খেলার মাঠে নয়, শহুরে শিশুদের আগ্রহ মোবাইল স্ক্রিনে

শিশুর সুষ্ঠু ও সুন্দর বিকাশের জন্য সুস্থ পারিবারিক পরিবেশের সঙ্গে প্রয়োজন কিছু সামাজিক উপাদান। এগুলো হতে পারে বিভিন্ন পর্যায়ের শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, প্রগতিশীল শিশু সংগঠন, খেলার মাঠ, পাঠাগার ইত্যাদি। এক সময় প্রতিটি পাড়ায় প্রাথমিক বিদ্যালয়, খেলার মাঠ, ক্লাব, পাঠাগার দেখা যেত। একটা সময় ছিল, যখন স্কুল থেকে ফিরে কোনোরকমে ব্যাগটা রেখে নাকে-মুখে একটু খাবার গুঁজেই শিশুরা দৌড়ে মাঠে চলে যেত। ফিরত সন্ধ্যার আগেই।

বিশেষজ্ঞরা বলেন, চার দেয়ালের মধ্যে শিশুর স্বাভাবিক বিকাশ সম্ভব নয়। শারীরিক সুস্থতার জন্য ব্যায়াম, ছোটাছুটি, খেলাধুলা করা অত্যন্ত জরুরি। চিকিৎসকরাও রোগবালাই থেকে দূরে থেকে বাঁচতে শিশুদের খেলাধুলার পরামর্শ দিয়ে থাকেন। খেলার মাঠ অর্থাৎ মুক্ত পরিবেশ, ছোটাছুটি, বুক ভরে নিঃশ্বাস নেওয়ার ধারণা আজকাল শহুরে শিশুদের মধ্যে একেবারেই নেই।

ফুটবল-ক্রিকেট ছাড়াও মফস্বল ও গ্রামের শিশুদের সময় কাটত ঘুড়ি উড়িয়ে, গোল্লাছুট, দাঁড়িয়াবান্ধা, বৌছি, ডাঙ্গুলি, সাত চারা, লাটিম, মার্বেল, কানামাছি, কুতকুতের মতো খেলাধুলায়।

এসব খেলার কয়েকটি এতই জনপ্রিয় ছিল যে, সব বয়সী মানুষ শিশুদের খেলা উপভোগ করতেন। দিতেন উৎসাহ। এমনকি আশির দশকেও বেশিরভাগ শহুরে শিশু এসব খেলার স্বাদ পেয়েছে।

কিন্তু নগরায়ন, শিল্পায়ন, কৃষিজমি সম্প্রসারণ ইত্যাদি কারণে মাঠের সঙ্কট শুরু হলে এই ঐতিহ্যে ভাটা পড়তে শুরু করে। ধীরে ধীরে বিনোদনের বিকল্প মাধ্যম হয়ে ওঠে টেলিভিশন, কম্পিউটার, মোবাইল ফোন, ইন্টারনেট ইত্যাদি। এখন শহুরে শিশুরা বাইরে গিয়ে ফুটবল-ক্রিকেটের বদলে অনলাইনে গেম খেলতে পছন্দ করে।

খেলাধুলায় শহুরে শিশুদের অনাগ্রহের সবচেয়ে বড় কারণ মোবাইল ফোনে আসক্তি। অভিভাবকরা জানান, স্কুল থেকে বাড়ি ফিরেই প্রথমে তাদের সন্তান মোবাইল নিয়ে বসে। তারা মাঠে গিয়ে খেলতে অনাগ্রহী। 

আসক্তির উৎস

শিশুরা কেন ফোনের মতো ডিজিটাল ডিভাইসকে তাদের পরম সঙ্গী ভাবছে, এ প্রশ্নের উত্তর খোঁজার চেষ্টা করেছে ঢাকা ট্রিবিউন। মাঠের অপ্রতুলতা, নিরাপত্তার অভাব, দূষণে অসুস্থ হওয়ার শঙ্কা ইত্যাদি কারণে অভিভাবকরা সন্তানকে বাইরে যেতে দিতে চান না। আবার ঘরের ভেতরে এক ধরনের অভ্যস্ততার জগৎ তৈরি হওয়ায় শিশুরাও বের হতে চায় না।

রাজধানী ঢাকায় অভিভাবকদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, বাসার আশেপাশে আদৌ খেলার মাঠ আছে কি-না জানা নেই অনেক শিশুরই।

বিভিন্ন কারণে অভিভাবকরা শিশুর হাতে মোবাইল ফোন তুলে দেন। এক সময় শিশুরা আসক্ত হয়ে পড়ে। বাইরে না গিয়ে তারা স্ক্রিনে মনোনিবেশ করে থাকে সারাক্ষণ। খাওয়ার সময়ও তার মোবাইল ফোন চাই।

শিশুদের মোবাইল আসক্তি/সংগৃহীত

এছাড়া শিশুরা অনুকরণপ্রিয়। বড়দের হাতে স্মার্টফোন দেখলে সে-ও স্মার্টফোন নিতে আগ্রহ পায়। আবার অনেক অভিভাবক তার সন্তানকে সময় দেন না। পরিবর্তে টিভির সিরিয়ালে, ফেসবুকে কিংবা চ্যাটিংয়ে ব্যস্ত থাকেন। শিশু একাকিত্বে ভুগলে স্মার্টফোনে আসক্ত হওয়ার সম্ভাবনা বেড়ে যায়। অনেক বাবা-মা শিশুকে শান্ত করতে গিয়ে হাতে স্মার্টফোন দেন। অনেক সময় শিশু খেতে না চাইলে মোবাইল ফোনে কার্টুন চালিয়ে খাওয়াতে থাকেন। এতে হয়ত শিশু শান্ত হয় কিংবা খাবারটা খেয়ে নেয়।

২০২০-২২ সাল পর্যন্ত কোভিড মহামারির আগ্রাসন পরিস্থিতি আরও খারাপ করেছে। অনলাইন ক্লাসের বদৌলতে শিশুরা হয়ে উঠেছে আরও ডিভাইস-নির্ভর।

ফারজানা ফাইরোজ নামে এক অভিভাবক বলেন, “আমার ছেলের বয়স ১২ বছর। সে ছোট থেকেই গরম ও ধুলোবালিতে যেতে পারে না। তাই আমি কখনো তাকে বাইরে খেলতে যেতে দেইনি। বাসায় মোবাইল ফোন এবং টিভিতে খেলাধুলার ভিডিও, শিক্ষণীয় ভিডিও দেখে।”

“বাচ্চাদের অবশ্যই বাইরে গিয়ে মাঠে খেলাধুলা করা উচিত। কিন্তু, বাইরে গিয়ে দুষ্টামি করছে কি-না, ব্যথা পেল কি-না এমন চিন্তা সবসময় থাকে। এর চেয়ে বাসায় সবার চোখের সামনে আছে, এটাও একটা শান্তি।”

ফারজানা একা নন, একই ধরনের চিন্তা অধিকাংশ শহুরে মায়ের। তারা মনে করেন বাইরে গিয়ে অসুস্থ হওয়ার চেয়ে সন্তান মোবাইল ফোনে শিক্ষণীয় কন্টেন্ট দেখে তাতে সমস্যা নেই। সময় পার করতে গেমস আর সুযোগ থাকলে পরিবারের অন্য সদস্যদের সঙ্গে খেলাধুলায়ও আপত্তি নেই তাদের। 

শিশু-কিশোররা যা বলছে

১৪ বছর বয়সী রাকিব। মোহাম্মদপুর রেসিডেন্সিয়াল মডেল স্কুল অ্যান্ড কলেজের ৭ম শ্রেণির এই ছাত্র কখনোই মাঠে গিয়ে খেলাধুলা করেনি।

তার দৈনিক কার্যক্রম, “সকাল থেকে দুপুর পর্যন্ত স্কুল করে বাসায় ফিরি। খাওয়া-দাওয়া করে ঘুমিয়ে পড়ি। উঠে পড়তে বসি, পড়া শেষে কিছুক্ষণ গেমস খেলি কম্পিউটারে তারপর আম্মুর কাছে পড়তে বসি।”

ছুটির দিনে কী করা হয় জানতে চাইলে সে বলে, “বিশ্রাম করি, ঘুমাই। আব্বু-আম্মুর সঙ্গে কোথাও খেতে যাই। তারপর মনমতো মোবাইলে ভিডিও দেখি অথবা গেমস খেলি।

“বাইরে যেতে ভালো লাগে না। বাইরে অনেক গরম আর ময়লা।”

ঢাকায় তার মতো অনেক শিশু-কিশোরই কখনোই মাঠে গিয়ে খেলাধুলা করেনি।

শহরে দিন দিন কমছে মাঠের সংখ্যা/ফাইল ছবি/ঢাকা ট্রিবিউন

মোহাম্মদপুর প্রিপারেটরি বয়েজ স্কুল অ্যান্ড কলেজের ষষ্ঠ শ্রেণির শিক্ষার্থী ফাহাদ। ১১ বছর বয়সী এই শিশুর ভাষ্য, “স্কুল থেকে বাসায় যাওয়ার পর কখনো খুব ক্লান্ত লাগে, আবার কখনো টিউশন থাকে। তাই বাইরে খেলতে যাওয়ার সময় পাই না। আম্মুও খুব একটা বের হতে দেয় না। আমার বন্ধুরাও তো বের হয় না, তাই আমরা সবাই মিলে প্রতিদিন বিকেল অথবা সন্ধ্যায় ভিডিও গেম খেলি।” 

মোহাম্মদপুর প্রিপারেটরি গার্লস স্কুল এন্ড কলেজের পঞ্চম শ্রেণি শিক্ষার্থী তেহরিমা ইমরানের (১০) অভিজ্ঞতা এমন,  “আম্মু কখনো একা কোথাও যেতে দেয় না। বাসার পাশে কোনো মাঠ নেই তাই যাওয়া হয়নি। মাঝে মাঝে বাবার সঙ্গে হাঁটতে যাই। পড়ার ফাঁকে একটু সময় পেলেই টিভি দেখি।” 

মোহাম্মদপুর গার্লস হাইস্কুলের একই শ্রেণির ছাত্রী নূর সাবা জানায়, “ছুটির দিনে বন্ধুরা বাসায় আসে, মাঝে মাঝে আমি যাই। সবাই মিলে গল্প করি, খেলি, মজা করি। মাঠে যেতে ভালো লাগে না, অনেক মানুষ। বাসায়ই খেলি, মোবাইল দেখি, টিভি দেখি। প্রতিদিন বিকেলে ছাদে গিয়ে খেলি।”

বিশেষজ্ঞরা যা বলছেন

শারীরিকভাবে বেড়ে ওঠার জন্য সঠিক পুষ্টির পাশাপাশি শরীরচর্চার প্রয়োজন। শিশুদের এই শরীরচর্চার সবচেয়ে ভালো উপায় হলো খেলাধুলা। শিশুদের যত বেশি সুষ্ঠু শিক্ষা, খেলা ও বিনোদনের ব্যবস্থা করা যাবে, তাদের আত্মিক বিকাশ তত সুন্দর হবে।

বাংলাদেশ মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের শিশু বিশেষজ্ঞ ডা. জেবুন্নেসা বলেন, “একটি শিশুর শারীরিক ও মানসিক বিকাশের জন্য বাইরে খেলাধুলা অত্যন্ত প্রয়োজন। খেলাধুলার মাধ্যমে চিন্তা ও সৃজনশীলতার বিকাশ ঘটে এবং শারীরিকভাবে বেড়ে উঠতেও সহায়তা করে। ছোটবেলা থেকেই খেলাধুলা না করা হলে প্রাপ্তবয়স্ক হওয়ার আগেই তারা বিভিন্ন রোগ এবং জটিলতায় ভুগতে পারে।”

এ বিষয়ে আইন ও সালিশ কেন্দ্রের মনোরোগ বিশেষজ্ঞ ডা. ওয়াহিদা পারভীন বলেন, “একটি শিশুর মানসিক স্বাস্থ্যের জন্য সবচেয়ে বেশি প্রয়োজন মানুষের সঙ্গে যোগাযোগ রাখা। এতে তারা মিশতে শিখবে, কথা বলতে শিখবে। একটি শিশু যদি সারাদিন বাসায় পরিচিতজনদের মধ্যে থাকে এবং মোবাইলেই মুখ গুঁজে রাখে তবে তার সঠিক মানসিক বিকাশ ঘটবে না।”

তিনি মনে করেন, “সারাদিন একই ধরনের ক্রিয়াকলাপ শিশুদের ভালো লাগে না। সেজন্য বাবা-মায়ের উচিত সন্তানকে নিয়মিত বাইরে খেলতে দেওয়া বা তাদের নিয়ে হাঁটতে যাওয়া। এতে তারা বাইরের পরিবেশে নিজেকে মানিয়ে নিতে পারবে।”

এই মনোবিদ বলেন, “সুস্থতার জন্য শরীরকে সচল রাখতে হয়। খেলাধুলা শরীরের পাশাপাশি মানসিক সুস্থতাও দিয়ে থাকে। অবসরে ঘরে বসে থাকলে মানসিক বৈকল্য আসে। তার নজিরও বর্তমান সময়ে আমাদের চারপাশেই দেখা যাচ্ছে। আজকাল কোনো কোনো শিশু শীতাতপ নিয়ন্ত্রিত বাড়ি থেকে বেরিয়ে গাড়ি চড়ে, তারপর একই পরিবেশের ক্লাসরুমে ঢোকে। রোদ-বৃষ্টি-হাওয়ার স্পর্শ তারা পায়ই না।”

এভাবে একটি নাজুক প্রজন্ম গড়ে উঠছে বলে হতাশা প্রকাশ করেন ডা. ওয়াহিদা।