কীভাবে গড়ে উঠলো সুন্দরবনে ২৪ রিসোর্ট, অনুমোদন দিলো কারা?

খুলনা, বাগেরহাট ও সাতক্ষীরায় সুন্দরবন-সংলগ্ন এলাকায় ইউনিয়ন পরিষদের ট্রেড লাইসেন্স নিয়ে গড়ে উঠেছে ২৪টি রিসোর্ট। পরিবেশগত সংকটাপন্ন এলাকায় (ইসিএ) অবস্থিত হওয়ায় এগুলো পরিবেশগত ছাড়পত্র পায়নি। গত ৪ অক্টোবর রিসোর্টগুলো বন্ধ করে ৩০ দিনের মধ্যে স্থাপনা সরিয়ে নেওয়ার নির্দেশ দিয়েছে পরিবেশ অধিদপ্তর।

সুন্দরবন-সংলগ্ন এলাকায় বাণিজ্যিকভাবে রিসোর্ট নির্মাণ শুরু হয় ২০০৯ সালে সাতক্ষীরায়। ২০১৫ সালে বেসরকারি দাতা সংস্থার সহায়তায় খুলনার দাকোপে নির্মিত হয় ১০টি রিসোর্ট। এর মধ্যে গোলকানন ছাড়া বাকিগুলো বন্ধ হয়ে গেছে। তবে গত তিন-চার বছরে নতুন করে আরও কয়েকটি রিসোর্ট গড়ে উঠেছে।

গত ৪ অক্টোবর পরিবেশ অধিদপ্তর খুলনা জেলা কার্যালয়ের সহকারী পরিচালক মো. হারুন-অর-রশীদ রিসোর্ট মালিকদের লিখিতভাবে রিসোর্টগুলো বন্ধের নির্দেশ দেন। 

যেভাবে তৈরি হলো রিসোর্টগুলো

সুন্দরবনের কোলঘেঁষে তৈরি হওয়া ২৪টি রিসোর্ট কোনও বৈধ অনুমোদন ছাড়াই বেআইনিভাবে গড়ে উঠেছে। কোনো সরকারি কর্তৃপক্ষই এই রিসোর্টগুলো নির্মাণের জন্য চূড়ান্ত পরিবেশগত ছাড়পত্র বা বৈধ অনুমোদন দেয়নি। এ অবস্থায় সুন্দরবনের পরিবেশগত সংকটাপন্ন এলাকায় নিয়মনীতি অমান্য  করে গড়ে ওঠা এই ২৪টি রিসোর্টের কার্যক্রম বন্ধ ও স্থাপনা সরিয়ে নেওয়ার চূড়ান্ত নির্দেশ দেয়।

রিসোর্টগুলো সুন্দরবনের মূল সীমানার ভেতরে নয়, বরং বনের ঠিক বাইরে জনবসতিপূর্ণ এলাকায় ব্যক্তিমালিকানাধীন জমিতে তৈরি করা হয়েছে দাবি করেছেন মালিকরা। নির্দিষ্ট কোনো সমন্বিত নীতিমালা না থাকায় উদ্যোক্তারা নিজেদের মতো করে এসব কটেজ ও রিসোর্ট গড়ে তোলেন।

কবে শুরু হয়েছিল

সুন্দরবনসংলগ্ন এলাকায় বাণিজ্যিকভাবে রিসোর্ট নির্মাণের এই ধারা শুরু হয় মূলত ২০০৯ সাল থেকে। পরবর্তীতে পর্যটকদের আনাগোনা বৃদ্ধি পাওয়ায় একের পর এক কংক্রিটের ও টালির ঘর তৈরি করে ব্যবসার প্রসার ঘটানো হয়। ২৪টি রিসোর্টের মধ্যে ১৮টি খুলনার দাকোপ উপজেলার (ঢাংমারী, কৈলাশগঞ্জ ও বাণীশান্তা এলাকা), চারটি সাতক্ষীরায় এবং দুটি বাগেরহাটে (মোংলা এলাকা) গড়ে উঠেছে।

অনুমোদনের আসল চিত্র ও বর্তমান পরিস্থিতি

রিসোর্ট মালিকদের অনেকেই পরবর্তীতে পরিবেশগত ছাড়পত্রের জন্য আবেদন করেছিলেন। কিন্তু পরিবেশ অধিদপ্তরের চাহিদা অনুযায়ী প্রয়োজনীয় ও বৈধ কাগজপত্র জমা দিতে না পারায় গত ৩০ সেপ্টেম্বর তাদের সব আবেদন বাতিল করে দেওয়া হয়।

খুলনা অঞ্চলের বন বিভাগ জানিয়েছে, রিসোর্টগুলো বনের সীমানার বাইরে ব্যক্তিমালিকানাধীন জমিতে হওয়ায় তাদের সরাসরি আইনি নিয়ন্ত্রণ সীমিত ছিল, যার সুযোগ নিয়েছেন মালিকরা।

যা বলছেন মালিকরা

রিসোর্ট মালিকদের দাবি, ২০১০ সালের জাতীয় পর্যটন নীতিমালা অনুসরণ করেই তারা নিজস্ব জমিতে স্থাপনা নির্মাণ করেছেন। জেলা প্রশাসনের অনুমোদনের জন্য আবেদন করলেও পরিবেশগত ছাড়পত্র না থাকায় তা আটকে আছে। তাদের প্রশ্ন, নিজস্ব জমিতে নির্মিত এসব স্থাপনা উচ্ছেদ করা হবে কীভাবে?

জাতীয় পর্যটন নীতিমালার ৩.২.২ অনুচ্ছেদে সুন্দরবনসহ দেশের বিভিন্ন স্থানে টেকসই ইকো-ট্যুরিজম গড়ে তোলার কথা বলা হয়েছে। এজন্য পরিবেশ ও বন মন্ত্রণালয়ের সঙ্গে সমন্বয় করে ইকো-লজ, ওয়াচ টাওয়ার, ওয়াকওয়ে ও নাইট-হাইকিংয়ের মতো পরিবেশবান্ধব পর্যটনসুবিধা তৈরির পাশাপাশি সুন্দরবনের সম্ভাব্য পর্যটনকেন্দ্র চিহ্নিত করে উন্নয়নের কথা উল্লেখ রয়েছে।

নীতিমালায় সিলেট, চট্টগ্রাম, হাওরাঞ্চল, নদীতীর ও পার্বত্য চট্টগ্রামসহ বিভিন্ন পরিবেশগত সংকটাপন্ন এলাকায়ও সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়, জেলা প্রশাসন, স্থানীয় সরকার ও পর্যটন সংস্থার সমন্বয়ে ইকো-ট্যুরিজম উন্নয়নের উদ্যোগ নেওয়ার কথা বলা হয়েছে।

রিসোর্টগুলোর অবস্থান

পরিবেশ অধিদপ্তরের শনাক্ত করা ২৪টি রিসোর্টের মধ্যে খুলনায় ১৮টি, সাতক্ষীরায় চারটি এবং বাগেরহাটে দুটি রয়েছে।

খুলনার দাকোপ উপজেলার ঢাংমারী, কৈলাশগঞ্জ ও বাণীশান্তা এলাকায় গড়ে ওঠা ১৮টি রিসোর্ট হলো - অরণ্যছায়া, অরণ্যবাড়ী, কেওড়াবন, মায়াবন, গহন, দ্য ফরেস্ট রিট্রিট, নিকুঞ্জ ভ্যালি, লা সিলভা কটেজ, বনবিবি, সুন্দরী, ইরাবতী, বনমালী, গোলকানন, পিয়ালী, ম্যানগ্রোভ, জঙ্গলবাড়ী, বনবাস ও বনলতা ইকো কটেজ।

বাগেরহাটের মোংলা এলাকায় রয়েছে টাইগার পয়েন্ট ও বাদাবন। সাতক্ষীরার চারটি রিসোর্ট হলো বর্ষা রিসোর্ট, সুশীলন রিসোর্ট, ওশান প্যারাডাইস এবং পরিষদ ও প্রসাদ প্যারাডাইস।

রিসোর্টগুলোর অবস্থান বনের মূল সীমানার বাইরে হওয়ায় বন বিভাগের সরাসরি আইনি নিয়ন্ত্রণ সীমিত বলে জানিয়েছে সংশ্লিষ্ট বিভাগ। তবে এসব স্থাপনা থেকে পর্যটকদের অনিয়ন্ত্রিতভাবে বনের ভেতরে প্রবেশ, অতিরিক্ত শব্দ ও আলোর ব্যবহার এবং বর্জ্য ফেলার কারণে সুন্দরবনের পরিবেশ ও বন্যপ্রাণী ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে বলে বন বিভাগের কর্মকর্তারা জানিয়েছেন।

সমন্বিত নীতিমালা কতটা জরুরি

সুন্দরবনের সংবেদনশীল প্রতিবেশব্যবস্থা রক্ষা এবং স্থানীয় অর্থনীতির বিকাশ - দুই দিক বিবেচনায় নিয়ে এসব স্থাপনার জন্য কার্যকর ও সমন্বিত নীতিমালা কতটা জরুরি, এখন সেই প্রশ্ন উঠেছে।

পরিবেশ ও বন বিশেষজ্ঞদের ভাষ্যমতে, সুন্দরবন ঘেঁষে রিসোর্ট নির্মাণ এবং পর্যটকের সংখ্যা বাড়ায় বনের সংবেদনশীল প্রতিবেশব্যবস্থার ওপর চাপ বাড়ছে। অনিয়ন্ত্রিত পর্যটন, অতিরিক্ত শব্দ ও আলো এবং দুর্বল বর্জ্য ব্যবস্থাপনা বন্যপ্রাণীর জন্য ক্ষতিকর হতে পারে। এ পরিস্থিতি থেকে উত্তরণে সমন্বিত উদ্যোগের প্রয়োজন রয়েছে।

অনুমোদন না পাওয়ায় বিপাকে মালিকরা

ইরাবতী ও বনমালী রিসোর্টের মালিক এবং রিসোর্ট ওনার্স অ্যাসোসিয়েশনের সাংগঠনিক সম্পাদক যুবাইর হিরা বলেন, “তারা নিজস্ব জমিতে ইউনিয়ন পরিষদের ট্রেড লাইসেন্স নিয়ে রিসোর্ট নির্মাণ ও ব্যবসা শুরু করেছেন। পরে জেলা প্রশাসনের অনুমতির জন্য আবেদন করলেও ফায়ার লাইসেন্স ও পরিবেশগত ছাড়পত্রের কারণে অনুমোদন পাননি।”

তিনি বলেন, “ফায়ার সার্ভিসের নিয়ম অনুযায়ী এসব এলাকায় লাইসেন্স দেওয়া সম্ভব নয় বলে জানানো হয়েছে। এ কারণে প্রতিটি রিসোর্ট ও কক্ষে অগ্নিনির্বাপণ সরঞ্জাম রাখা হয়েছে। পরিবেশ অধিদপ্তরে গেলে বলা হয়, ইসিএ এলাকায় পরিবেশগত ছাড়পত্র দেওয়ার বিধান নেই।”

যুবাইর হিরার দাবি, সুন্দরবনের ১০ কিলোমিটারের মধ্যে মোংলা ইপিজেড ও রামপাল তাপবিদ্যুৎ কেন্দ্রসহ বিভিন্ন শিল্পপ্রতিষ্ঠান পরিবেশগত ছাড়পত্র পেয়েছে। তাহলে রিসোর্টগুলো কেন ছাড়পত্র পাবে না, সেই প্রশ্ন তোলেন তিনি।

তিনি জানান, ইরাবতী ও বনমালী রিসোর্ট নির্মাণে প্রতিটিতে সোয়া কোটি টাকা করে বিনিয়োগ করেছেন। অন্য রিসোর্টগুলোতেও কোনো কোনো ক্ষেত্রে দুই থেকে তিন কোটি টাকা ব্যয় হয়েছে। তার দাবি, রিসোর্টগুলোতে স্থানীয় ২০ থেকে ২৫ জন করে কাজ করেন। এতে স্থানীয় মানুষের বিকল্প কর্মসংস্থান তৈরি হয়েছে এবং সুন্দরবনের ওপর তাঁদের নির্ভরশীলতা কমেছে।

বনলতা ও নিকুঞ্জ রিসোর্টের মালিক সুদীপ্ত গাইন বলেন, “২০১০ সালের জাতীয় পর্যটন নীতিমালা অনুসরণ করেই তারা নিজস্ব জমিতে রিসোর্ট নির্মাণ করেছেন।” তার দাবি, রিসোর্টগুলো থেকে বনের ক্ষতি হয় এমন কোনো কার্যক্রম চালানো হয় না। এসব স্থাপনার কারণে স্থানীয় মানুষের বিকল্প আয়ের সুযোগও তৈরি হয়েছে।

সুন্দরবনের পরিবেশ রক্ষা, পর্যটনশিল্পের বিকাশ ও স্থানীয় মানুষের জীবিকার স্বার্থ বিবেচনায় নিয়ে রিসোর্টগুলোর অনুমোদন ও পরিচালনার জন্য সমন্বিত নীতিমালা প্রণয়নের প্রয়োজনীয়তা সামনে এসেছে।

যা বলছে পরিবেশ অধিদপ্তর

পরিবেশ অধিদপ্তর সাতক্ষীরা জেলা কার্যালয়ের সহকারী পরিচালক সোমেন মৈত্র বলেন, “প্রতিবেশগত সংকটাপন্ন এলাকার (ইসিএ) সংবেদনশীলতা বজায় রাখা বাধ্যতামূলক। আমার জেলার চারটি রিসোর্ট দীর্ঘদিন ধরে কোনও প্রকার বৈধ অনুমোদন বা পরিবেশগত ছাড়পত্র ছাড়াই বাণিজ্যিক কার্যক্রম চালিয়ে আসছে। আমরা পূর্বে কারণ দর্শানোর নোটিশ দিয়ে সময় বেঁধে দিয়েছিলাম। পরিবেশ আইন অমান্য করে কার্যক্রম অব্যাহত রাখায় এবার নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট ও ভ্রাম্যমাণ আদালতের মাধ্যমে তাদের বিরুদ্ধে দ্রুততম সময়ে সরাসরি আইনি ব্যবস্থা নেওয়া হবে।”

পরিবেশ অধিদপ্তরের খুলনা বিভাগীয় কার্যালয়ের পরিচালক খোন্দকার মো. ফজলুল হক বলেন, পরিবেশগত সংকটাপন্ন এলাকায় রিসোর্ট পরিচালনার অনুমতি নেই। আইন অনুযায়ী রিসোর্টগুলোর কর্তৃপক্ষকে নোটিশ দেওয়া হয়েছিল। নোটিশের সন্তোষজনক জবাব না পাওয়ায় রিসোর্টগুলোর কার্যক্রম বন্ধের নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। নির্দেশনা না মানলে অধিদপ্তর নিজেই সেগুলো বন্ধ করে দেবে।

সুন্দরবন পশ্চিম বন বিভাগের বিভাগীয় বন কর্মকর্তা (ডিএফও) এ জে ডি এম হাছানুর রহমান বলেন, “রিসোর্টগুলো বনের সীমানার বাইরে ব্যক্তিমালিকানাধীন জমিতে নির্মিত হওয়ায় সরাসরি উচ্ছেদ অভিযানের আইনি সুযোগ সীমিত। তবে এসব রিসোর্ট থেকে পর্যটকদের অনিয়ন্ত্রিতভাবে বনে প্রবেশ, শব্দদূষণ, রাতে অতিরিক্ত আলো এবং প্লাস্টিকসহ ক্ষতিকর বর্জ্য ফেলার কারণে সুন্দরবনের বন্যপ্রাণী ও প্রতিবেশব্যবস্থা হুমকির মুখে পড়ছে। এ কারণে রিসোর্টগুলোর কার্যক্রম বন্ধ করা জরুরি।”