বঙ্গোপসাগরের হিরণপয়েন্টে ‘ওটি জান্নাতুল ফেরদৌস’ নামের একটি জাহাজের ধাক্কায় ‘এমভি ফুলবাড়ী’ নামের কয়লাবাহী কার্গো জাহাজ ডুবে গেছে। বিদেশি বাণিজ্যিক জাহাজ থেকে ১,২৫০ মেট্রিক টন কয়লা বোঝাই করে ঢাকায় যাচ্ছিল কার্গোটি।
সোমবার (২৬ অক্টোবর) রাত ৯টার দিকে সুন্দরবনের সুন্দরী কোঠা এলাকায় এই ঘটনা ঘটে। ঘটনার পর সুন্দরবনের চরে উঠে ১১ জন নাবিক ও কর্মী। পরে অন্য জাহাজের সহায়তায় তাদের উদ্ধার করা হয়।
উদ্ধার হওয়া ১১ জন নাবিক ও কর্মীরা হলেন - মাস্টার মো. সুজন, ড্রাইভার প্রশান্ত চন্দ্র শীল, সুকানী মো. শাকিল, গ্রিজার প্রসেনজিৎ রায়, লস্কর মেহেদী হাসান বাপ্পি, মো. হোসেন মোল্লা, মোহাম্মদ অলিউল্লাহ, মো. সোহান শেখ, বাবুর্চি মোহাম্মদ লিটু শেখ, নয়ন শেখ, গার্ড অনিল চন্দ্র সানা।
সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা যায়, মোংলা বন্দরের ফেয়ারওয়ে বয়া সংলগ্ন বঙ্গোপসাগরের হিরণপয়েন্টে অবস্থানরত বিদেশি বাণিজ্যিক মাদার ভেসেল ‘ইয়াস জুপিটার’ থেকে ১২৫০ মেট্রিক টন কয়লা বোঝাই করে কার্গোটি ঢাকার উদ্দেশ্যে রওনা হয়। পথে সোমবার রাত ৯টার দিকে সুন্দরবনের সুন্দরী কোঠা সংলগ্ন এলাকায় পৌঁছালে ‘ওটি জান্নাতুল ফেরদৌস’ নামের একটি কার্গো জাহাজ পেছন থেকে ‘এমভি ফুলবাড়ী’কে সজোরে ধাক্কা দেয়। ধাক্কার তীব্রতায় আইআরএস ইন্টারন্যাশনালের মালিকানাধীন কয়লা বোঝাই এমভি ফুলবাড়ী কার্গোটি মুহূর্তের মধ্যে পানিতে তলিয়ে যায়।
দুর্ঘটনার শিকার কার্গোর মাস্টার মো. সুজন বলেন, ‘দুর্ঘটনার পর জাহাজটি ডুবে গেলে আমরা সাঁতরে নদীর চরে (সুন্দরবনে) উঠি। সেখানে অবস্থান করার সময় বাঘের গর্জন শুনতে পাই। অত্যন্ত আতঙ্কের মধ্যে আমাদের সেই সময় কাটাতে হয়।”
এরপর রাত সাড়ে ১১টার দিকে অপর একটি জাহাজের সহায়তায় তারা নিরাপদ হন।
উদ্ধারকারী জাহাজ ‘এমভি রানিয়া-১৩’-এর ক্যাপ্টেন মো. তুহিন ইসলাম বলেন, “রাত ১১টার দিকে বেতার বার্তার মাধ্যমে জাহাজ দুর্ঘটনার খবর জানতে পারি। এরপর আমরা সেখানে গিয়ে তাদের উদ্ধার করি।”
পরবর্তীতে মঙ্গলবার (২৭ অক্টোবর) সকালে উদ্ধারকৃত নাবিকদের বাংলাদেশ নৌযান শ্রমিক ফেডারেশনের মোংলা শাখা অফিসে নিয়ে আসা হয়।
বাংলাদেশ নৌযান শ্রমিক ফেডারেশনের কেন্দ্রীয় কমিটির সমাজ কল্যাণ সম্পাদক আনোয়ার হোসেন চৌধুরী জানান, উদ্ধার হওয়া নাবিকরা বর্তমানে নৌযান অফিসে অবস্থান করছেন। তারা আইনগত ব্যবস্থা গ্রহণের জন্য পরবর্তীতে পদক্ষেপ গ্রহণ করবেন এবং ডুবন্ত জাহাজটি উদ্ধারের জন্য দ্রুত ব্যবস্থা গ্রহণ করবেন।
এছাড়া তার দাবি, এই দুর্ঘটনার কারণে বন্দরের চ্যানেলটি সম্পূর্ণ স্বাভাবিক রয়েছে।
বন্দর কর্তৃপক্ষের সদস্য (হারবার ও মেরিন) কমডোর মো. শফিকুল ইসলাম সরকার বলেন, “পশুর চ্যানেল সম্পূর্ণ নিরাপদ রয়েছে এবং এ পথে নৌযান চলাচল স্বাভাবিক আছে। ডুবে যাওয়া জাহাজটি উদ্ধারে মালিকপক্ষ দ্রুত ব্যবস্থা নিচ্ছে।”
তবে সুন্দরবনে বারবার কয়লাবাহী জাহাজডুবির ঘটনায় উদ্বেগ জানিয়েছেন পশুর রিভার ওয়াটারকিপার ও ‘সুন্দরবন রক্ষায় আমরা’ সংগঠনের সমন্বয়কারী মো. নূর আলম শেখ। তিনি বলেন, সুন্দরবনের ভেতরে বারবার কয়লাবাহী জাহাজ ডুবছে। এবারও প্রায় ১,২০০ মেট্রিক টন কয়লাবাহী জাহাজ ডুবেছে।
নূর আলম শেখের ভাষ্য, মোংলা বন্দর কর্তৃপক্ষ পশুর চ্যানেল নিরাপদ থাকার কথা বললেও বিশ্ব ঐতিহ্য সুন্দরবন ও পশুর নদীর জলজ প্রাণীরা নিরাপদে নেই। সাম্প্রতিক গবেষণা প্রতিবেদনের বরাত দিয়ে তিনি বলেন, “পশুর নদীর মাছের দেহে সীসা, তামা ও পারদের মতো ভারী ধাতুর পরিমাণ সহনীয় মাত্রা ছাড়িয়ে গেছে। কয়লা ও শিল্পদূষণ এর কারণ।”
তিনি আরও বলেন, “জাহাজডুবির কারণে সুন্দরবনের জীববৈচিত্র্য ও পশুর নদীর জলজ প্রাণী ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে। জোয়ারের পানিতে বিষাক্ত কয়লা ছড়িয়ে পড়তে পারে সুন্দরবন ও পশুর নদীর বিভিন্ন এলাকায়।”
নূর আলম শেখের অভিযোগ, সুন্দরবন রক্ষায় নৌপরিবহন মন্ত্রণালয়, মোংলা বন্দর কর্তৃপক্ষ ও বাংলাদেশ অভ্যন্তরীণ নৌপরিবহন কর্তৃপক্ষ (বিআইডব্লিউটিএ) আন্তরিক ভূমিকা রাখছে না। বারবার কয়লা ও তেলবাহী জাহাজডুবির ঘটনা প্রতিরোধে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের উদাসীনতা বিশ্ব ঐতিহ্য সুন্দরবনকে ধ্বংসের দিকে ঠেলে দিচ্ছে।