বিএনপি ও সমমনা দলগুলো দ্বাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে অংশগ্রহণ করলে তফসিল পুনর্বিবেচনা ও সময় বাড়ানোর ইঙ্গিত দিয়ে আসছিল নির্বাচন কমিশন (ইসি)। তবে বিএনপি এখন পর্যন্ত নির্বাচনে না আসার সিদ্ধান্তে অনড়; আর পুনঃতফসিলের কোনো আবেদন এখন পর্যন্ত ইসিতে পৌঁছায়নি ফলে নির্বাচনের দিনক্ষণের কোনো পরিবর্তন আসছে না বলে জানিয়েছে ইসি।
আগামী ৭ জানুয়ারি ভোটগ্রহণ হবে আর আজ বৃহস্পতিবার (৩০ নভেম্বর) মনোনয়ন জমা দেওয়ার শেষ দিন। এখনো রাজনৈতিক বিরোধপূর্ণ অবস্থা বিরাজ করছে দেশে; তবে সাংবিধানিক প্রতিষ্ঠান ইসি বলছে, রাজনৈতিক কোনো সমাধান না এলে নির্বাচন যথাসময়েই আয়োজন করবে তারা।
ইসির শীর্ষস্থানীয় কর্মকর্তারা ঢাকা ট্রিবিউনের সঙ্গে কথা বলার সময় জানান, মনোনয়নপত্র জমা দেওয়ার সময়সীমা শেষ হয়ে গেলে বিএনপিসহ কোনো দলের জন্য তফসিল পুনর্বিবেচনা করবে না কমিশন।
নির্বাচন কমিশনার মো. আলমগীর ঢাকা ট্রিবিউনকে বলেন, “তারা (বিএনপি) যদি নির্বাচনে অংশ নিতে চায় তবে তাদের অবশ্যই আজকের (বৃহস্পতিবার) মধ্যে পুনঃতফসিলের জন্য আবেদন করতে হবে। তবে আমরা মনোনয়নের সময়সীমা বাড়ানো বা পুনঃতফসিল করার জন্য কোনো দল থেকে কোনো আবেদন পাইনি।”
নির্বাচন কমিশন সচিব ও ইসির মুখপাত্র মো. জাহাংগীর আলমও ঢাকা ট্রিবিউনকে জানান, “মনোনয়ন জমা দেওয়ার সময়সীমা বাড়ানো বা পুনঃতফসিল করার বিষয়ে কোনো বৈঠক বা সিদ্ধান্ত হয়নি। ঘোষণা নির্ধারিত সময় অনুযায়ী ভোটগ্রহণ কার্যক্রম সম্পন্ন করা হবে।”
এখন পর্যন্ত দ্বাদশ সংসদ নির্বাচনে অংশ নিতে ২৬টি নিবন্ধিত রাজনৈতিক দল নির্বাচন কমিশনে চিঠি দিয়েছে। বর্তমানে নিবন্ধিত দলের সংখ্যা ৪৪টি। ইসি মনে করছে, ৩০টির বেশি দল এই নির্বাচনে অংশ নেবে।
অন্যদিকে বিএনপি ও ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশসহ ১৮টি নিবন্ধিত রাজনৈতিক দলের অংশগ্রহণের বিষয়ে এখনো সুনির্দিষ্ট তথ্য কমিশনের কাছে নেই।
নির্বাচন কমিশনের অতিরিক্ত সচিব অশোক কুমার দেবনাথ বলেন, “প্রায় ৩০টি রাজনৈতিক দল নির্বাচনে অংশগ্রহণের বিষয়ে ইসিকে লিখিতভাবে জানিয়েছে। মনোনয়নপত্র জমা দেওয়ার সময়সীমা শেষ হলে প্রকৃত চিত্র প্রকাশ করা হবে।”
ইসির ঘোষিত দ্বাদশ সংসদ নির্বাচনের তফসিল অনুযায়ী, মনোনয়নপত্র জমা দেওয়ার শেষ তারিখ ৩০ নভেম্বর। মনোনয়নপত্র বাছাই হবে ১ থেকে ৪ ডিসেম্বর। প্রার্থিতা প্রত্যাহারের শেষ তারিখ ১৭ ডিসেম্বর। প্রতীক বরাদ্দ ১৮ ডিসেম্বর। সেদিন থেকেই প্রচারণা শুরু করতে পারবেন প্রার্থীরা।
তফসিলের বৈধতা চ্যালেঞ্জ করে রিট
একাদশ জাতীয় সংসদ বহাল থাকা অবস্থায় দ্বাদশ সংসদ নির্বাচনের ঘোষিত তফসিল এবং ৭ জানুয়ারি সংসদ নির্বাচন অনুষ্ঠানের বৈধতা চ্যালেঞ্জ করে রিট করা হয়েছে। বুধবার হাইকোর্টের সংশ্লিষ্ট শাখায় সুপ্রিম কোর্টের আইনজীবী ইউনুছ আলী আকন্দ এ রিট করেন। রিটে প্রধান নির্বাচন কমিশনারসহ সাতজনকে বিবাদী করা হয়েছে।
এর আগে মঙ্গলবার এই আইনজীবী দ্বাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন পেছানোর দাবি জানিয়ে প্রধান নির্বাচন কমিশনারসহ সংশ্লিষ্টদের আইনি নোটিশ পাঠান। সংবিধানের ১২৩ অনুচ্ছেদ অনুযায়ী নির্বাচন পেছানোর সুযোগ রয়েছে উল্লেখ করা হয় নোটিশে।
এ বিষয়ে আইনজীবী ইউনুছ আলী আকন্দ বলেন, “দেশের বড় রাজনৈতিক দল এখন পর্যন্ত নির্বাচনের বাইরে রয়েছে। যদি তারা নির্বাচনে আসতে চায় তাহলে নির্বাচনের তারিখ পিছিয়ে দেওয়া উচিত। এছাড়া নির্বাচনের বিষয়ে বিদেশিদের চাপ রয়েছে। এখন দেশে হরতাল অবরোধ চলছে, মানুষের জান মালের ক্ষতি হচ্ছে। সব দিক বিবেচনায় নিয়ে নির্বাচন পেছানোর দাবিতে নোটিশ পাঠিয়েছি।” এ বিষয়ে ইসির কর্মকর্তাদের কাছে জানতে চাইলে তারা কোনো মন্তব্য করেননি।
বিএনপিসহ নির্বাচনের বাইরে থাকা দলগুলো ভোটে না এলেও যথাসময়ে নির্বাচনের সিদ্ধান্ত নিয়েছে সরকার। এক্ষেত্রে ক্ষমতাসীন দল ডামি প্রার্থী দিয়ে নির্বাচন করতে পারে। এর মূল উদ্দেশ্য নির্বাচনে অধিক সংখ্যক ভোটারকে ভোটকেন্দ্রে নিয়ে আসা।
প্রথম সংসদ নির্বাচনে ১৪টি দল অংশ নিয়েছিল; আর ভোটের মাঠে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করেন ১০৯১ জন প্রার্থী। ২৯টি দল ও ২,১২৫ জন প্রার্থীর অংশগ্রহণে হয় দ্বিতীয় সংসদ নির্বাচন। তৃতীয় সংসদ নির্বাচনে ২৮টি দল ও ১,৫২৭ জন প্রার্থী অংশগ্রহণ করেন। চতুর্থ সংসদ নির্বাচনে ৮টি দল ও ৯৭৭ জন প্রার্থী ভোটযুদ্ধে নামেন। পঞ্চম সংসদ নির্বাচনে ৭৫টি দলের অংশগ্রহণে ভোটে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করেন ২,৭৮৭ জন। ষষ্ঠ সংসদ নির্বাচনে ৪২টি দল ও ১,৪৫০ জন প্রার্থী ছিলেন। সপ্তম সংসদ নির্বাচনে ৮১টি দলের অংশগ্রহণে ২,৫৭২ জন প্রার্থী ছিলেন। অষ্টম সংসদ নির্বাচনে ৫৫টি দলের অংশগ্রহণে ভোটের লড়াইয়ে নামেন ১,৯৩৯ জন প্রার্থী।
নবম জাতীয় সংসদ নির্বাচনে ৩৯টি দল অংশ নিয়েছিল; ২০০৮ সালের ২৯ ডিসেম্বর হওয়া এই নির্বাচনে আওয়ামী লীগ ৪৮.০৪% ভোট পেয়ে সংখ্যাগরিষ্ঠতা নিয়ে সরকার গঠন করে। এই নির্বাচনে প্রধান বিরোধী দল বিএনপি ভোট পায় ৩২.৫০% আর জাতীয় পার্টি পায় ৭.০৪% ভোট।
দশম সংসদ নির্বাচনে অংশ নেয় ১২টি দল। বিএনপি ও সমমনাদের বর্জনের মধ্যে এই নির্বাচনে ৭২.১৪% ভোট পেয়ে সরকার গঠন করে আওয়ামী লীগ। আর সংসদের প্রধান বিরোধী দল জাতীয় পার্টির পক্ষে ৭% ভোটার রায় দেন।
একাদশ সংসদ নির্বাচনে অংশ নেয় ৩৯টি দল। এই নির্বাচনে নৌকা প্রতীকে ভোট পড়ে ৭৬.৮০%, ধানের শীষে ১৩.৫১% আর লাঙ্গলে ৫.৩৭% ভোট পড়ে। পরে ব্যাপক অনিয়মের অভিযোগ তুলে ফলাফল প্রত্যাখ্যান করে বিএনপিসহ বেশ কয়েকটি দল। শেখ হাসিনার নেতৃত্বে সরকার গঠন করে আওয়ামী লীগ। আর সংসদে প্রধান বিরোধী দল হয় জাতীয় পার্টি।