শৈশব এবং যৌবনের মধ্যবর্তী পর্যায় অর্থাৎ ১০ থেকে ১৯ বছর বয়স পর্যন্ত সময়কালকে বলা হয় বয়ঃসন্ধিকাল। এ সময়টি প্রতিটি মানুষের জীবনে গুরুত্বপূর্ণ। এই সময়কালে বাবা-মায়ের সঠিক পরিচর্যা সন্তানকে সুন্দর মানসিকতা নিয়ে গড়ে উঠতে সহায়ক।
বয়ঃসন্ধিকালে সন্তানদের সঙ্গে বাবা-মায়ের সম্পর্ক বিকশিত হয়। তাই সন্তানদের নানামাত্রিক চাহিদা পূরণের জন্য অভিভাবকদের নতুন দক্ষতা এবং কৌশল প্রয়োজন।
সোমবার (১৩ নভেম্বর) এ বিষয়ে ইউনিসেফের সহায়তায় একটি গোলটেবিল বৈঠকের আয়োজন করে ডেভলপমেন্ট রিসার্চ নেটওয়ার্ক (ডিনেট)। “কিশোরদের মানসিক স্বাস্থ্য; কিশোর-কিশোরীদের মানসিক সুস্থতা নিশ্চিত করতে চ্যালেঞ্জ এবং সম্ভাব্য সমাধান”- শীর্ষক এই আয়োজনে বয়ঃসন্ধিকালে সন্তানের সঙ্গে মা-বাবা, শিক্ষকের সম্পর্ক নিয়ে আলোচনা করা হয়। পাশাপাশি বয়ঃসন্ধিকালে কিশোর-কিশোরীদের বিভিন্ন সমস্যার কথা তুলে ধরা হয়।
বৈঠকে উঠে আসে কিশোর কিশোরীদের মানসিক স্বাস্থ্য নিয়ে বিভিন্ন তথ্য। সমীক্ষার বরাত দিয়ে এতে বলা হয়, বিশ্বব্যাপী ১০-১৪ বছর বয়সীদের ৩.৬% এবং ১৫-১৯ বছর বয়সীদের ৪.৬% উদ্বিগ্নতায় ভোগে।
এছাড়া, বিষণ্নতার শিকার ১০-১৪ বছর বয়সী ১.১% কিশোর এবং ১৫-১৯ বছর বয়সীদের মধ্যে ২.৮%। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার গ্লোবাল হেলথ এস্টিমেট (২০০০-২০১৯) অনুসারে, ১৫-১৯ বছর বয়সী কিশোরদের মৃত্যুর চতুর্থ সর্বোচ্চ কারণ হলো আত্মহত্যা।
কিশোর-কিশোরীদের মানসিক স্বাস্থ্য বিষয়ক আলোচনায় এ সংক্রান্ত সমস্যায় মা-বাবা ও শিক্ষকের ভূমিকার কথা বেশ গুরুত্বের সঙ্গে উঠে আসে।
এ বিষয়ে মেন্টাল হেলথ ফার্স্ট এইডের কান্ট্রি লিড মনিরা রহমান বলেন, “সন্তানদের সুস্থতা চাইলে মায়ের স্বাস্থ্য নিয়ে সচেতন হতে হবে। পোস্টপার্টাম ডিপ্রেশন নিয়ে সচেতনতা বাড়াতে হবে। মায়ের মানসিক স্বাস্থ্যের কথা ভাবলে সন্তানের মানসিক স্বাস্থ্যও ভালো থাকবে।”
কিশোর-কিশোরীদের দিনের একটি বড় অংশ স্কুলে কাটে। এমন সময় শিক্ষকদের মানসিক স্বাস্থ্য কিংবা তাদের ব্যবহারও শিক্ষার্থীদের মানসিক স্বাস্থ্যে খুব গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা।
এ বিষয়ে ব্র্যাক ইনস্টিটিউট অব এডুকেশনাল ডেভেলপমেন্টের মানসিক স্বাস্থ্য ও মনোসামাজিক সহায়তা প্রোগ্রামের ডেপুটি কো-অর্ডিনেটর মেরিন সুলতানা বলেন, “আমি কাজ করতে গিয়ে যে বিষয়টি লক্ষ্য করি, কিশোর-কিশোরীরা আজকাল বাবা-মা কিংবা শিক্ষকের চেয়ে বন্ধুদের সঙ্গে কথা বলতে বেশি পছন্দ করে। বন্ধুদের সাথে তারা মনের ভাব বেশি ভালোভাবে প্রকাশ করে। এক ধরনের দূরত্ব মা-বাবা কিংবা শিক্ষকদের সঙ্গে কিশোর বয়সীদের খোলাখুলি কথা বলতে বাধা দেয়। ”
ইউনিসেফ বাংলাদেশের স্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞ জান্নাতুল ফেরদৌস মনে করেন, কিশোর-কিশোরীরা নিজেদের মধ্যে থাকতে বেশি পছন্দ করে। কিছু ক্ষেত্রে দেখা যায় বাবা-মা সন্তানদের ঠিকমতো সময় না দেওয়ায় ধীরে ধীরে দুই পক্ষের মধ্যে এক ধরনের দূরত্ব তৈরি হয়।
ব্র্যাকের শিক্ষা কর্মকর্তা মেরিন সুলতানা বলেন, “কিশোর-কিশোরীদের নিয়ে আমাদের তিনটি প্রোগ্রাম চলছে। কিশোর-কিশোরীদের সঙ্গে সম্পর্কের ধরন নিয়ে সচেতন করে তুলতে আমরা শিক্ষদের নিয়ে কাজ করেছি, ওয়ার্কশপ করেছি। এ সময় শিক্ষকদের মাঝে অনেক ধরনের গ্যাপ খুঁজে পেয়েছি। সহানুভূতিশীলতার মতো গুণাবলী না থাকা নিয়ে আমরা শিক্ষদের অবগত করি।”
এ বিষয়ে স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের প্রোগ্রাম ম্যানেজার (কিশোর ও স্কুল স্বাস্থ্য) ড. শামসুল হক বলেন, “আমাদের সরকারি-বেসরকারিভাবে একসাথে কিশোর-কিশোরীদের মানসিক স্বাস্থ্য নিয়ে কাজ করতে হবে। আর কিশোর-কিশোরীদের মানসিক স্বাস্থ্য নিয়ে বাবা-মা উভয়কেই সমান সচেতন হতে হবে।”
মানসিক স্বাস্থ্য নিয়ে সরকারি প্রতিষ্ঠানের পাশাপাশি যেসব বেসরকারি প্রতিষ্ঠান কাজ করছে তাদের সমন্বয় করা হবে বলে জানান অধিদপ্তরের এ ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা।