এক বিয়েকে কেন্দ্র করে ১৯ মামলা!

রাজশাহীতে এক সাবেক দম্পতির একে অপরের বিরুদ্ধে করা মামলার সংখ্যা নিয়ে শহরজুড়ে আলোচনা শুরু হয়েছে। বিয়ের আগে এবং বিচ্ছেদের পরে তারা একে অপরের বিরুদ্ধে মোট ১৯টি মামলা করেছেন বলে জানা গেছে।

ছাপাখানা ব্যবসায়ী আবুল কালাম আজাদ রিংকু (২৮) দাবি করেছেন, সাবেক স্ত্রী প্রিয়া খাতুন (২৪) তার নামে ১২টি মামলা করেছেন। আর প্রিয়া জানিয়েছেন, রিংকু তার নামে মামলা করেছেন ৭টি। যদিও পাঁচটি মামলা করার কথা স্বীকার করেছেন রিংকু।

ব্যবসায়ী রিংকুর বাড়ি রাজশাহী নগরীর ডিঙ্গাডোবা মহল্লায়। রাজশাহীর নিউমার্কেটে তার ছাপাখানার ব্যবসা রয়েছে।

আর প্রিয়া খাতুনের বাড়ি দামকুড়া এলাকায়। তিনি শিক্ষানবিশ আইনজীবী হিসেবে কাজ করেন।

মিথ্যা মামলায় হয়রানি হচ্ছেন দাবি করে রবিবার (২২ ডিসেম্বর) দুপুরে নিউমার্কেট এলাকার একটি রেস্তোরাঁয় সংবাদ সম্মেলন করেন আবুল কালাম আজাদ রিংকু। সেখানে রিংকু দাবি করেন, প্রিয়া তাকে ছাড়াও আত্মীয়-স্বজন, বন্ধু-বান্ধবকে আসামি করছেন। মামলার কারণে তিনি এবং তার বন্ধু-স্বজন মিলে ২৫টি পরিবারের সদস্যরা পালিয়ে বেড়াচ্ছেন।

সংবাদ সম্মেলনে রিংকু দাবি করেন, ২০১৯ সালের জুন মাসে প্রিয়া তাকে প্রিন্টিংয়ের কাজ দেওয়ার জন্য রাজশাহী কলেজে ডাকেন। তার আগে তিনি প্রিয়াকে চিনতেন না। সেখানে যাওয়ার পর প্রিয়া তাকে প্রেমের প্রস্তাব দেন। তবে সে প্রস্তাবে সাড়া দেননি বলে দাবি করেন রিংকু। এর কয়েকদিন পর ভুয়া কাবিননামা নিয়ে প্রিয়া তার বাড়ি এসে ওঠেন বলে অভিযোগ করে রিংকু।

তবে রিংকু ওই কাবিননামা মিথ্যা উল্লেখ করে প্রিয়াকে স্ত্রী হিসেবে মেনে না নিলে প্রিয়া আদালতে যৌতুকের মামলা করেন। এরপর ভুয়া কাবিননামা তৈরির অভিযোগে প্রিয়ার নামে মামলা করেন রিংকু।

সংবাদ সম্মেলনে রিংকু দাবি করেন, এর কয়েকদিন পর প্রিয়া তার ছাপাখানায় গিয়ে কীটনাশক পান করেন। পরে কীটনাশক পান করিয়ে হত্যার চেষ্টা করা হয়েছে এমন অভিযোগে প্রিয়া মামলা করেন। এতে তিনি উদ্বিগ্ন হয়ে পড়েন বলে দাবি রিংকুর।

পরে আপসের স্বার্থে তিনি ২০২০ সালে প্রিয়াকে বিয়ে করেন। এর মধ্যে রিংকুর দায়ের করা মামলায় প্রিয়ার বিরুদ্ধে অভিযোগপত্র দেয় পুলিশ। এতে প্রথমে জাল কাবিননামা দিয়ে যৌতুকের মামলা করেছিলেন বলে উঠে আসে। তবে প্রিয়াকে আনুষ্ঠানিকভাবে বিয়ে করায় রিংকু ওই মামলাটি তুলে নেন। তারপর দুজনে সংসার করছিলেন। ২০২১ সালের দিকে তাদের সংসারে একটি ছেলে সন্তানের জন্ম হয়।

রিংকু বলেন, “বিয়ের পর জানতে পারি ফজলে রাব্বী নামের একজনের সঙ্গে প্রিয়ার বিয়ে হয়েছিল। আর আমাদের মধ্যে বনিবনাও হচ্ছিল না। তাই গত বছরের ডিসেম্বরে কাজী অফিসের মাধ্যমে প্রিয়াকে তালাক দিই। এরপর থেকেই একের পর এক মামলা দিয়ে যাচ্ছে প্রিয়া। মোট মামলা করেছে ১২টি।”

তিনি জানান, ২০১৯ সালের ৭ আগস্ট প্রথম মামলাটি করেছিলেন প্রিয়া। দ্বিতীয় মামলাটি ২০১৯ সালের ২৩ অক্টোবর করেন। পরে ২০২৩ সালের ১০ ডিসেম্বর একটি মামলা করেন। এরপর এ বছরের ১৬ জানুয়ারি, ৩০ জানুয়ারি, ৫ এপ্রিল, ২২ এপ্রিল, ৬ মে, ২০ মে, ১৯ আগস্ট, ৫ সেপ্টেম্বর ও ১৫ ডিসেম্বর একটি করে মামলা করেছেন প্রিয়া।

রিংকু জানান, এসব মামলায় তাকে ছাড়াও আত্মীয়-স্বজন ও বন্ধু-বান্ধবকে আসামি করা হয়েছে। একটি মামলার তদন্ত শেষ হওয়ার আগেই আরেকটি মামলা করা হয়েছে।

অভিযোগের বিষয়ে জানতে চাইলে প্রিয়া খাতুন বলেন, “জোর করে বিয়ে করার অভিযোগ ঠিক না। রিংকুর সঙ্গে আমার প্রেমের সম্পর্ক ছিল। কিন্তু সে বিয়ে করতে অস্বীকৃতি জানিয়েছিল। পরে মামলা-মোকদ্দমা হলে আদালতের নির্দেশেই আমাকে বিয়ে করে। কিন্তু রিংকু মাদকসেবন করে। বন্ধুর বউকে নিয়ে কক্সবাজার ঘুরতে যায়। এসব নিয়ে দাম্পত্য কলহের সৃষ্টি হয়। এখন রিংকুই আমার নামে মিথ্যা অভিযোগে মামলা করছে।”

প্রিয়ার দাবি রিংকু তার নামে ১২ টি মামলা করেছেন। এর মধ্যে সাতটি মামলার তারিখ জানাতে পেরেছেন প্রিয়া। তার দেওয়া তথ্যমতে, বিয়ের আগে ২০১৯ সালের ৩০ জুন প্রথম মামলা করেন রিংকু। বিচ্ছেদের পর ২০২৩ সালের ২৯ ডিসেম্বর ও ৩১ ডিসেম্বর পৃথক দুটি মামলা করেন। এরপর এই বছরের বছরের ১৭ জানুয়ারি, ১৩ ফেব্রুয়ারি ও ৫ জুলাই এই ৭ মামলা করেন রিংকু।

জানতে চাইলে রিংকু বলেন, “আমি মামলা করেছি ৫টি। এরমধ্যে দুটি চলমান। প্রিয়া ১২টা মামলা করার কথা বললেও কাগজ দেখাতে পারবে না। আমি ৫টা মামলাই করেছি।”

এদিকে দুইপক্ষের “মামলার বন্যা” বইলেও তৃতীয় পক্ষের মধ্যস্থতায়ও বিষয়টির সমাধান হচ্ছে না। সম্প্রতি আইন ও মানবাধিকার সুরক্ষা ফাউন্ডেশন নামের একটি সংস্থার স্মরণাপন্ন হয়েছিলেন রিংকু। সংস্থাটি নোটিশ করে উভয়পক্ষকে ডাকে। গত ১৭ ডিসেম্বর সংস্থার সভাপতি খন্দকার মো. লিয়াকত আলী ও সাধারণ সম্পাদক আমিনুল ইসলাম সই করা এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, কিছু শর্তে প্রিয়া মামলাগুলো তুলে নিতে চান। প্রিয়ার শর্ত ছিল- দেনমোহর এক লাখ টাকা হলেও তাকে পাঁচ লাখ টাকা দিতে হবে। সন্তানের খোরপোষ বাবদ প্রতিমাসে পাঁচ হাজার টাকা দিতে হবে। আর ছাপাখানার একটি প্রেস মেশিন বাচ্চার নামে লিখে দিতে হবে।

সংস্থাটি অন্যসব শর্ত অপরিবর্তিত রেখে শুধু পাঁচ লাখের বদলে দুই লাখ টাকা নিয়ে দেওয়ার সিদ্ধান্তের কথা জানায়। কিন্তু তা মানেননি প্রিয়া। ফলে আপস-মীমাংসা আর হয়নি।