“...ছেঁড়া প্যান্ট পইরা ঘুরি আমি গাল্লি বয়।” সাড়া জাগানো একটি গানের লাইন এটি। গানে গানে ঢাকাইয়া গাল্লি বয় রানা তার জীবনসংগ্রামের গল্প বলেছিল। এই গাল্লি বয় তথা পথশিশুদের জীবনের সঙ্গে মিলে যায় জেমসের একটি গানের কথাও- “পথের বাপই বাপরে মনা পথের মা-ই মা, পথের বুকেই খুঁজে পাবি আপন ঠিকানা।”
পথশিশুদের নিয়ে এসব বিখ্যাত গানের কথা, সুর বেদনা জাগায়। তবে কেবল গানে গানেই তাদের দুর্দশা বর্ণনা সম্ভব নয়। কেন তারা পথে, কেমন তাদের জীবন, কোথায় তাদের বিনোদন এসব প্রশ্নের উত্তর সবারই কম-বেশি জানা।
রাজধানী ঢাকার অলি-গলিতে বিচরণ করা পথশিশুদের বেশিরভাগই মাদকাসক্ত। বিশেষ ধরনের সহজলভ্য মাদক “ড্যান্ডি”-তে তাদের আসক্তির কথাও সর্বজনবিদিত। ডেনড্রাইট নামের গামটি পথশিশুদের কাছে নেশাদ্রব্য হিসেবে জনপ্রিয়। মূলত জুতা সারাই, ইলেক্ট্রনিক্স পণ্য মেরামতে এটি ব্যবহৃত হয়।
কেন তারা এই পথে, আসক্তির উৎসাহ তারা কোথায় পায়, ড্যান্ডি সেবনে তাদের শরীর ও মনে কী ধরনের প্রভাব পড়ে- সেসব প্রশ্নের উত্তর নতুন করে খোঁজার চেষ্টা করেছে ঢাকা ট্রিবিউন।
কঠিন জীবনসংগ্রাম
ঠিকানাবিহীন বেশিরভাগ পথশিশুর কপালেই বাবা-মায়ের আদর জোটেনি। আবার কেউ হয়ত বাবার স্নেহ বঞ্চিত, কেউ আবার বিমাতার রোষানলের শিকার। অনেকের আবার অভিভাবক বলতে কেউই নেই। তাই পথই তাদের ঠিকানা, আপনজন।
পেটের দায়ে তারা যান্ত্রিক নগরীর নির্মম বাস্তবতার সঙ্গে লড়ে যায় প্রতিনিয়ত। কিছু একটা করে দু মুঠো খাবার যোগাড়ের জন্য তাদের দেখা মেলে ফুটপাত, রেলস্টেশন, বাস স্টেশন, লঞ্চ টার্মিনাল, পার্ক, পদচারী সেতু ইত্যাদি জায়গায়।
রাজধানীর লালবাগ এলাকায় একটি ভাঙা কারখানার ভেতরে কয়েকজন ছিন্নমূল শিশু-কিশোর আড্ডা দিচ্ছিল। ১০-১৬ বছর বয়সী প্রতিটি শিশু ড্যান্ডিতে আসক্ত।
নেশায় আচ্ছন্ন হয়ে থাকা এসব শিশুর সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, প্রধানত ক্ষুধা মেটাতে তারা ড্যান্ডি সেবন করে। দীর্ঘদিন ধরে তারা এই নেশায় আসক্ত।
ওই কিশোরদের মধ্যে ১৪ বছর বয়সী একজনের ভাষ্য, “ক্ষুধা লাগলে কাছে-পিঠে কোথাও থেকে ৩০ টাকা দিয়ে আঠা কিনে পলিথিনে ভরে গন্ধ নিই। তারপর খুব খুশি খুশি লাগে, আবার ঘুমও আসে। তখন রাস্তার পাশেই ঘুমিয়ে যাই।”
ছোটবেলায় মাকে হারানোর পর সংসারে আসেন সৎ মা। বুঝে ওঠার বয়স না হতেই তাকে হতে হয় ঘরছাড়া। এক সময় ময়লার স্তূপে কাজ করত। কাজ শেষে সেখানেই চোখ বুঁজত। সেই জীবন ভালো না লাগায় ছেড়ে দেয় সে। এরপর শুরু হয় পথে পথে ভিক্ষাবৃত্তি।
তার ভাষ্য, “সারাদিনের আয়ে একবেলা খাবার জোটে কোনোমতে। বাকি দুই বেলা নেশা করেই পেট ভরতে হয়।”
প্রথম প্রথম ঘ্রাণটা ভালো না লাগলেও ধীরে ধীরে তা অভ্যাসে পরিণত হয়। “একবার ড্যান্ডির ঘ্রাণ নিলে সারাদিন মাথা ঝিম ঝিম করে, কারও কথা মনে পড়ে না।” এই অনুভূতিই তার ভালো লাগে।
ঢাকার গুলিস্তান,মালিবাগ, তেজগাঁও, বাংলামটর, নবাবপুর এলাকায় আরও পথশিশুকে এভাবেই নেশায় বুঁদ হয়ে থাকতে দেখা যায়। এদের কেউ একা, কেউ কেউ আবার দলবেঁধে মাদক সেবন করে।
১২ বছর বয়সী মুবিন ছোটবেলায় বাবাকে হারায়। মা একদিন তাকে নানা-নানির গুলিস্তানের বাসায় রেখে চলে যান। নানার বাড়ির লোকজনের বাজে আচরণে অতিষ্ট হয়ে সেই বাসা ছেড়ে বেরিয়ে পড়ে সে।
মুবিন কখনো স্কুলে যায়নি। ১২ বছর বয়সে এসে তার আর পড়াশোনার ইচ্ছাও নেই।
তার মতে, “পড়াশোনা করা অনেক কষ্টের।”
নানাবাড়ি থেকে বেরিয়ে গুলিস্তানের একটি চায়ের দোকানে কাজ নেয় মুবিন। সেখানে থাকা-খাওয়ার সুযোগ ছিল। কিন্তু একদিন মালিক প্রচণ্ড বকা দিলে কাজ ছেড়ে দেয় সে।
এরপর তার রাস্তার জীবন শুরু। খাওয়ার টাকার জন্য ভিক্ষাবৃত্তি শুরু করে মুবিন। এরপর ধীরে ধীরে আর দশটা পথশিশুর মতো সে-ও মাদকাসক্ত হয়ে পড়ে।
বিশেষজ্ঞরা যা বলছেন
বাংলাদেশ শিশু অধিকার ফোরামের তথ্য বলছে, পথশিশুরা শিক্ষা, স্বাস্থ্য, পুষ্টিসহ প্রায় সব ধরনের অধিকার থেকে বঞ্চিত। তাদের ৮৫%-ই প্রত্যক্ষভাবে মাদকাসক্ত।
জরিপে উঠে এসেছে, ঢাকা শহরে অন্তত দুইশ জায়গায় ৯ থেকে ১৮ বছর বয়সী শিশু-কিশোররা নিয়মিত মাদক সেবন করে থাকে। পথশিশুরা সাধারণত গাঁজা, ড্যান্ডি, পেট্রোল ইত্যাদি দিয়ে নেশা করে থাকে।
এ বিষয়ে কথা হয় জাতীয় মানসিক স্বাস্থ্য ইনস্টিটিউটের মানসিক এবং মাদকাসক্তি বিভাগের অধ্যাপক ড. মো. গোলাম রাব্বানীর সঙ্গে। তিনি বলেন, “মাদক সেবনের কারণে শিশু-কিশোরদের মধ্যে হঠাৎ রেগে যাওয়া বা উত্তেজিত হওয়ার প্রবণতা, রাতে বিছানায় প্রস্রাব করা বা মুখ থেকে লালা বের হওয়ার মতো বিভিন্ন অসুখ দেখা দিতে পারে। মূলত পরিবার বিছিন্ন হওয়া, অবহেলা ইত্যাদি কারণে এসব শিশু মাদক সেবনে জড়িয়ে পড়ে।”
এই বিশেষজ্ঞ মনে করেন, অসৎ সঙ্গ, মাদকের সহজলভ্যতা, বাবা-মায়ের যত্নের অভাব ইত্যাদি কারণে মাদক সেবনের প্রবণতা দেখা দেয়।
তিনি আরও বলেন, “ড্যান্ডি নামের নেশাদ্রব্যটি স্বল্পমূল্যে পাওয়া যায়। পাশাপাশি বিক্রেতাদের অসচেতনতার কারণে সুবিধাবঞ্চিত শিশু-কিশোররা এর মাধ্যমে শারীরিক ও মানসিকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে।”
বাংলাদেশ মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের শিশু বিশেষজ্ঞ ডা. জেবুন্নেসা বলেন, “শিশুরা এই নেশাজাতীয় জিনিসটির ঘ্রাণ নিয়ে নেশা করে। এর মিষ্টি ঘ্রাণ মাথায় গিয়ে এক রকমের আনন্দ-উত্তেজনার সৃষ্টি করে। তখন তাদের ভেতর এক ধরনের ভালোলাগা অনুভূত হয়। কিন্তু এই অনুভূতি ক্ষণস্থায়ী। ফলে তারা বার বার নেশায় লিপ্ত হতে থাকে।”
সতর্ক করে দিয়ে তিনি বলেন, “এই ঘ্রাণ শরীরের বিভিন্ন কোষ নষ্ট করে দেয়। ফলে মস্তিষ্কের কার্যপ্রক্রিয়ায় অস্বাভিকতা দেখা দেয়। শিশুদের জন্য এর ফলাফল ভয়ঙ্কর।”
এ বিষয়ে জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক ড. মো. সুবহান নূর ঢাকা ট্রিবিউনকে বলেন, “এই সমস্যা রাতারাতি বন্ধ হবে না। এজন্য দীর্ঘমেয়াদী পরিকল্পনার প্রয়োজন। মাদকাসক্ত পথশিশুদের স্বাভাবিক জীবনে আনতে অবশ্যই বড় উদ্যোগ প্রয়োজন।”