দীর্ঘ প্রতীক্ষার অবসান, ৮ শ’ যাত্রী নিয়ে সেন্টমার্টিনের পথে ছেড়ে গেলো জাহাজ

দীর্ঘ প্রতীক্ষার অবসান ঘটিয়ে আবারও প্রাণ ফিরে পেলো দেশের অন্যতম জনপ্রিয় পর্যটন নৌ-রুট কক্সবাজার-সেন্টমার্টিন। নতুন পর্যটন মৌসুমের প্রথম দিনেই ৮ শতাধিক পর্যটক নিয়ে পর্যটকবাহী জাহাজ এমভি আউলিয়া সকাল ৭টা ৪০ মিনিটে কক্সবাজারের বিডাব্লিউটিএ জেটিঘাট ছেড়ে সেন্টমার্টিনের উদ্দেশ্যে যাত্রা করেছে।

বৃহস্পতিবার (৫ নভেম্বর) ভোর থেকেই ঘাটজুড়ে ছিল উৎসবমুখর পরিবেশ। পরিবার, বন্ধু-বান্ধব ও বিভিন্ন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের ভ্রমণ দল নিয়ে শত শত মানুষ জড়ো হন। সাগরের ঢেউ, শীতের মৃদু বাতাস আর পর্যটকদের উচ্ছ্বাস মিলিয়ে মৌসুমের প্রথম যাত্রা হয়ে ওঠে আনন্দময়।

কক্সবাজার জেলা প্রশাসনের নিযুক্ত প্রতিনিধি ও কক্সবাজার সদর উপজেলার ভূমি কমিশনার মো. মশিয়ুর রহমান বলেন, “মৌসুমের প্রথম জাহাজটি নির্ধারিত সময় সকাল ৭টা ৪০ মিনিটে যাত্রা শুরু করেছে। যাত্রীদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে জেলা প্রশাসন, কোস্টগার্ড, নৌ-পুলিশ, ফায়ার সার্ভিস এবং সংশ্লিষ্ট সংস্থাগুলো সমন্বিতভাবে কাজ করেছে।”

যাত্রীদের নিরাপদ ও নির্বিঘ্ন ভ্রমণ নিশ্চিত করাই প্রশাসনের প্রধান লক্ষ্য বলে তিনি উল্লেখ করেন।

সী ক্রুজ অপারেটরস ওনার্স অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশ-এর সাধারণ সম্পাদক হোসাইন ইসলাম বাহাদুর বলেন, “দীর্ঘ প্রতীক্ষার অবসান ঘটিয়ে নতুন মৌসুমে প্রথম দিনেই ৮ শতাধিক পর্যটকের উপস্থিতি অত্যন্ত আশাব্যঞ্জক। এটি প্রমাণ করে সেন্টমার্টিন ভ্রমণের প্রতি মানুষের আগ্রহ আগের মতোই রয়েছে। বর্তমান সরকারের স্বদিষ্টা আর সেন্টমার্টিনের মানুষের কথা চিন্তা করে পর্যটকবাহী জাহান চলাচলের অনুমতি দিয়েছে।”

বাহাদুর আরও বলেন, “নিরাপত্তা, সময়নিষ্ঠা, পরিবেশ ও উন্নত সেবা নিশ্চিত করার মাধ্যমে পর্যটকদের আস্থা আরও বাড়ানোর চেষ্টা করা হচ্ছে। জাহাজ, সাগর আর সেন্টমার্টিনের পরিবেশ দুষণের বিষয়ে পর্যটকদের কড়া বার্তা দেয়া হয়েছে। যাতে প্লাষ্টিকের বোতল থেকে শুরু করে পরিবেশ নষ্ট না হয় এমন কর্মকান্ড থেকে বিরত থাকার তাগাদা দেয়া হয়েছে।”

জাহাজে থাকা পর্যটকদের মুখেও ছিল ভ্রমণের উচ্ছ্বাস। ঢাকা থেকে পরিবার নিয়ে আসা পর্যটক সাবিনা ইয়াসমিন বলেন, “অনেক দিন ধরে পরিকল্পনা করছিলাম সেন্টমার্টিনে যাব। মৌসুমের প্রথম জাহাজে যেতে পেরে খুব ভালো লাগছে। সকালে সমুদ্রের সৌন্দর্য দেখে মনে হচ্ছে যাত্রাটাই যেন ভ্রমণের অর্ধেক আনন্দ।”

চট্টগ্রাম থেকে বন্ধুদের সঙ্গে আসা বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষার্থী মেহেদী হাসান বলেন, “সেন্টমার্টিনে এর আগে একবার গিয়েছিলাম। এবার মৌসুমের শুরুতেই যাওয়ার সুযোগ হয়েছে। আশা করছি দ্বীপের প্রাকৃতিক সৌন্দর্য উপভোগ করার পাশাপাশি পরিবেশ রক্ষার বিষয়েও সবাই সচেতন থাকবে। আমরা কেউ যেন প্লাস্টিক বা বর্জ্য ফেলে দ্বীপের ক্ষতি না করি।”

রাজশাহী থেকে আসা পর্যটক রুবেল আহমেদ বলেন, “বাংলাদেশের একমাত্র প্রবাল দ্বীপকে কাছ থেকে দেখার ইচ্ছা অনেক দিনের। জাহাজে ওঠার পর থেকেই অন্যরকম অনুভূতি কাজ করছে। পরিবারের সবাই খুব আনন্দিত। আশা করি নিরাপদে ভ্রমণ শেষে সুন্দর স্মৃতি নিয়ে ফিরতে পারব।”

সেন্টমার্টিন বাংলাদেশের একমাত্র প্রবাল দ্বীপ। এর স্বচ্ছ নীল জল, প্রবাল, নারিকেল গাছ, মনোরম সৈকত এবং প্রাকৃতিক সৌন্দর্য দেশি-বিদেশি পর্যটকদের দীর্ঘদিন ধরেই আকর্ষণ করে আসছে। প্রতিবছর শীত মৌসুমে এই দ্বীপে পর্যটকদের ব্যাপক সমাগম ঘটে। তবে পরিবেশ সংরক্ষণ এবং সমুদ্রের বৈরী আবহাওয়ার বিষয়টি বিবেচনায় রেখে নির্ধারিত সময়ে নৌযান চলাচল নিয়ন্ত্রণ করা হয়।

পর্যটনসংশ্লিষ্ট ব্যবসায়ীরা বলছেন, নৌ-রুট চালু হওয়ার মাধ্যমে সেন্টমার্টিনের হোটেল, রিসোর্ট, রেস্তোরাঁ, পরিবহন ও ক্ষুদ্র ব্যবসায় নতুন করে কর্মচাঞ্চল্য ফিরে আসবে। স্থানীয় মানুষের আয়ের অন্যতম প্রধান উৎস পর্যটন। তাই, মৌসুমের সফল সূচনা তাদের মাঝেও আশার সঞ্চার করেছে।

কক্সবাজার জেলা প্রশাসনের দেওয়া তথ্য মতে, পর্যটনের বিকাশের পাশাপাশি সেন্টমার্টিনের পরিবেশ ও জীববৈচিত্র্য রক্ষায় সবাইকে আরও দায়িত্বশীল হতে হবে। প্লাস্টিক বর্জ্য ব্যবহার কমানো, নির্ধারিত নিয়ম মেনে ভ্রমণ করা এবং প্রবালসহ প্রাকৃতিক সম্পদের ক্ষতি না করাই টেকসই পর্যটনের অন্যতম শর্ত। মৌসুমের প্রথম যাত্রায় শত শত পর্যটকের প্রাণবন্ত উপস্থিতি, প্রশাসনের নিরাপত্তা ব্যবস্থা এবং পর্যটনসংশ্লিষ্টদের আশাবাদ—সব মিলিয়ে কক্সবাজার-সেন্টমার্টিন নৌ-রুটে নতুন মৌসুমের যাত্রা পর্যটন শিল্পে ইতিবাচক বার্তা দিয়েছে।
 
প্রতিবছরের ন্যায় আবহাওয়া অনুকূলে থাকলে আগামী দিনগুলোতে এই রুটে পর্যটকের সংখ্যা আরও বৃদ্ধি পাবে এবং দেশের পর্যটন অর্থনীতিতে গুরুত্বপূর্ণ অবদান রাখবে।