সুস্বাদু খাবার রান্নার অন্যতম উপাদান মসলা। সেই মসলা চাষে বদলে গিয়েছে কুষ্টিয়া সদর উপজেলার প্রত্যন্ত গ্রাম বড়িয়া ভাদালিয়ার আর্থ-সামাজিক অবস্থা। সরকারি প্রণোদনায় গড়ে তোলা হয়েছে এই মসলা গ্রাম। ইতিমধ্যে গ্রামের সব রাস্তার পাশে রোপন করা হয়েছে বিভিন্ন মসলার চারা। বাড়ির আঙিনায়, পুকুর পাড়ে জিও ব্যাগে চাষ করা হচ্ছে আদা ও হলুদ। মাঠে মাঠে চারা ও বীজতলার জন্য তৈরি করা হয়েছে শেড। সব মিলিয়ে এক বিশাল কর্মযজ্ঞ।
জানা গেছে, বড়িয়া ভাদালিয়াপাড়াটি এখন মসলা গ্রাম নামেই অধিক পরিচিত। এই গ্রামে সড়কের পাশেই দারুচিনি, তেজপাতাসহ অসংখ্য মসলার গাছ লাগানো হয়েছে। এছাড়াও বাড়ির আঙিনা, উঠান, পুকুর পাড়সহ পতিত জমিতে ব্যাগে বা বস্তায় আদা ও হলুদের চাষ করছেন স্থানীয় কৃষকরা। এর পাশাপাশি তারা পিঁয়াজ-রসুন, ক্যাপসিকাম, গোল মরিচ, জিরা ও মৌরি চাষ করছেন।
কৃষি বিভাগ জানায়, সরকারি উদ্যোগে প্রায় ৫ কিলোমিটার রাস্তার দুই পাশে লাল-সবুজ প্লাস্টিকের বেড়া দিয়ে ঘেরা খাঁচার মধ্যে সারিবদ্ধভাবে তেজপাতা ও দারুচিনি গাছ রোপণ করা হয়েছে। এছাড়াও গ্রামের বাসিন্দাদের বাড়ির আশেপাশের পরিত্যক্ত জায়গায় ব্যাগে চাষ করা হচ্ছে হলুদ ও আদা। এছাড়াও পেঁয়াজ, রসুন, ক্যাপসিকাম, গোলমরিচ, জিরা, চুইঝালসহ ১৩ পদের মসলা চাষ হচ্ছে সরকারি প্রণোদনায়। মশলার মান ভাল হওয়ায় রপ্তানির স্বপ্ন দেখছেন অনেকে। স্থানীয় প্রশাসনও বাড়িয়েছে সহযোগিতা হাত।
স্থানীয় কৃষক নূর আলম বলেন, “আদা, পেঁয়াজ-রসুন, তেজপাতা, দারুচিনি, চুই ঝাল চাষ করেছি। এসব চাষে কৃষি বিভাগ আমাদের সহযোগীতা করে আসছে। তারা নিয়মিত খোঁজ খবর নেওয়াসহ কিভাবে আমরা এসব মসলার যত্ন নেব সেসব বিষয়েও ধারনা দিয়ে যাচ্ছেন। গত বছরের চেয়ে এবার আরও বেশি চাষ করা হচ্ছে। প্রথমে মসলার চারা সরকারই দিয়েছে। তারা জিও ব্যাগও দিয়েছে। এবার নিজ উদ্যোগেই অনেক বেশি বস্তায় চাষ করছি। গ্রামের প্রায় সব কৃষকই এখন মসলার চাষে নেমেছে।”
আমেনা খাতুন নামের এক নারী কৃষক বলেন, “আমরা বাড়ির আঙ্গিনা এবং পুকুর পাড়েও মসলার আবাদ করেছি। প্রথমে কৃষি অফিসারদের কথা বিশ্বাস হতো না। তাই তাদের কথা রাখার জন্য বাড়ির পাশে সামান্য জমিতে আদা এবং ক্যাপসিক্যাম চাষ করেছিলাম। পরে যখন দেখলাম এগুলো হচ্ছে এবং বাজারে বিক্রি করে ভালো দাম পাওয়া যাচ্ছে, তখন গ্রামের অধিকাংশ মানুষই আগ্রহী হয়ে উঠে। তাই এখন এই গ্রামের নাম পরিবর্তন হয়ে মসলা গ্রাম হয়ে গেছে। গ্রামের রাস্তার দুইপাশে, বাড়ির আঙ্গিনা, পুকুর পাড় বা পরিত্যাক্ত জমি সবখানেই মানুষ মসলার আবাদ করছে।”
ভাদালিয়াপাড়া গ্রামের কৃষক সাইদুল ইসলাম বলেন, “গত মৌসুমে ৩৬টি বস্তায় বাড়ির আঙিনায় আদা চাষ করেছিলাম। ২১ কেজি আদা হয়েছিলো। ভালো দামে বিক্রি করি। এবার ৫০০ বস্তায় আদা রোপন করেছি। প্রতি বস্তায় এক কেজি করে পাওয়া যাবে আশা করি। ২০০ টাকার ওপরে কেজি হিসেবে বিক্রি করতে পারছি।”
তিনি আরও বলেন, “যদি কোনো রোগ বালাই না হয় তাহলে এবারো আদার ভালো ফলন হবে এবং ভালো দামে বিক্রি করতে পারলে বেশ লাভবান হবো। এছাড়াও পলিনেটে পেঁয়াজের চারা তৈরি হচ্ছে এগুলো লাগানো হবে। সারা বছরই এখন আমরা মসলাজাতীয় ফসল চাষে ব্যস্ত।”
কুষ্টিয়া কৃষি সম্প্রসারন অধিদফতরের উপ-সহকারী কৃষি কর্মকর্তা আনোয়ার জাহিদ বলেন, “পলিনেটে চারা তৈরি করে আধুনিক পদ্ধতিতে চাষ হচ্ছে পেঁয়াজ-রসুন, ক্যাপসিকাম, গোল মরিচ, জিরা ও মৌরিসহ দরকারি ১৩ পদের মসলা। কৃষকের বেশি আগ্রহ উঠান, বাড়ির আঙিনা, পুকুর পাড়সহ পতিত জায়গায়। এসব স্থানে জিও ব্যাগ ও বস্তায় আদা-হলুদের চাষো হচ্ছে। পাঁচ বছরের এই প্রকল্পে এক বছরেই লাভও পেয়েছেন কৃষকরা।”
কুষ্টিয়া সদর উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা সৌতম কুমার শীল বলেন, “আমদানি নির্ভরতা কমানোর দীর্ঘমেয়াদি লক্ষ নিয়ে সরকারি প্রণোদনায় মসলার উন্নত জাত ও প্রযুক্তি সম্প্রসারণ প্রকল্পের আওতায় কুষ্টিয়ায় এ মসলা গ্রাম গড়ে তোলা হয়েছে।”
তিনি আরও বলেন, “সারা দেশে মধ্যে এই একটি গ্রামকে বেছে নেওয়া হয়েছে। রাস্তার পাশের এসব চারা গাছ ঠিকমতো বড় হলে আগামী বছর থেকে তেজপাতা তুলতে পারবেন গ্রামের মানুষ, দারুচিনি নিতে পারবেন আরও এক বছর পর। সব মিলিয়ে এই প্রকল্প এখন সফলতার দারপ্রান্তে।”