অবৈধভাবে সমুদ্রপথে ইউরোপে যাওয়ার সময় সম্প্রতি ভূমধ্যসাগরে তিউনিশিয়ার জলসীমায় নৌকা ডুবে ৯ জন মারা গেছেন। এদের মধ্যে আটজন বাংলাদেশি এবং একজন পাকিস্তানি নাগরিক।
ত্রিপোলির বাংলাদেশ দূতাবাস জানিয়েছে, গত ১৩ ফেব্রুয়ারি স্থানীয় সময় রাতে একটি অভিবাসী দল নৌকায় করে লিবিয়ার জুয়ারা উপকূল থেকে ইউরোপের উদ্দেশে যাত্রা শুরু করে। নৌকাটি তিউনিশিয় উপকূলে পৌঁছালে নৌকাডুবির ঘটনা ঘটে।
মৃত আট বাংলাদেশি হলেন- সজল, নয়ন বিশ্বাস, মামুন শেখ, কাজী সজীব, কায়সার, রিফাত, রাসেল এবং ইমরুল কায়েস আপন। এদের মধ্যে প্রথম পাঁচজন মাদারীপুরের রাজৈর উপজেলার বিভিন্ন গ্রামের এবং তিনজনের বাড়ি গোপালগঞ্জের মুকসুদপুর উপজেলায়।
সংসারের হাল ধরতে গিয়ে দালালের মাধ্যমে অবৈধ পথে বিদেশ যেতে গিয়ে করুণ পরিণতি বরণ করেছেন তারা। এখন পরিবারের আশা সন্তানদের মরদেহ যেন বাড়িতে আসে, শেষবারের মতো একনজর যেন দেখতে পারেন সন্তানের মুখ।
গোপালগঞ্জের মুকসুদপুর উপজেলার গয়লাকান্দি গ্রামে ইমরুল কায়েসের আপনের বাড়িতে গিয়ে দেখা যায়, শোকাচ্ছন্ন স্বজনরা একে অপরকে নীরবে স্বান্তনা দিচ্ছেন। কেউ জোরে কাঁদছেন না। কারণ, আপনের পক্ষাঘাতগ্রস্ত বাবা পান্নু শেখকে জানানো হয়নি ছেলের মৃত্যুর খবর।
ছেলের শোকে কাতর মা কেয়া কামরুন নাহার ছেলের মৃত্যুর খবর পেলেও জানাননি অসুস্থ স্বামীকে।
আপনের বাবা পান্নু শেখ ঢাকা ট্রিবিউনকে বলেন, “কেউ বলেছে আমার ছেলে হাসপাতালে আছে। কেউ বলেছে জেলে। আমি শুধু ছেলেকে ফিরে পেতে চাই। ছেলেকে ফিরে পেলে আর কোনো অভিযোগ নেই। আমার একটাই চাওয়া, যেন ছেলেকে ফিরে পাই।”
ছেলের মৃত্যুর খবর না জানলেও পান্নু শেখ জানেন পরিবারের কারো সঙ্গে গত কয়েকদিনে যোগোযোগ হয়নি আপনের। ছেলের সঙ্গে সর্বশেষ ১২ ফেব্রুয়ারি কথা হয়েছে উল্লেখ করে তিনি বলেন, “তখন সে বলেছিল ১৪ তারিখে ইতালির উদ্দেশে রওনা দেবে। তখন তার সঙ্গে প্রায় ১৫ মিনিটি বিভিন্ন বিষয় নিয়ে কথা হয়েছে। ১৪ ফেব্রুয়ারির পর আর কোনো যোগাযোগ হয়নি।”
স্বজনরা জানান, পান্নু শেখ ২০০৪ সালে সৌদি আরব যান। ১৫ বছর পর ২০১৯ সালে বাংলাদেশে ফিরে এসে একটি বেসরকারি প্রতিষ্ঠানে ড্রাইভারের চাকরি নেন। এক বছর আগে তিনি পক্ষাঘাতগ্রস্ত হয়ে কর্মক্ষমতা হারিয়ে ফেললে বন্ধ হয়ে যায় আয় রোজগার। তাই সংসারের হাল ধরতে কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ের চতুর্থ বর্ষের ছাত্র ইমরুল কায়েস আপন ইতালি যাওয়ার ইচ্ছা প্রকাশ করে। এরপর রহিম নামের এক দালালের মাধ্যমে ইতালি যাওয়ার জন্য ১১ লাখ টাকায় চুক্তি হয়। টাকা দেওয়ার পর এ বছরের ১০ জানুয়ারি দেশ ছাড়েন আপন।
পান্নু শেখ সৌদি আরবে থাকার সময় ছেলে ও মেয়েকে নিয়ে স্ত্রী কেয়া কামরুন নাহার পাবনায় বাবার বাড়িতে থাকতেন। ইমরুল কায়েস আপন পাবনাতেই পড়াশোনা করেছে। সেখান থেকে এসএসসিও এইচএসসি উভয় পরীক্ষায় জিপিএ-৫ পেয়ে উত্তীর্ণ হন। এরপর মেধাবী এই শিক্ষার্থী ভর্তি হন রাজশাহী এক্সিম ব্যাংক কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ে।
পান্নু শেখ বলেন, “গোপালগঞ্জ, মাদারীপুরসহ আশপাশের অনেকেই ইতালি যায়। তাদের সঙ্গে ছেলেকে পাঠিয়েছিলাম। তাকে পাঠিয়ে এখন মনে হচ্ছে ভুল করেছি। গত ৮ জানুয়ারি এক্সিম ব্যাংকের টেকেরহাট শাখার মাধ্যমে দালাল রহিমের কাছে ১১ লাখ টাকা পাঠাই। রহিম লিবিয়া থাকে। তার বাড়ি মুকসুদপুর উপজেলার রাগদী ইউনিয়নের গজনা গ্রামে। জীবনের সঞ্চিত সব সম্বল দিয়ে ছেলেকে বিদেশে পাঠিয়ে এখন নিঃস্ব হয়ে পড়েছি। এখন কী করব কিছুই বুঝে উঠতে পারছি না।”
শুধু ইমরুল কায়েস আপন নয় এমন পরিণতি বরণ করেছেন একই উপজেলার বড়দিয়া গ্রামের দাদন শেখের ছেলে রিফাত শেখ ও ফতেপট্টি গ্রামের রাসেল শেখ। তাদের মুত্যুতে শুধু পরিবার নয়, পুরো এলাকাজুড়ে নেমে এসেছে শোকের ছায়া। তাদের বাড়িতে ভিড় করেছেন গ্রামবাসী। এমন ঘটনা যেন আর না ঘটে সেজন্য দালালদের দৌরাত্ম্য কমাতে আইনি পদক্ষেপ নেওয়ার দাবি স্থানীয়দের।