ডয়চে ভেলের ডকুমেন্টারির অভিযোগ খতিয়ে দেখবে যুক্তরাষ্ট্র, বাংলাদেশকেও আহ্বান

বাংলাদেশ পুলিশের এলিট ফোর্স র‌্যাপিড অ্যাকশন ব্যাটালিয়ন (র‍্যাব) নিয়ে জার্মানভিত্তিক সংবাদমাধ্যম ডয়চে ভেলের প্রতিবেদনে করা অভিযোগ খতিয়ে দেখবে যুক্তরাষ্ট্র। একই সঙ্গে বাংলাদেশ সরকারকেও প্রতিবেদনটিকে আমলে নিতে আহ্বান জানিয়েছে দেশটি। 

শুক্রবার (৭ এপ্রিল) যুক্তরাষ্ট্রের পররাষ্ট্র দপ্তরের উপ-প্রধান মুখপাত্র বেদান্ত প্যাটেলের এই আহ্বানের কথা জানিয়েছে ঢাকার মার্কিন দূতাবাস। 

বেদান্ত প্যাটেল বলেছেন, “মানবাধিকার লঙ্ঘনকারীদের অবশ্যই জবাবদিহির আওতায় আনতে হবে। এই ভিডিওতে থাকা অভিযোগ অত্যন্ত সাবধানতার সঙ্গে খতিয়ে দেখব এবং আমরা আশা করি বাংলাদেশ সরকারও তাই করবে।”

তবে ডয়চে ভেলের এ প্রতিবেদনকে “ভিত্তিহীন” হিসেবে উল্লেখ করেছে পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়। বৃহস্পতিবার (৬ এপ্রিল) পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র সেহেলি সাবরীন এ কথা জানান।

সম্প্রতি ডয়চে ভেলে র‌্যাবের বিচারবহির্ভূত হত্যাকাণ্ড নিয়ে একটি প্রতিবেদন প্রকাশ করে। প্রতিবেদনে বাহিনীটির দুজন কমান্ডারের সাক্ষাৎকার প্রকাশিত হয়। সাক্ষাৎকারে ওই দুজন বর্ণনা দেন কীভাবে এবং কাদের নির্দেশে র‌্যাব বিচারবহির্ভূত হত্যাকাণ্ডগুলো ঘটায়।

প্রতিবেদনের সার সংক্ষেপে বলা হয়, বাংলাদেশের র‌্যাবের সংগঠিত গুরুতর মানবাধিকার লঙ্ঘনের দিকে নতুন করে দৃষ্টি দেওয়া হয়েছে। দুইজন হুইসেলব্লোয়ার দাবি করেছেন যে উচ্চপদস্থ রাজনীতিবিদরা রাজনৈতিক প্রতিপক্ষকে দমনে এই অভিজাত বাহিনীকে ব্যবহার করছেন। এই প্রথমবারের মতো র‌্যাবের দুজন সাবেক কমান্ডার, নিরাপত্তার কারণে যাদের পরিচয় গোপন রাখা হয়েছে। হত্যা, নির্যাতন এবং গুমের মতো ঘটনা কীভাবে বাহিনীটি ঘটাচ্ছে তার বিস্তারিত বর্ণনা দিয়েছেন তারা। 

আর ও বলা হয়, ব্যাপক মানবাধিকার লঙ্ঘনের অভিযোগ থাকা সত্ত্বেও বছরের পর বছর ধরে যুক্তরাষ্ট্র ও অন্যান্য পশ্চিমা দেশগুলো র‌্যাবকে প্রশিক্ষণ ও সজ্জিত করেছে। প্রতিটি অপারেশন সাবধানতার সঙ্গে পরিকল্পিতভাবে সময় নিয়ে করে র‌্যাব। শিকারদের সাধারণত গভীর রাতে তোলা হয় এবং বিশেষ সেলে নিয়ে যাওয়া হয়। এভাবে বিচারবহির্ভূত হত্যাকাণ্ড করে এসেছে র‌্যাব। বাহিনীটির কয়েকজন কর্মকর্তার ওপর মার্কিন নিষেধাজ্ঞার পরে তা কমে যায়। 

একরাম হত্যা

ডয়েচে ভেলের ডকুমেন্টারিটিতে ২০১৮ সালের ২৬ মে টেকনাফ পৌরসভার ৩ নম্বর ওয়ার্ডের কাউন্সিলর ও যুবলীগ নেতা একরামুল হকের কথিত বন্দুকযুদ্ধে নিহত হওয়ার বিবরণ এসেছে। বিবরণে দাবি করা হয়েছে, র‌্যাব তাদের লক্ষ্যবস্তুকে পরিকল্পিতভাবে হত্যা করার পরে “ক্রসফায়ার নাটক” তৈরি করেছে। আর এভাবে হত্যাকাণ্ড ঘটিয়ে র‌্যাব সদস্যরা প্রতিটি হত্যার জন্য পয়েন্ট পান।

একরামের মৃত্যুর ছয় দিন পর, তার স্ত্রী আয়েশা বেগম কক্সবাজারে একটি সংবাদ সম্মেলন করেন, যেখানে তিনি দাবি করেন তার স্বামীকে “বন্দুকযুদ্ধ”র নামে হত্যা করা হয়েছে।

তিনি সেই সংবাদ সম্মেলনে দাবি করেন, “২০১৮ সালের ২৬ মে রাতে নিরাপত্তা বাহিনীর একজন কর্মকর্তা আমার স্বামীকে বাড়ি থেকে জোর করে ধরে নিয়ে যায়। তিনি আমাদের ছেড়ে চলে যাওয়ার পর আমার মেয়ে এবং আমি তার সাথে ফোনে কথা বলেছিলাম। আমরা যখন তার সাথে শেষ কথা বলি, তখন সে আতঙ্কিত ছিল। ফোন কল চলতে থাকে এবং গুলির শব্দ ও চিৎকার শোনা যায়। তখনই আমি বুঝতে পারি যে আমার স্বামীকে ঠাণ্ডা মাথায় হত্যা করা হয়েছে।”

একরামের মৃত্যুর পরপরই স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আসাদুজ্জামান খান কামাল গণমাধ্যমকে বলেন, “একজন ম্যাজিস্ট্রেটকে হত্যাকাণ্ডের তদন্তের দায়িত্ব দেওয়া হবে এবং তার মৃত্যুর জন্য দায়ী ব্যক্তিদের বিরুদ্ধে কোনো অন্যায় থাকলে তাদের আইনের আওতায় আনা হবে।”

জাতীয় মানবাধিকার কমিশনের (এনএইচআরসি) চেয়ারম্যান কাজী রিয়াজুল হক এবং আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক ওবায়দুল কাদেরও সুষ্ঠু তদন্ত ও দ্রুত বিচারের প্রতিশ্রুতি দিয়েছেন।

মানবাধিকার লঙ্ঘনের অভিযোগে মার্কিন পররাষ্ট্র দপ্তর তৎকালীন র‌্যাব প্রধান বেনজীর আহমেদসহ সাবেক ও বর্তমান কর্মকর্তাদের ওপর নিষেধাজ্ঞা আরোপের পর বিষয়টি ফের সামনে আসে।

গত বছরের ২৯ সেপ্টেম্বর পুলিশের মহাপরিদর্শক হিসেবে তার কার্যালয়ের শেষ দিনে গণমাধ্যমের সঙ্গে কথা বলার সময় বেনজির বলেন, একরামের মৃত্যুর ঘটনায় ম্যাজিস্ট্রেট তদন্তসহ বেশ কিছু তদন্ত করা হয়েছে।

তিনি আরও বলেন, “আমি বাহিনী ছাড়ার আগে একটি অভ্যন্তরীণ তদন্তেরও নির্দেশ দিয়েছিলাম। এটা আমার ব্যক্তিগত ক্ষমতায় ঘটেনি। অফিসিয়াল দায়িত্ব পালনের সময় এটা ঘটেছে। তবে ঘটনায় নিহত ব্যক্তির সঙ্গে ব্যক্তিগত কোনো বিরোধ নেই।” 

বেনজির আরও বলেছিলেন, “এটা কোনো ব্যক্তিগত বিষয় নয়। আমরা অনেকেই একে ব্যক্তিগত বিষয় হিসেবে চিহ্নিত করার চেষ্টা করি। যারা দায়িত্ব পালন করতে গেছেন তাদের অনেকেই তাকে চিনতেন না। ফলে একে ব্যক্তিগত বিষয় হিসেবে নেওয়ার পন্থা সঠিক নয়। যারা আমাদের দায়িত্ব পালন করে, তারা সরকারি দায়িত্ব পালন করে। আমাদের কোনো সহকর্মী ম্যান্ডেটের বাইরে গেছেন কি-না, ম্যান্ডেট লঙ্ঘন করেছেন কিনা তা দেখার দায়িত্ব আমাদের। কেউ বাড়াবাড়ি করলে আইনি ব্যবস্থা নেওয়া হবে।”

গুম

ডকুমেন্টরিতে “মায়ের ডাক” নামে একটি সংগঠনের এক সদস্যের বক্তব্য নেওয়া হয়েছে। সংগঠনটিতে “গুম হওয়া ব্যক্তিদের পরিবারের সদস্যরা রয়েছে। তাদের একজন সানজিদা ইসলামের সাক্ষাৎকার প্রচার করা হয়েছে। সানজিদার ভাইকে ১০ বছর আগে র‌্যাব সদস্যরা তুলে নিয়েছিল বলে অভিযোগ রয়েছে।

সেখানে এক শিশুর একটি ফাইল ক্লিপও প্রকাশ করা হয়েছে। যেখানে শিশুটিকে ক্রন্দনরত অবস্থায় তার বাবার খোঁজ চাইতে শোনা যায়।

ডকুমেন্টরিটিকে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় “ভিত্তিহীন ও বানোয়াট” বলে দাবি করেছে।