নারী ইউপি সদস্যের সংসার চলে চা বিক্রি করে, করেন জনসেবাও

স্বামী, সন্তান নিয়ে তিনজনের পরিবারের রোজগারের জন্য চা বিক্রি করতেন মোছা. ফরিদা খাতুন। এর মধ্যেই ২০১৭ সালে এলাকাবাসীর অনুরোধে ইউপি সদস্য পদে নির্বাচন করেন, জিতেও যান। ভালো কাজের পুরস্কার হিসেবে ২০২২ সালের নির্বাচনেও দ্বিতীয়বারের মতো জিতে যান তিনি। তবে পুরনো পেশা ছাড়েননি ফরিদা। চালিয়ে যাচ্ছেন চা বিক্রি। স্থানীয় জনগণই তার ক্রেতা। ইউপি সদস্য হয়েও তার এই জীবনযাপনের ব্যতিক্রমী গল্প সুনাম কুড়াচ্ছে।

সম্প্রতি কুষ্টিয়ার খোকসা উপজেলার শিমুলিয়া ইউনিয়নে ৭, ৮ ও ৯ নম্বর ওয়ার্ডের সংরক্ষিত নারী আসনে দ্বিতীয়বারের মতো জয়লাভ করেন মোছা. ফরিদা খাতুন।

তিনি জানান, জীবন জীবিকার তাগিদে স্থানীয় বশোয়া বাজারে চায়ের দোকান চালাচ্ছেন।

ফরিদা খাতুন ঢাকা ট্রিবিউনকে বলেন, “এলাকার মানুষের অনুরোধ ও সম্মতিতে ইউপি সদস্য পদে নির্বাচন করি। সেই নির্বাচনে এলাকার ভোটাররা নিজেরাই প্রচার-প্রচারণা করেছেন। তারাই ভোটের খরচ জুগিয়েছেন।”

এই ইউপি সদস্যের বাড়ি গিয়ে দেখা যায়, দোচালা ছোট টিনের ঘরে স্বামী-সন্তান নিয়ে থাকেন তিনি। এই বাড়ি ছাড়া আর কোনো সম্পদও নেই তার।

অর্থবিত্তহীন এই নারীর জনপ্রিয়তার কারণ কী এমন প্রশ্নে স্থানীয়রা জানান, সততা, মানুষের পাশে দাঁড়ানোর মানসিকতাই ফরিদা খাতুনকে জনগণের আপন করে তুলেছে। এছাড়া নিজের বাবার বাড়ির জমি বিক্রি করে গ্রামের রাস্তা বানিয়ে দিয়েও মানুষের আস্থা কুড়িয়েছেন তিনি।

শিমুলিয়া ইউনিয়নের বাসিন্দা ৬০ বছর বয়সী আলতাফ মোল্লা বলেন, “সে দুইবার মেম্বার হলেও এখনও চা বিক্রি করে সৎভাবে রোজগার করে। সে সবসময় চেষ্টা করে মানুষের জন্য কাজ করার।”

একই এলাকার বাসিন্দা জাকের মোল্লা বলেন, “কেউ বিপদে পড়লে রাতের আঁধারে ডাকলেও ফরিদাকে পাওয়া যায়। নিজের টাকা খরচ করে সে মানুষের পাশে দাঁড়ায়।”

গ্রামের মানুষই ইউপি সদস্য বানিয়েছে উল্লেখ করে ফরিদা খাতুন বলেন, “আমার জায়গা-জমি নেই। চা বিক্রি করে সংসার চালাই। এজন্য মানুষের সুখ-দুঃখের কথা শুনতাম। তখন ভেবেছি, যদি মানুষের সেবা করতে পারতাম! তবে সাধ থাকলেও সাধ্য ছিল না। একপর্যায়ে গ্রামের মানুষই আমাকে ইউপি সদস্য বানায়। তবে আমি আমার এই পেশাও চালিয়ে যাচ্ছি। ইউনিয়ন পরিষদের যে ভাতা পাই, সেটিও মানুষের জন্য ব্যয় করি।”

তিনি আরও বলেন, “আমি ২০০২ সালে এসএসসি পাশ করি। এরপর অভাবের কারণে পড়তে পারিনি। আমি চেষ্টা করি আমার এলাকায় প্রতিটি শিশুর পড়াশোনা নিশ্চিত করার।”

দুই কাজে সমন্বয় কীভাবে করেন জানতে চাইলে এই ইউপি সদস্য বলেন, “প্রায়দিনই বিভিন্ন সভা থাকে। সেগুলোতে যেতে হয়। দূরে যেতে হলে ভোরে দোকান খুলে কিছু সময় চা বিক্রি করে সেখানে যাই। আবার ফিরে এসে দোকান খুলি। আমার দোকানটা অফিসের মতো। অনেকেই এখানেই সমস্যা নিয়ে আসে। চা বিক্রির পাশাপাশি এসব কাজও করে দেই। এক বেলা দোকান না খুললে অনেককে ঘুরে যেতে হয়। তাই নিয়মিত দোকান খুলি।”

শিমুলিয়া ইউনিয়ন পরিষদের (ইউপি) চেয়ারম্যান আব্দুল কুদ্দুস বলেন, “ফরিদা খাতুন একজন দায়িত্ববান জনপ্রতিনিধি। তিনি তার দায়িত্ব পালনের পাশাপাশি একটি চায়ের দোকান চালান। আমরা পরিষদ থেকে তাকে সাধ্যমতো সহযোগিতার চেষ্টা করি।”