রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের গ্রাফিতি মোছার চেষ্টার ঘটনায় করা মামলায় রাষ্ট্র সংলাপ ফোরামের নেতা আল নুর মোহাম্মদ আয়াস ও মারজিয়া খন্দকার রিমির জামিন শুনানিতে হট্টগোল ও মারামারির ঘটনা ঘটেছে। শুনানির সময় আসামিপক্ষের এক আইনজীবীকে মারধর করেন কয়েকজন আইনজীবী। পরে আদালত দুজনেরই জামিন নামঞ্জুর করে কারাগারে পাঠানোর আদেশ দেন।
বুধবার (১৪ অক্টোবর) ঢাকার মেট্রোপলিটন ম্যাজিস্ট্রেট রিয়াদ হাসানের আদালতে এ ঘটনা ঘটে। হট্টগোলের এক পর্যায়ে বিচারক এজলাস ছাড়েন।
শনিবার রাজধানীর সেগুনবাগিচায় শিল্পকলা একাডেমির উল্টোপাশের ফুটপাত-সংলগ্ন দেয়ালে আঁকা রবীন্দ্রনাথের গ্রাফিতি মুছতে গিয়ে পুলিশের বাধার মুখে পড়েন আয়াসসহ একদল তরুণ। বাগ্বিতণ্ডার মধ্যে আয়াসসহ চারজনকে আটক করে থানায় নিয়ে যায় পুলিশ। অন্য তিনজন হলেন রিমি, সাকিবুল হাসান ও সুজন মিয়া।
ঘটনাস্থলে এক নারীকে গ্রাফিতিতে কালি দিতে দেখা যায়। এক পুলিশ সদস্য বাধা দিলে ওই নারী বলেন, “আমরা ভারতীয় আগ্রাসনের প্রতিবাদ জানাতে এসেছি।“ পুলিশি বাধার মুখে আয়াসের নেতৃত্বে তারা স্লোগানও দেন। এ ঘটনায় শাহবাগ থানার এসআই জিয়াউল হক শনিবার আটক চারজনের বিরুদ্ধে মামলা করেন। মামলায় অপরাধমূলক ষড়যন্ত্র, বিদ্বেষ ছড়ানো ও ধর্মীয় অনুভূতিতে আঘাতের অভিযোগ আনা হয়েছে।
রবিবার আদালত রিমি ও সুজনের দুই দিন এবং আয়াস ও সাকিবুলের তিন দিনের রিমান্ড মঞ্জুর করেন। মঙ্গলবার সাকিবুল ও সুজনকে রিমান্ড শেষে কারাগারে পাঠানো হয়। বুধবার আয়াস ও রিমিকে রিমান্ড শেষে আদালতে হাজির করে কারাগারে আটক রাখার আবেদন করেন তদন্ত কর্মকর্তা শাহবাগ থানার এসআই আব্দুল গাফফার হিমেল। আবেদনে বলা হয়, রিমান্ডে জিজ্ঞাসাবাদে মামলার সঙ্গে জড়িত পলাতক অন্য আসামিদের বিষয়ে গুরুত্বপূর্ণ তথ্য পাওয়া গেছে, যা যাচাই-বাছাই চলছে। সুষ্ঠু তদন্তের স্বার্থে তাদের কারাগারে রাখা প্রয়োজন এবং ভবিষ্যতে আবার রিমান্ডে নেওয়ার প্রয়োজন হতে পারে।
বিকেল ৪টা ১০ মিনিটের দিকে দুজনকে এজলাসে তোলা হয়। আসামিপক্ষে জামিন চেয়ে শুনানি করেন অ্যাডভোকেট মনির হোসেন সুমন। তিনি বলেন, “রবীন্দ্রনাথকে কেউ ভালোবাসে, আবার কেউ বিদ্বেষও করে; তিনি আসমান থেকে আসেননি।“ আয়াস-রিমির বিরুদ্ধে যে ধারায় মামলা হয়েছে, তা তাদের ক্ষেত্রে প্রযোজ্য নয় বলে দাবি করেন তিনি। এ ছাড়া আয়াস অসুস্থ বলেও আদালতকে জানান। রাষ্ট্রপক্ষে ঢাকা মহানগর পাবলিক প্রসিকিউটর ওমর ফারুক ফারুকী জামিনের বিরোধিতা করেন। তিনি অভিযোগ করেন, আয়াস পাকিস্তান ও জিন্নাহর কবর জিয়ারত নিয়ে বক্তব্য দিয়েছেন, যা উসকানিমূলক এবং এর পেছনে দুরভিসন্ধি আছে। তার অভিযোগ, হিন্দু সম্প্রদায়ের মধ্যে উসকানি দিতে এবং বিভেদ সৃষ্টি করতে এ কর্মকাণ্ড চালানো হয়েছে। তিনি আরও বলেন, “গ্রাফিতিতে কালি দেওয়া যায় না।“ এক পর্যায়ে আসামিপক্ষের আইনজীবীদের উদ্দেশে প্রসিকিউটর বলেন, “এরা সবাই জামায়াতের আইনজীবী, দেখলেই বোঝা যাচ্ছে।”
এ সময় আসামিপক্ষের আইনজীবী আল মহসিন তৌহিদ বলেন, “পিপির বক্তব্যে আমার আপত্তি আছে।“ এ কথায় রাষ্ট্রপক্ষের কয়েকজন আইনজীবী ক্ষিপ্ত হয়ে তাকে কিল-ঘুষি মারতে শুরু করেন। টানাহেঁচড়ায় তৌহিদের শার্ট ছিঁড়ে যায়। কয়েকজন তাকে ছিনিয়ে আনেন। পরিস্থিতি দেখে বিচারক রিয়াদ হাসান এজলাস ত্যাগ করেন। এরপরও আদালতে হট্টগোল চলতে থাকে। কয়েক মিনিট পর প্রসিকিউটর ফারুকী ও আইনজীবী মনির হোসেন সুমন পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনেন। কাঠগড়া থেকে আয়াস প্রসিকিউটরের উদ্দেশে বলেন, “ক্ষমা চেয়েছি, স্যার। ক্ষমা চাই। এসব করে আমার জীবন ধ্বংস করবেন।” আল মহসিন তৌহিদকে উদ্দেশ করে তিনি বলেন, “আপনাকে তো আমি চিনি না। আপনি কেন আসছেন?” ১৫ মিনিট পর পরিস্থিতি শান্ত হলে বিচারক আবার এজলাসে ওঠেন। তিনি বলেন, “বিষয়টা খুবই খারাপ লাগল। আপনাদের কাছে এটা আশা করিনি।” এরপর তিনি আয়াস ও রিমির জামিন নামঞ্জুর করে কারাগারে পাঠানোর আদেশ দেন।
কঠোর নিরাপত্তায় কারাগারে নেওয়ার পথে আয়াস বলেন, “আমি কি মার্ডার করে আসছি। আমাকে এভাবে নিচ্ছেন।” পরে তাকে সিএমএম আদালতের হাজতখানায় নেওয়া হয়।