাজনৈতিক সহিংসতার ১৮৩টি ঘটনার মধ্যে ৬৯টি ছিল বিএনপির অভ্যন্তরীণ কোন্দল। এসব ঘটনায় আহত হয়েছেন অন্তত ৫৪০ জন, নিহত হয়েছেন ৯ জন। বিএনপি ও জামায়াতের মধ্যে সংঘর্ষের ৩১টি ঘটনায় আহত হয়েছেন ৩৩৮ জন, নিহত হয়েছেন একজন। বিএনপি ও আওয়ামী লীগের মধ্যে সংঘর্ষের ১৬টি ঘটনায় আহত হয়েছেন ৮১ জন, নিহত হয়েছেন দুজন।
এ ছাড়া বিএনপি ও এনসিপির মধ্যে সংঘর্ষের ১৪টি ঘটনায় আহত হয়েছেন ৭০ জন। বিএনপি ও অন্যান্য দলের মধ্যে সংঘর্ষের ৩১টি ঘটনায় আহত হয়েছেন ৬৯ জন। বিভিন্ন দলের মধ্যে আরও ১৯টি সংঘর্ষের ঘটনায় আহত হয়েছেন ১২৬ জন, নিহত হয়েছেন তিনজন। আওয়ামী লীগের অভ্যন্তরীণ কোন্দলের একটি ঘটনায় একজন নিহত হয়েছেন।
প্রতিবেদনে বলা হয়, তিন মাসে নির্বাচনকেন্দ্রিক অন্তত ছয়টি সহিংসতার ঘটনায় আহত হয়েছেন কমপক্ষে ৪৫ জন। এর মধ্যে বিএনপির অভ্যন্তরীণ কোন্দলের চারটি ঘটনায় আহত হয়েছেন অন্তত ৩৬ জন। বিএনপি ও জামায়াতের মধ্যে সংঘর্ষের দুটি ঘটনায় আহত হয়েছেন ৯ জন।
জুলাই থেকে সেপ্টেম্বর পর্যন্ত চুরি, ডাকাতি, ছিনতাই, বাগ্বিতণ্ডা, আধিপত্য বিস্তার, ধর্মীয় অবমাননা, ধর্ষণ ও ধর্ষণচেষ্টাসহ বিভিন্ন অভিযোগে গণপিটুনি ও মব সহিংসতার ১৩৭টি ঘটনা ঘটেছে। এসব ঘটনায় নিহত হয়েছেন অন্তত ৫৪ জন, আহত হয়েছেন ১৪৫ জন।
সাংবাদিক নির্যাতন ও হয়রানির ৮৮টি ঘটনায় ১৩৫ জন সাংবাদিকের আক্রান্ত হওয়ার তথ্য দিয়েছে এইচআরএসএস। তাদের মধ্যে ৬৩ জন আহত হয়েছেন, ২৭ জন লাঞ্ছিত হয়েছেন এবং ১৮ জন হুমকির মুখে পড়েছেন। আটক করা হয়েছে ৯ জনকে। সাইবার সুরক্ষা আইনে চারটি মামলায় ১৮ জন সাংবাদিককে অভিযুক্ত করা হয়েছে।
প্রতিবেদনে আরও বলা হয়, সভা-সমাবেশ আয়োজনের ক্ষেত্রে ১৮টি ঘটনায় আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষভাবে বাধা দিয়েছে। এতে ১২৮ জন আহত এবং ৮ জন আটক হয়েছেন।
সাইবার সুরক্ষা আইন-২০২৬-এর বিভিন্ন ধারায় পৃথক ১০টি মামলায় ৩২ জনকে অভিযুক্ত এবং ১১ জনকে গ্রেপ্তারের তথ্যও প্রতিবেদনে তুলে ধরেছে সংগঠনটি।
প্রতিবেদনে আরও বলা হয়, গত তিন মাসে ৭৮৩ জন নারী ও কন্যাশিশু নির্যাতনের শিকার হয়েছেন। তাদের মধ্যে ধর্ষণের শিকার হয়েছেন অন্তত ২৫৩ জন। ধর্ষণের শিকার ব্যক্তিদের মধ্যে ১৫৪ জনের বয়স ১৮ বছরের কম। এ ছাড়া ৪২ জন গণধর্ষণের শিকার হয়েছেন। ধর্ষণের পর হত্যা করা হয়েছে ১২ জনকে এবং ধর্ষণের শিকার হয়ে আত্মহত্যা করেছেন একজন।
যৌন নিপীড়নের শিকার হয়েছেন ২২০ জন নারী ও কন্যাশিশু, যাদের মধ্যে ১০৩ জন শিশু। যৌতুকের কারণে নির্যাতনের ঘটনায় ১৩ জন নারী নিহত ও ১৭ জন আহত হয়েছেন। এ ছাড়া দুজন আত্মহত্যা করেছেন।
পারিবারিক সহিংসতায় নিহত হয়েছেন ১৩৭ জন নারী, আহত হয়েছেন ৬৮ জন এবং আত্মহত্যা করেছেন ৭২ জন। এসিড সহিংসতায় আহত হয়েছেন একজন নারী।
তিন মাসে ৭৩৩ জন শিশু নির্যাতনের শিকার হয়েছে। তাদের মধ্যে ১৮৯ জন প্রাণ হারিয়েছে এবং ৫৪৪ জন শারীরিক ও মানসিক নির্যাতনের শিকার হয়েছে।
সংস্থাটির প্রতিবেদন অনুসারে, তিন মাসে দেশের বিভিন্ন কারাগারে ৩৭ জন বন্দীর মৃত্যু হয়েছে। তাদের মধ্যে ১৪ জন কয়েদি এবং ২৩ জন হাজতি। এ ছাড়া আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর হেফাজতে পাঁচজন এবং নির্যাতনের শিকার হয়ে একজনের মৃত্যুর তথ্য দিয়েছে সংগঠনটি।
এ সময়ে সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের ওপর ছয়টি হামলার ঘটনায় ছয়জন আহত হয়েছেন। দুটি মন্দির, পাঁচটি প্রতিমা ও চারটি বসতবাড়িতে হামলা ও ভাঙচুরের ঘটনা ঘটেছে বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়।
শ্রমিক নির্যাতনের ২৫১টি ঘটনায় নিহত হয়েছেন ৭১ জন, আহত হয়েছেন অন্তত ২৬০ জন। অস্বাস্থ্যকর পরিবেশ ও সুরক্ষাসামগ্রীর অভাবে কর্মক্ষেত্রে দুর্ঘটনায় ১৬৪ জন শ্রমিকের মৃত্যুর তথ্যও প্রতিবেদনে রয়েছে।
মানবাধিকার সংগঠন এইচআরএসএসের তথ্য অনুযায়ী, ভারত-বাংলাদেশ সীমান্তে তিন মাসে ১১টি হামলার ঘটনায় ভারতীয় সীমান্তরক্ষী বাহিনীর (বিএসএফ) হামলায় চারজন নিহত ও চারজন আহত হয়েছেন। বিভিন্ন সীমান্ত থেকে আটক করা হয়েছে ছয়জনকে। সীমান্তবর্তী এলাকায় এক নারীর মরদেহও পাওয়া গেছে।
বাংলাদেশ-মিয়ানমার সীমান্তে চারটি সহিংসতার ঘটনায় একজন আহত ও একজন গুলিবিদ্ধ হয়েছেন; আটক হয়েছেন তিনজন। এ ছাড়া স্থলমাইন বিস্ফোরণে দুজন নিহত ও দুজন আহত হয়েছেন।
এইচআরএসএসের তথ্য অনুযায়ী, দেশের নদী, খাল, জঙ্গল ও পরিত্যক্ত স্থান থেকে মরদেহ উদ্ধারের ২৮৫টি ঘটনায় ৩০২টি মরদেহ উদ্ধারের কথা জানিয়েছে সংগঠনটি। এর মধ্যে ২৯টি মরদেহ বস্তাবন্দী, ৬৭টি ঝুলন্ত অবস্থায় এবং ৪৩টি শরীরে একাধিক আঘাতের চিহ্নসহ পাওয়া গেছে। গলা কাটা অবস্থায় ১৯টি এবং হাত-পা বাঁধা অবস্থায় ১৯টি মরদেহ উদ্ধারের তথ্যও প্রতিবেদনে রয়েছে।
এইচআরএসএসের নির্বাহী পরিচালক ইজাজুল ইসলাম বলেন, ‘‘মানবাধিকার পরিস্থিতির উন্নয়ন, আইনের শাসন প্রতিষ্ঠা এবং গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়া শক্তিশালী করতে রাষ্ট্র ও সমাজের সব স্তরে সমন্বিত উদ্যোগ নেওয়া জরুরি।’’