ফরিদপুরে পানির সংকটে ‘কবর’ খুঁড়ে পাট জাগ

২০২৩ সালকে পাটপণ্য বর্ষ ঘোষণা করা হয়েছে। অথচ এ বছরেই একর পর এক হতাশার কথা জানাচ্ছেন কৃষকেরা। তারা বলছেন, একদিকে পাট জাগ দেওয়ার মতো কোনো জলাশয় বা পানির উৎস পাচ্ছেন না তারা। অন্যদিকে খরচ দ্বিগুণ বেড়ে গেলেও পাটের ন্যায্যমূল্য থেকে বঞ্চিত হচ্ছেন তারা।

দেশের অন্যান্য অঞ্চলের মতো ফরিদপুরের সালথায়ও দেখা দিয়েছে তীব্র পানির সংকট। পাট জাগ দেওয়ার মতো কোনো জলাশয় পাচ্ছেন না কৃষকরা। পাট জাগ দিতে না পেরে বিকল্প হিসেবে বসত-বাড়ির আঙ্গিনায়, পতিত জমি ও বাগানের ভেতর কবরের মতো মাটি খুঁড়ে গর্ত করে তাতে পাট জাগ দেওয়া হচ্ছে। এতে পাটের গুণগতমান নষ্ট হচ্ছে।

অনেকে কোনো দিক-দিশা না পেয়ে পাট কাটা বন্ধ রেখেছেন। ফলে ক্ষেতেই শুকিয়ে মরে যাচ্ছে পাট। পাট জাগ দেওয়ার মতো তেমন পানি নেই। খাল-বিল, পুকুর, নিচু জমি ও জলাশয়গুলোতে তীব্র পানির সংকট।

কৃষকরা বলছেন, গর্ত করে ডিজেলচালিত সেচ যন্ত্রের সাহায্যে পাট জাগ দিতে তাদের দ্বিগুণ খরচ হচ্ছে। তবে নিরুপায় হয়ে এটিই করতেক হচ্ছে তাদের। আবার দ্বিগুণ টাকা দিয়েও শ্রমিক পাওয়া যাচ্ছে না। দেশের বিভিন্ন এলাকা থেকে শ্রমিক কিনে এনে পাট কাটতে হচ্ছে।

সরেজমিনে তেলিসালথা গ্রামে দেখা যায়, একটি মেহগনি বাগানের ভেতর মাটি খুঁড়ে কবরের মতো ছোট ছোট গর্ত করে অভিনব কায়দায় পাট জাগ দিচ্ছেন সুজন লস্কর নামে স্থানীয় এক কৃষক। দূর থেকে দেখলে প্রথমে মনে এটিকে কোনো কবরস্থান মনে হবে।

সুজন লস্কর বলেন, “পানি সংকটের কারণে বাধ্য হয়ে নিজের বাগানে কবর খুঁড়ে পাট জাগ দিচ্ছি। শুধু আমি একা নয়, আমার মতো অনেকে এভাবে পাট জাগ দিচ্ছে।”

ইয়াদ আলী লস্কর নামে আরেক কৃষক বলেন, “এ বছর মাঝে মাঝে বৃষ্টি হলেও জলাশয়গুলোতে একফোঁটা পানিও জমেনি। পুকুরেও পর্যাপ্ত পানি নেই। এমন অবস্থায় কিছু কৃষক কুমার নদের পানিতে পাট জাগ দিচ্ছে। কেউ গর্ত করে পাট জাগ দিচ্ছে। পাট এখন আমাদের গলার কাঁটা হয়ে দাঁড়িয়েছে।”

পাট চাষে এত কষ্ট করেও ন্যায্যমূল্য না পাওয়ার অভিযোগ তোলেন একই গ্রামের আরেক কৃষক নূর ইসলাম। তিনি বলন, “একজন কৃষকের মজুরি দিনে ৮০০ টাকা। মেশিন দিয়ে পাট জাগ দিতে হচ্ছে। এতে খরচ বেড়েছে দ্বিগুণ। অথচ বাজারে গেলে হতাশা ছাড়া কিছু মেলে না। পাটের দাম নেই। বর্তমানে পাট বিক্রি হচ্ছে প্রতিমণ ১৫০০ থেকে ১৮০০ টাকায়।”

উপজেলা কৃষি অফিস থেকে রেবন রেটিং মেশিনের সাহায্যে কাঁচা পাটের আঁশ ছাড়িয়ে তা পঁচানোর পদ্ধতি শেখানো হচ্ছে কৃষকদের। তবে কৃষকরা বলছেন, এতে তারা কোনো উপকার পাচ্ছেন না। বরং এই শিখন পদ্ধতির জন্য অযথা সরকারি টাকার খরচ হচ্ছে।

উপজেলা উপ-সহকারী পাট উন্নয়ন কর্মকর্তা মো. আব্দুল বারী বলেন, “রেবন রেটিং মেশিন মাধ্যমে ছাড়াও সালথায় অন্তত ৮টি জায়গায় মাটি খুঁড়ে গর্ত করে অল্প পানিতে পাটের আটি পলিথিনের দিয়ে পেঁচিয়ে জাগ দেওয়ার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।

সালথা উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা সুদর্শন শিকদার বলেন, “সালথায় ১২ হাজার ৩৩০ হেক্টর জমিতে পাটের চাষ হয়েছে। পানির অভাবে কৃষকরা দুশ্চিন্তায় আছেন। তবে এই বিষয় সমাধানে আমাদের কিছু করার নেই।

সালথা উপজেলা নির্বাহী অফিসার মো. আক্তার হোসেন শাহিন বলেন, “পানি সংকটের বিষয়টি সালথা ও ফরিদপুরের জন্য জনগুরুত্বপূর্ণ বিষয়। পানির পরিমাণ কম হওয়ায় পাট চাষিরা দুর্ভোগের মধ্যে আছেন। পানি সংকটের বিষয়টি ইতোমধ্যে পানি উন্নয়ন বোর্ডকে জানানো হয়েছে। ফরিদপুর সিঅ্যান্ডবি ঘাটের স্লুইচ গেটটি খুলে দেওয়ার ব্যবস্থা করা হচ্ছে।”

সম্প্রতি বস্ত্র ও পাটমন্ত্রী গোলাম দস্তগীর গাজীও পাট চাষ কেন্দ্রীক নানা সমস্যা নিয়ে কথা বলেন। তিনি শঙ্কা প্রকাশ করেন, ন্যায্যমূল্য না পেলে কৃষকরা পাট চাষ ছেড়ে দেবেন। পাটের ন্যায্যমূল্য নিশ্চিত করার আহ্বান জানান তিনি।

পাট জাগ দেওয়ার বিষয়ে তার বক্তব্য, পাটের আইন ঠিকমত মানতে হবে। দেশের খানা-খন্দগুলো বিভিন্ন দপ্তর মাছ চাষের জন্য লিজ দিয়ে রেখেছে। ভবিষ্যতে পাট জাগ দেওয়ার জায়গা রেখে লিজ দেওয়ার আহ্বান জানান তিনি।

প্রসঙ্গত, রপ্তানি ব্যুরোর তথ্যানুযায়ী, ২০২১-২২ অর্থবছরে পাট ও পাট পণ্য রপ্তানিতে প্রায় ১১৩ কোটি ডলার আয় হয়েছে। বাণিজ্যমন্ত্রী টিপু মুনশি জানিয়েছেন, পাট খাতের বৈশ্বিক রপ্তানি আয়ের ৭২% এখন বাংলাদেশের দখলে। এছাড়া দেশের অভ্যন্তরীণ বাজারে কেবল ব্যাগের চাহিদা ১০ কোটি থেকে ৭০ কোটিতে উন্নীত হয়েছে। অন্যান্য পাট পণ্যের চাহিদা রয়েছে প্রায় হাজার কোটি টাকার।