সাভার-আশুলিয়া শিল্পাঞ্চলে শ্রমিকদের কাজে ফেরার আহ্বান শ্রমিক নেতাদের

সাভার-আশুলিয়া শিল্পাঞ্চলে শ্রমিক অসন্তোষ ও কারখানায় উৎপাদন বন্ধের পরিস্থিতিতে আপাতত মাঠপর্যায়ে আন্দোলন চালিয়ে যাওয়ার পক্ষে নন শ্রমিকনেতারা। অবিলম্বে কারখানায় উৎপাদনে ফিরতে শ্রমিকদের প্রতি আহ্বান জানিয়েছেন তারা।

তাদের মতে, শ্রমিকদের মূল দাবি ছিল মজুরি বোর্ড গঠন ও নতুন মজুরি কার্যকর করা। সরকার মজুরি বোর্ড গঠন করায় এখন শ্রমিকদের কর্মস্থলে ফিরে যাওয়া উচিত। তবে শ্রমিকদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে সরকারকে উদ্যোগ নিতে হবে।

এসব বিষয়ে বৃহস্পতিবার (৫ নভেম্বর) রাতে ফোনে কথা হয় সাভার আশুলিয়ার একাধিক শ্রমিক নেতাদের সঙ্গে।

বাংলাদেশ গার্মেন্টস ও সোয়েটার্স শ্রমিক ট্রেড ইউনিয়ন কেন্দ্রের আইনবিষয়ক সম্পাদক খাইরুল মামুন মিন্টু বলেন, “কারখানাগুলোতে কার্যকর ট্রেড ইউনিয়ন থাকলে শ্রমিক  আন্দোলন সহিংস পর্যায়ে পৌঁছাত না। মজুরি বোর্ড গঠনের পদ্ধতি এবং বোর্ডের কার্যক্রম সম্পর্কে ট্রেড ইউনিয়নগুলো কারখানার শ্রমিকদের মধ্যে প্রচার করতে পারতো। এতে শ্রমিকরা বিষয়গুলো বুঝে শান্তিপূর্ণভাবে আন্দোলন করতে পারতেন। শ্রম আইন অনুযায়ী তাদের ধর্মঘট করার যে অধিকার রয়েছে, সেটিও যথাযথভাবে বাস্তবায়ন করতে পারতেন।”

খাইরুল মামুন মিন্টু বলেন, “শিল্পকারখানাগুলোতে অবাধ ট্রেড ইউনিয়ন অধিকার না থাকার কারণে আজ শিল্পের নিরাপত্তা হুমকির মুখে পড়েছে। এই আন্দোলনের ক্ষেত্রে মালিকপক্ষ ও সরকারের প্রশাসনের ব্যর্থতা রয়েছে।” পরিস্থিতি এমন পর্যায়ে যাওয়ার আগে গোয়েন্দা সংস্থাগুলোর কোনো তৎপরতা ছিল কি না, তা নিয়েও তার সন্দেহ রয়েছে।  

আন্দোলন সহিংস পর্যায়ে পৌঁছানোর কারণে তৈরি পোশাকশিল্পের মালিকরা শিপমেন্ট নিয়ে চাপে পড়েছেন বলে মনে করেন এই শ্রমিকনেতা। তিনি বলেন, “বিভিন্ন কারখানার শিপমেন্টের নির্দিষ্ট সময়সীমা থাকে। বিশেষ করে আগামী ডিসেম্বরের বড়দিনকে সামনে রেখে অক্টোবর ও নভেম্বরের মধ্যেই অধিকাংশ পণ্যের উৎপাদন শেষ করে শিপমেন্ট সম্পন্ন করতে হয়। ফলে নির্ধারিত সময়ে উৎপাদন শেষ করে পণ্য শিপমেন্ট করা নিয়ে অনেক মালিকই সংকটে পড়ছেন।”

তিনি আরও বলেন, “গার্মেন্টস মালিকরা এমনিতেই বলছেন, এমনিতেই বৈশ্বিক পরিস্থিতির কারণে তৈরি পোশাকশিল্প বিভিন্ন ধরনের সংকটের মধ্য দিয়ে যাচ্ছে। মালিকেরা বলছেন, ক্রয়াদেশ কমে যাচ্ছে। পাশাপাশি বাংলাদেশে গ্যাস ও বিদ্যুতের সংকট রয়েছে। সব মিলিয়ে পোশাকশিল্প এক ধরনের সংকটের মধ্যে রয়েছে। কিছু কারখানা এর মধ্যে বন্ধও আছে। এই সংকট দূর করতে সরকার মালিকদের জন্য বিভিন্ন উদ্যোগ ও প্রণোদনার ব্যবস্থা করছে।” কিন্তু শ্রমিকদের জন্য কোনো উদ্যোগ না নেওয়ার কারণেও এই সহিংস পরিস্থিতি তৈরি হয়েছে বলে তিনি মনে করেন।

এই পরিস্থিতি থেকে উত্তরণে সরকারকে দ্রুত শিল্পাঞ্চলে নিরাপত্তা জোরদার ও শ্রমিকদের দাবি বাস্তবায়নের আহ্বান জানান খাইরুল মামুন মিন্টু। তিনি বলেন, “কারখানাগুলোতে উৎপাদন চালু রাখা এবং মালিকরা যাতে নির্বিঘ্নে ও নিরাপদে পণ্য শিপমেন্ট করতে পারেন, সে ব্যাপারে সরকারকে যথাযথ ভূমিকা পালন করতে হবে।”

তার ভাষ্য, “এই শিল্প বড় ধরনের ক্ষতির মুখে পড়লে শেষ পর্যন্ত শ্রমিকরাই বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হবেন। শ্রমিকদের নতুন মজুরি কাঠামো বাস্তবায়নও কঠিন হয়ে পড়বে। দেশের ৪০ লাখ শ্রমিকের মধ্যে কিছু শ্রমিকও যদি বেকার হয়ে পড়েন, তাহলে পরিস্থিতি আরও জটিল হবে। এমনিতেই আগে থেকে লক্ষাধিক শ্রমিক বেকার রয়েছেন। শিল্পে আরও বড় ধরনের ক্ষতি হলে নতুন করে শ্রমিকদের বেকার হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে। তাই দ্রুত সমস্যার সমাধান করে শ্রমিকদের নিরাপদে কর্মস্থলে ফিরিয়ে আনা এবং কারখানাগুলো চালু করার জন্য সরকারকে প্রয়োজনীয় উদ্যোগ নিতে হবে।”

মাঠপর্যায়ে আন্দোলন চালিয়ে যাওয়ার বিষয়ে খাইরুল মামুন মিন্টু বলেন, “এবারের আন্দোলন মূলত এক দফার ভিত্তিতে, আর সেটি হচ্ছে মজুরিসংক্রান্ত দাবি। এখানে অন্য কোনো দাবি উত্থাপন করা হয়নি। শ্রমিকদের আরও অনেক সমস্যা ও দাবি রয়েছে। কিন্তু মজুরি বোর্ডের সিদ্ধান্ত নেওয়ার এখতিয়ার শুধু মজুরিসংক্রান্ত বিষয়েই সীমাবদ্ধ।”

তিনি বলেন, “কেউ কেউ নয় দফাসহ বিভিন্ন ধরনের দাবি সামনে আনছেন।” তার মনে হয়, শ্রমিকদের মজুরির আন্দোলনকে মূল দাবি থেকে সরিয়ে অন্যদিকে নিয়ে যাওয়ার জন্যই কেউ কেউ এ ধরনের কার্যক্রম চালাচ্ছেন। অর্থাৎ মূল দাবিটিকে ভিন্ন খাতে প্রবাহিত করার চেষ্টা হচ্ছে।

শ্রমিকদের মূল দাবি ছিল মজুরি বোর্ড গঠন এবং সরকারের প্রতিশ্রুতি অনুযায়ী ডিসেম্বর থেকে নতুন মজুরি কার্যকর করা। মালিকপক্ষও এ বিষয়ে প্রতিশ্রুতি দিয়েছে বলে জানান তিনি। তবে শ্রমিকদের মধ্যে এখনো এ নিয়ে সন্দেহ রয়েছে। সেই সন্দেহ থাকলেও তার মতে, কারখানার উৎপাদন সচল রেখে মজুরি ঘোষণার জন্য অপেক্ষা করা উচিত। মজুরি ঘোষণার পর প্রয়োজনে আবার আন্দোলনে যাওয়া যেতে পারে।

খাইরুল মামুন মিন্টু বলেন, “আশা করছি, সরকার শ্রমিকদের কাঙ্ক্ষিত মজুরি ঘোষণা করবে। যদি ঘোষিত মজুরি শ্রমিকদের প্রত্যাশা অনুযায়ী না হয়, তাহলে পরবর্তী সময়ে মজুরি পর্যালোচনার যে সুযোগ রয়েছে, সেই সময়ে প্রয়োজনে সংশ্লিষ্ট পক্ষকে বিষয়টি জানানো হবে এবং আন্দোলনের মাধ্যমে দাবি তুলে ধরা হবে।”

তবে এই মুহূর্তে শ্রমিকদের কাজে ফিরে যাওয়া উচিত বলে মনে করেন তিনি। তার ভাষ্য, “কর্মস্থলে ফিরে কারখানার উৎপাদন সচল রাখা জরুরি। এজন্য সরকারকেও নমনীয় অবস্থানে আসতে হবে।”

শ্রমিকদের মধ্যে আতঙ্কের পরিস্থিতি তৈরি হওয়ার কথা উল্লেখ করে তিনি জানান, কিছুক্ষণ আগেও তার কাছে খবর এসেছে, পুলিশ শ্রমিকদের বাসায় বাসায় যাচ্ছে। এলাকার স্থানীয় লোকজন ও বহিরাগত ব্যক্তিরা তল্লাশি চালাচ্ছেন এবং শ্রমিকদের ধরে পুলিশের হাতে তুলে দিচ্ছেন। এ ধরনের পরিস্থিতি চলতে থাকলে শ্রমিকদের মধ্যে আতঙ্ক তৈরি হবে। আর শ্রমিকদের মধ্যে আতঙ্ক থাকলে তারা কাজে ফিরতে চাইবেন না।

তাই শ্রমিকদের নিরাপত্তা ও আস্থা নিশ্চিত করার ওপর গুরুত্ব দেন এই শ্রমিকনেতা। তার মতে, তাহলেই শ্রমিকরা নির্ভয়ে কর্মস্থলে ফিরতে পারবেন এবং কারখানাগুলোতে উৎপাদন স্বাভাবিক হবে।

অন্যদিকে সাভারের অন্যতম শ্রমিক নেতা বাংলাদেশ গার্মেন্টস অ্যান্ড শিল্প শ্রমিক ফেডারেশনের কেন্দ্রীয় সভাপতি রফিকুল ইসলাম সুজন বলেন, “শ্রম আইনগুলো যথাযথভাবে বাস্তবায়ন করা হলে এ ধরনের সমস্যার সৃষ্টি হতো না।”

তিনি বলেন, “মজুরি বোর্ড গঠনের কথা ছিল মে মাসে। আমরা দীর্ঘদিন ধরে সরকার ও সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষকে এ বিষয়ে বলে আসছি। নিয়মতান্ত্রিক ও গণতান্ত্রিক পদ্ধতিতে আন্দোলন-সংগ্রামও চালিয়ে আসছিলাম। কিন্তু মালিকপক্ষ আমাদের দাবিতে কর্ণপাত করেনি। এ কারণে শেষ পর্যন্ত শ্রমিকরা মাঠে নামতে বাধ্য হয়েছেন। এর মধ্যে কিছু সুবিধাবাদী মানুষ নিজেদের স্বার্থ হাসিলের জন্য ভাঙচুর ও নৈরাজ্য সৃষ্টি করেছেন। এগুলো কোনোভাবেই কাম্য নয়। প্রকৃত শ্রমিকরা এ ধরনের কাজ করেন না। একজন শ্রমিক কখনো নিজের কর্মস্থলের শিল্পপ্রতিষ্ঠানের মেশিনের একটি সুতা পর্যন্ত ছিঁড়বেন না। কারণ, এই শিল্পের ওপর নির্ভর করেই তারা জীবন-জীবিকা নির্বাহ করেন।”

তিনি আরও বলেন, “সরকার যেহেতু মজুরি বোর্ড গঠন করেছে, এখন আমাদের দাবি হচ্ছে শ্রমিকদের ন্যায্য মজুরি নিশ্চিত করা। সরকার সরকারি শ্রমিক-কর্মচারীদের বেতনকাঠামো ঘোষণা করেছে। সেখানে একজন পিয়নের মূল বেতন ২০,০০০ টাকা এবং সর্বসাকল্যে প্রায় ৩৮,৪০০ টাকা। সেই বিবেচনায় আমরা ৩৫টি ফেডারেশনের পক্ষ থেকে পোশাকশ্রমিকদের ন্যূনতম মজুরি ৩০০ ডলার বা ৩৬,০০০ টাকা করার দাবি জানিয়েছি।”

এই শ্রমিক নেতা বলেন, “বিভিন্ন দেশের পোশাকশিল্পের শ্রমিকরা যেমন - কম্বোডিয়া, শ্রীলঙ্কা ও ফিলিপাইনের শ্রমিকরা বাংলাদেশের তুলনায় বেশি মজুরি পান। অথচ বাংলাদেশে মজুরি বৃদ্ধির সময় এলেই বড় বড় মালিকরা বিভিন্ন কৌশল অবলম্বন করেন। সাবকন্ট্রাক্টের কাজ বন্ধ করে দেওয়া হয়। এরপর তারা বলেন, এত টাকা মজুরি দেওয়া সম্ভব নয়।”

তিনি বলেন, “২০০৬ সাল থেকেই বিষয়টি দেখে আসছি। মজুরি বাড়ানোর সময় এলেই গার্মেন্টস মালিকরা নানা কৌশল নেন। ভাঙচুর ও নৈরাজ্যে প্রকৃত শ্রমিকেরা জড়িত নন। কিছু সুবিধাভোগী ব্যক্তি ও মালিকপক্ষের কেউ কেউ উসকানি দিয়ে শ্রমিকদের ন্যায্য মজুরির দাবি থেকে বঞ্চিত করতে এমন পরিস্থিতি তৈরি করেন বলে মনে করি।”