মাদকাসক্তি থেকে অপরাধে জড়াচ্ছে পথশিশুরা

রাজধানীর সড়ক কিংবা ফুটপাতের কিছু সাধারণ দৃশ্য আছে; যেগুলো সহজেই চোখে পড়ে। এই যেমন দল বেঁধে কাঁধে বস্তার মতো কিছু একটা নিয়ে হাঁটছে শিশুরা। এক হাত দিয়ে বস্তাটি ধরলেও তাদের অন্য হাতে দেখা যায় একটি পলিথিন। ফোলানো পলিথিনের মধ্যে প্রায়ই মুখ ঢুকিয়ে কিছু একটি শুঁকে নিচ্ছে তারা। ওই শিশুরা খেলাচ্ছলে পলিথিনের ভেতর নাক-মুখ ঢোকাচ্ছে না। তারা মূলত “ড্যান্ডি” নেশায় আসক্ত।

সহজলভ্য ও সস্তা হওয়ায় এই নেশায় জড়িয়ে পড়ছে পথশিশুরা। পাশাপাশি গাঁজাসহ অন্যান্য নেশাও করছে তারা। রাজধানীর বেশ কয়েকটি এলাকায় পথশিশুদের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, মাদকাসক্ত পথশিশুরা অন্য পথশিশুদের জন্য বিপদের কারণ হয়ে উঠছে। নেশায় বুঁদ হয়ে বিভিন্ন সময়ে সহিংস কর্মকাণ্ড করছে তারা। জড়িয়ে পড়ছে অপরাধে। যার ভুক্তভোগী অন্য পথশিশুরা। অন্য পথশিশুদের কাছ থেকে টাকা-পয়সাও কেড়ে নেয় তারা।

“ড্যান্ডি” মূলত এক ধরনের আঠা। “ড্যানড্রাইট অ্যাডহেসিভ” বা “ড্যান্ড্রাইট” নামের আঠাটিকেই মাদক সেবীরা “ড্যান্ডি” বলে চেনে। এই আঠা দিয়েই নেশা করে তারা। অল্প খরচে এই নেশা করা যায় বলে পথশিশুরা ঝুঁকে পড়ছে এতে। একজনের কাছ থেকে ছড়িয়ে যাচ্ছে অন্যজনের কাছে।

নেশা করার জন্য পথশিশুরা আঠাটি মুচির কাছ থেকে কিনে থাকে। বিভিন্ন বৈদ্যুতিক যন্ত্রপাতি ও হার্ডওয়্যারের দোকানে বিক্রি হয় এটি। এই আঠা দিয়ে সাধারণত বিভিন্ন ইলেকট্রিক যন্ত্রপাতি, প্লাস্টিকের ব্যবহার্য জিনিসপত্র, চামড়াসহ বিভিন্ন পণ্য জোড়া দেওয়ার কাজ করা হয়।

২০২২ সালে প্রকাশিত মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তরের (ডিএনসি) একটি গবেষণায় বলা হয়, দেশে ৫৮% পথশিশু মাদকে আসক্ত। ১৪% শিশু ১০ বছর বয়সের আগেই মাদক সেবন করে। তুলনামূলক সহজলভ্য ও সস্তা হওয়ায় পথশিশুদের মধ্যে ৩১.৭% গাঁজা সেবন করে। ড্যান্ডিতে আসক্ত ১৫.২% শিশু।

মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তর ও ইউনিসেফের তথ্য অনুযায়ী, রাজধানীতেই ড্যান্ডিতে আসক্ত পথশিশুর সংখ্যা প্রায় ৭৫,০০০ জন।

রাজধানীর কমলাপুর রেলস্টেশন, মোহাম্মদপুর, ধানমন্ডি, ঝিগাতলা, মিরপুর, সোহরাওয়ার্দী উদ্যানসহ বিভিন্ন স্থানে পথশিশুদের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, নেশায় আসক্ত পথশিশুরা অন্য পথশিশুদের জন্য হুমকি। তারা নেশার জন্য অপরাধমূলক কর্মকাণ্ডে জড়িয়ে পড়ছে। অন্যদের সঙ্গে করছে সহিংস আচরণ।

ধানমন্ডি এলাকায় কথা হয় রাজন (ছদ্মনাম) নামে এক পথশিশুর সঙ্গে। সে বলে, “আমার কাছ থেকে সেদিন সব টাকা এক ড্যান্ডিখোর নিয়ে গেছে। এই ছেলেমেয়েগুলি আমাদের বয়সেরই হবে। এরা এই ব্রিজের তলায় ঢুকে লুকায় লুকায় ‘ড্যান্ডি’ খায়, যাতে কেউ দেখতে না পারে।”

বিল্লাল (ছদ্মনাম) নামে আরেক শিশু বলে, “আমি এখানে বোট পরিষ্কারের কাজ করি। দিনে ১৫০ থেকে ২০০ টাকা পাই। এই কষ্টের টাকা এরা নিয়ে যায়। আর টাকা না দিলে প্রচুর মারধর করে। আমাদের বয়সী ছেলেগুলির সঙ্গে মারধর করে পারলেও বড়গুলির সঙ্গে পারি না। এরা খুব মারামারি করে।”

ঝিগাতলায় মায়ের সঙ্গে সারা দিন ঘুরে-বেড়ায় ৯ বছর বয়সী আসমা (ছদ্মনাম)। পথশিশুদের জন্য প্রতিষ্ঠিত এক স্কুলে সে লেখাপড়া করে। আসমাও “ড্যান্ডি” নেশায় আসক্ত পথশিশুদের কাছে হেনস্তার শিকার। সে বলে, “সকালে স্কুলেও এই ছেলে-মেয়েগুলি আসে। সারাক্ষণ ঘুমের ঘোরে থাকে। এই ছেলে-মেয়েগুলি গাছের তলায় বসে নেশা করে। ম্যাডামের কথা শুনে না। আর সুযোগ পেলেই অযথা আমাদের মারধর করে। সেইদিন আমার এক বন্ধুকে অনেক মারধর করেছে। সে এখন হাঁটতে পারছে না ঠিকমত। আর একদিন আমার হাত থেকে ৪০ টাকা কেড়ে নিয়েছিল, তখন হাতে অনেক বড় খামচির দাগ পড়ে গিয়েছিল। রক্তও পড়েছিল।”

চন্দ্রিমা উদ্যানে গেলে ফুল বিক্রেতা রাকিব (১২) নামে এক শিশুর সাথে দেখা হয়। সে বলে, “মাঝে মাঝেই এই নেশাখোর ছেলেরা আসে। এইটা খেয়ে বলে এদের পেট ভরা থাকে, ক্ষিদা লাগে না।  নেশার টাকা শেষ হয়ে গেলে আমাদের টাকা হাতায় নিয়ে যায়।”

পথশিশু ইমন বলে, “একবার ড্যান্ডির নেশা উঠলে এদের মাথার ঠিক থাকে না। এর জন্য এরা সব করতে পারে। সেইদিন এক লোকের মোবাইল ফোন নিয়ে দৌঁড় দিয়েছিল। পরে তাকে সবাই মিলে ধরে ফেলে। নেশার জন্য এরা যেকোন কিছু করতে পারবে।”

সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা বলছেন, ড্যান্ডি সেবনে ক্ষুধামান্দ্য তৈরি হয়। যারা সেবন করে তাদের কাছে মনে হয়, তারা সামাজিক বাস্তবতা ভুলে থাকছে। দেখা যায়, তারা যেখানে-সেখানে ঘুমিয়ে পড়ছে। এসব নেশায় জড়িয়ে পথশিশুরা অল্প বয়সেই কিংবা বড় হয়ে অপরাধকর্মের সঙ্গে যুক্ত হয়ে পড়ার বড় ধরনের ঝুঁকি তৈরি হচ্ছে।

তারা বলছেন, পথশিশুদের সমাজের মূল স্রোতে ফিরিয়ে আনাটাই হবে মূল সমাধান। কিন্তু সেটিই বড় চ্যালেঞ্জের কাজ। বেসরকারি ও সামাজিক সংগঠনগুলোকে নিয়ে সরকারকে সেই কঠিন কাজটিতে হাত দিতে হবে।

এ ব্যাপারে পুলিশের স্পেশাল ব্রাঞ্চের উপ-পরিদর্শক (এসআই) মো. রেজাউল করিম বলেন, “বর্তমানে পথশিশুদের মাঝে ড্যান্ডিসহ নানা ধরনের নেশা করতে দেখা যায়। ফুটপাত, পার্ক, বাসস্ট্যান্ড কিংবা ট্রেন স্টেশন, প্রায় সব পথে শিশুদের দেখা যায় পলিথিনে ভরে ড্যান্ডির নেশা করতে। এসব শিশু অবশ্যই অন্যান্য পথশিশুদের জন্য হুমকির কারণ। তাদের বিরুদ্ধে অপরাধমূলক কর্মকাণ্ডেরও অভিযোগ আসে। তবে শিশুদের অভিভাবকদের সচেতন হতে হবে। পাশাপাশি সংশ্লিষ্টদেরও কার্যকর ব্যবস্থা নিতে হবে।”

বাংলাদেশে ইউনিসেফের প্রতিনিধি শেলডন ইয়েট ঢাকা ট্রিবিউনকে বলেন, “আঠাজাতীয় নেশাদ্রব্য খাবারের তুলনায় সস্তা, তাই অনেক শিশু ক্ষুধা নিবারণের জন্য এই পদার্থগুলো গ্রহণ করে থাকে। এসব শিশুদের মাদক থেকে দূরে আনতে ও পুনর্বাসনে কাজ করছে ইউনিসেফ।”

তিনি বলেন, “তবে এই কাজটি কঠিন, এ জন্য সমাজের সব স্তরের সহযোগিতা প্রয়োজন। সচেতনতা বৃদ্ধি, কমিউনিটি সম্পৃক্ততা বৃদ্ধির মাধ্যমে প্রতিরোধমূলক ব্যবস্থা নিয়ে এ পরিস্থিতির উন্নতি করা সম্ভব।”

তিনি আরও বলেন, “সমাজকল্যাণ মন্ত্রণালয় এবং মহিলা ও শিশুবিষয়ক মন্ত্রণালয় পথশিশুদের নিয়ে কাজ করছে। তাদের খাদ্য, স্বাস্থ্য, শিক্ষার নিশ্চিতে নানা ধরনের পদক্ষেপ রয়েছে। আমরা তাদের পরিবারের কাছে গিয়ে কাজ করার চেষ্টা করি।”