গণপরিবহন ব্যবস্থা ‘সংস্কারের’ গোলাপি বাস এখন নিজেই লোকাল

ঢাকার গণপরিবহন ব্যবস্থায় শৃঙ্খলা ফেরাতে গত ফেব্রুয়ারি মাসে ব্যাপক প্রচারণার মাধ্যমে গোলাপি বাস সার্ভিস চালু করে অন্তর্বর্তীকালীন সরকার। যা নিয়ে স্বপ্ন ছিল রাজধানীবাসীর। কিন্তু মাত্র পাঁচ মাসের মধ্যেই বিশেষায়িত এই সেবা রূপ নিয়েছে লোকাল সার্ভিসে।

৬ ফেব্রুয়ারি উত্তরার আজমপুরে এ সেবা উদ্বোধন করেন ঢাকা মহানগর পুলিশের কমিশনার শেখ মো. সাজ্জাত আলী। ওই দিন থেকে আব্দুল্লাহপুর থেকে গাজীপুর পর্যন্ত বিভিন্ন রুটে ২১টি কোম্পানির প্রায় ২,৬১০টি গোলাপি বাস চলাচল শুরু করে। বাসগুলোকে সহজে চেনার জন্য গোলাপি রঙে রঙিন করা হয়।

অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের উদ্দেশ্য ছিল এই বাস সেবার মাধ্যমে গণপরিবহনে শৃঙ্খলা ফিরিয়ে আনা এবং যাত্রীদের সুবিধা নিশ্চিত করা। তবে সাধারণ মানুষ বলছেন, সরকারের এই উদ্যোগ ব্যর্থ হয়েছে- বরং এটি সড়কে আরও বেশি বিশৃঙ্খলা ও যানজট সৃষ্টি করছে।

সরেজমিনে দেখা যায়, বর্তমানে এই গোলাপি রঙের বাসগুলো ঢাকার বিভিন্ন সড়কে এলোমেলোভাবে থামছে, কোনো নিয়ম না মেনে যাত্রী তুলছে এবং যাত্রীরা টিকিট ছাড়াই বাসে উঠছেন। সিটের অভাবে অনেককেই দাঁড়িয়ে ভ্রমণ করতে দেখা গেছে, ঠিক যেমন সাধারণ লোকাল বাসে হয়।

নিয়ম অনুযায়ী গোলাপি বাসে টিকিট ছাড়া কেউ উঠতে পারবেন না। যত্রতত্র বাসে ওঠানামাও করা যাবে না/ মেহেদী হাসান/ঢাকা ট্রিবিউন

বাস মালিক ও শ্রমিকদের মধ্যকার প্রতিদ্বন্দ্বিতার কারণে গোলাপি বাস সেবার এই অবস্থার সৃষ্টি হয়েছে বলে অভিযোগ রয়েছে।

বুধবার সকালে ঢাকা ট্রিবিউনের একজন প্রতিবেদক মহাখালী থেকে গাজীপুর পরিবহন লিমিটেডের একটি গোলাপি বাসে ওঠেন। এই বাসটি গাজীপুর-গুলিস্তান-শিমুলতলী রুটে চলাচল করে। প্রতিবেদক দেখতে পান, বাসটি কোনো নিয়ম না মেনে চলাচল করছে। যাত্রীরা নিজেদের সুবিধামতো জায়গা থেকে বাসে উঠছেন এবং নামছেন, অনেকেই সিট না পেয়ে দাঁড়িয়ে যাচ্ছেন।

যাত্রীদের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, প্রথম এক মাস বাসে ওঠার জন্য যাত্রীদের কাউন্টার থেকে টিকিট কিনতে হতো, কিন্তু এরপর থেকে ঘোষণা করা সকল সুবিধা একে একে বন্ধ হয়ে যায়।

এ বিষয়ে আবদুল্লাহ আল মামুন নামের এক যাত্রী ঢাকা ট্রিবিউনকে বলেন, “ফেব্রুয়ারিতে প্রথম কয়েক সপ্তাহ টিকিট কিনেই বাসে উঠতে হতো। এরপর থেকে কাউন্টারগুলো বন্ধ হতে শুরু করলো। আমি প্রতিদিনই এই গোলাপি বাসে যাতায়াত করি। গত চার মাসে কোনো টিকিট কাটতে হয়নি।”

শামসুন্নাহার পলি নামের আরেক যাত্রী বলেন, “শুরুতে কয়েকদিন টিকিট কাউন্টার থেকে টিকিট কিনতাম, এখন সরাসরি হেল্পারকে ভাড়া দিই। এখন আর কোনো বিশেষ কিছু নেই। এটা এখন একেবারে লোকাল বাসের মতো। যেকোনো সময় উঠতে পারি, কাউন্টার টিকিটের দরকার হয় না।”

বাসের সহকারী নুরুদ্দিন ঢাকা ট্রিবিউনকে বলেন, “টিকিট ব্যবস্থা এখন বন্ধ। এখন আর কোনো টিকিটিং সিস্টেম নেই। কয়েকদিন পরেই সেটা বন্ধ হয়ে যায়। আমি হাতেই ভাড়া তুলি।”

গোলাপি বাস সার্ভিস যেমন থাকার কথা ছিল

এই গোলাপি বাস সার্ভিসের উদ্দেশ্য ছিল নির্ধারিত রুটে চলাচল করা, যাত্রীদেরকে কাউন্টার থেকে টিকিট কাটতে বাধ্য করা, ই-টিকিটিং ব্যবস্থা চালু করা, নির্ধারিত স্টপেজ থেকে যাত্রীদের ওঠা-নামা নিশ্চিত করা এবং দাঁড়িয়ে যাতায়াত বা অতিরিক্ত যাত্রী না নেওয়া।

এই উদ্যোগের মাধ্যমে হয়রানি কমানো এবং রাস্তায় শৃঙ্খলা ফেরানোর লক্ষ্য ছিল। তবে চালুর মাত্র সাত দিনের মধ্যেই টিকিট কাউন্টার এবং ই-টিকিটিং ব্যবস্থা নিয়ে অভিযোগ ওঠে।
গোলাপি রঙের এসব বাসের সংখ্যা দুই হাজার ৬১০/মেহেদী হাসান/ঢাকা ট্রিবিউন

অভিযোগ উঠে, যাত্রীদের টিকিট ছাড়াই বাসে উঠানো হচ্ছে এবং নির্ধারিত ভাড়ার চেয়ে বেশি ভাড়া আদায় করা হচ্ছে। ফলে গত পাঁচ মাস ধরেই এই সেবা কার্যত নিষ্ক্রিয় হয়ে আছে।

কেন এই সেবা বন্ধ হলো?

গণপরিবহন খাতে রাজনীতি এবং পরিবহন শ্রমিক ও মালিকদের মধ্যকার দ্বন্দ্বের কারণে এই সেবা বন্ধ হয়ে গেছে বলে জানা যায়।

বাস মালিক সমিতির এক সদস্য নাম প্রকাশ না করার শর্তে ঢাকা ট্রিবিউনকে বলেন, “গোলাপি বাস সেবাটি বন্ধ হওয়ার মূল কারণ রাজনৈতিক এবং আর্থিক। আগে মালিকরা প্রতিটি ট্রিপে নির্ধারিত অর্থ পেতেন, আর বাকি ভাড়া চালক ও হেল্পাররা ভাগ করে নিতেন। কিন্তু টিকিটিং ব্যবস্থা চালু হওয়ায় সব ভাড়া সরাসরি মালিকের কাছে চলে যেত, ফলে শ্রমিকরা তাদের অংশ পেত না।”

এছাড়াও এই সেবা বন্ধ হওয়ার পেছনে রাজনৈতিক প্রভাব এবং শ্রমিকদের উসকানো হয়েছে বলেও জানান তিনি।

কর্তৃপক্ষ কী বলছে?

ঢাকা সড়ক পরিবহন মালিক সমিতির সাধারণ সম্পাদক মো. সাইফুল আলম ঢাকা ট্রিবিউনকে বলেন, “আমরা দুই মাসের মধ্যে আবার গোলাপি বাস সার্ভিস চালু করার জন্য কাজ করছি। স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়, বিআরটিসি, ই-টিকিটিং পরিচালনাকারী অ্যাপ কোম্পানি, সিটি কর্পোরেশন ও বাস কোম্পানির মালিকদের সঙ্গে ইতোমধ্যে একাধিক বৈঠক হয়েছে।”

তিনি আরও বলেন, “চালক ও সহকারীদের এই সিস্টেম সম্পর্কে অবহিত করতে আমরা কাউন্সেলিং করছি। কারণ সঠিক ব্যবস্থাপনাই রাস্তায় শৃঙ্খলা আনতে পারে।”

ঢাকার রাস্তায় গোলাপি রঙের বাস/সংগৃহীত

তিনি বলেন, “গোলাপি বাস সার্ভিস চালুর পর আমরা অভিযোগ পেয়েছিলাম। সিটি কর্পোরেশন টিকিট কাউন্টার বা বাস স্টপের জায়গা নির্ধারণ করতে পারেনি। ই-টিকিটিং মেশিনগুলো কাজ করছিল না- অধিকাংশই ছিল ত্রুটিপূর্ণ। তাই আমাদের ম্যানুয়ালি ভাড়া তুলতে হয়েছে।”

সাইফুল আলম আরও বলেন, “আমরা এমন একটি ব্যবস্থা চালু করতে চাই, যেখানে নির্ধারিত স্টপেজে যাত্রীরা ওঠা-নামা করবেন এবং ইউনিফায়েড টিকিট সিস্টেম থাকবে। একটি নতুন অ্যাপের মাধ্যমে ভাড়া সরাসরি বাস কোম্পানির অ্যাকাউন্টে যাবে, অ্যাপ কোম্পানি টিকিটিং পরিচালনা করবে। আর চালক ও সহকারীদের নির্ধারিত বেতন দেওয়া হবে, যাতে তারা অতিরিক্ত যাত্রী তুলতে না চায় বা রাস্তায় বেপরোয়া প্রতিযোগিতায় না জড়ায়।”

রাজনৈতিক প্রভাব নিয়ে সাইফুল বলেন, “নিঃসন্দেহে কিছু সমস্যা রয়েছে। গত ১৬–১৭ বছর ধরে আমাদের পাবলিক ট্রান্সপোর্ট একটি নির্দিষ্ট পদ্ধতিতে চলছে। হঠাৎ করেই সেটা বাদ দেওয়া সম্ভব নয়- ধাপে ধাপে পরিবর্তন আনতে হবে। মালিক ও শ্রমিকদের সঙ্গে আলোচনা চলছে। আমরা আশা করছি, নতুন বাস দিয়ে গোলাপি বাস সার্ভিস দ্রুতই আবার চালু করতে পারবো। ১ জুলাই থেকে পুরনো ও অবৈধ বাসের বিরুদ্ধে অভিযান শুরু করব।”