দুর্গম সুন্দরবনের ভেতরে প্রবেশ করে রয়েল বেঙ্গল টাইগার গণনা করা খুবই দুঃসাধ্য একটি বিষয় ছিল। এক সময়ে পায়ের ছাপসহ বাঘের উপস্থিতি অনুমান করে গণনা করা হতো। ২০১৫ সালে শুরু হয় ক্যামেরা ট্যাপিংয়ের মাধ্যমে গণনা। ২০২৩-২৪ সালেও এ ক্যামেরা ট্যাপিংয়ে গণনা হয়। সর্বশেষ ওই গণনায় সুন্দরবনে বাঘের সংখ্যা বলা হয় ১২৫টি। এখন তাদের সুরক্ষা দেওয়া ও আগামীতে সুন্দরবনে বাঘ বৃদ্ধি করা বেশ চ্যালেঞ্জের। প্রধান চ্যালেঞ্জগুলো হলো- বাঘ ও হরিণের চোরা শিকার, বনের অবক্ষয়, জলবায়ু অভিঘাত, বনের ওপর মানুষের অতিনির্ভরশীলতা।
মঙ্গলবার (২৯ জুলাই) বিশ্ব বাঘ দিবস। বন অধিদপ্তরের আয়োজনে “বাঘের সংখ্যা বৃদ্ধি সুন্দরবনের সমৃদ্ধি” স্লোগানে পালিত হচ্ছে দিবসটি।
বাঘের প্রাকৃতিক আবাস রক্ষা করা এবং বাঘ সংরক্ষণের জন্য সাধারণ মানুষের মধ্যে সচেতনতা তৈরির লক্ষে প্রতিবছরের ২৯ জুলাই বিশ্ব বাঘ দিবস পালন করা হয়। ২০১০ সালে রাশিয়ার সেন্ট পিটার্সবার্গে অনুষ্ঠিত বাঘ অভিবর্তনে এ দিবসটির সূচনা হয়।
খুলনা বিশ্ববিদ্যালয়ের (খুবি) ফরেস্টি অ্যান্ড উড টেকনোলজি ডিসিপ্লিনের শিক্ষক এবং ইনিস্টিটিউট অব ফরেস্টারর্স বাংলাদেশের জয়েন্ট সেক্রেটারি প্রফেসর ড. নাজমুস সাদাত বলেন, “বাঘ সংরক্ষণে সবচেয়ে বেশি জরুরি বাঘের আবাসস্থলের প্রতিবেশ ব্যবস্থার ব্যবস্থাপনা। দক্ষ ব্যবস্থাপনার অভাবে বাঘ সংরক্ষণ সঠিকভাবে হচ্ছে না। এ ক্ষেত্রে দক্ষ ব্যবস্থাপক দিয়ে ব্যবস্থাপনা করতে হবে।”
তিনি আরও বলেন, “বাঘের আবাসস্থলের প্রশ্নে জোনিং কার্যকরভাবে বাস্তবায়ন করতে হবে। কোর জোন এবং বাফার জোনের পার্থক্য ঠিক করতে হবে। এই দুটি জোন একাকার হলে হবে না। বাঘের জন্য ‘কোর জোন’ নির্ধারণ করতে হবে। যা সম্পূর্ণ সুরক্ষিত এলাকা হিসেবে নির্দিষ্ট থাকবে। যেখানে মানুষের প্রবেশ কঠোরভাবে নিষিদ্ধ থাকতে হবে। সত্যিকার অর্থে কোর জোনকে হতে হবে বন্যপ্রাণী এবং বাস্তুতন্ত্রের নিরাপদ স্থল। আর কোর জোনকে ঘিরে থাকবে বাফার জোন। এখানে কিছু সীমিত পর্যটন, গবেষণা এবং পরিবেশগতভাবে টেকসই কার্যকলাপ চলতে পারে।”
একই বিভাগের শিক্ষক প্রফেসর ড. ওয়াসিউল ইসলাম বলেন, “সুরক্ষার জন্য বাঘের আবাসস্থল সংরক্ষণ করতে হবে। দক্ষ ব্যবস্থাপনায় বাঘের আবাসস্থলের পরিবেশ, বাস্তুতন্ত্র এবং বাঘের শিকার প্রাণী সংরক্ষণ করতে হবে। এটা না পারলে কোনো উদ্যোগই সুন্দরবনের বাঘ রক্ষা করতে পারবে না।”
তিনি আরও বলেন, “সুন্দরবনের হরিণ, বাঘের প্রধান খাবার। সুন্দরবনে চোরাই হরিণ শিকার বন্ধ হয়নি। হরিণ শিকার মানে বাঘের খাবারে টান পড়া। বাঘের খাবারের সংকট হলে বাঘ খাবারের সন্ধানে তার টেরিটরি বা হোমরেঞ্জ বড় করতে সচেষ্ট হয়। তখন শুরু হয় অন্য বাঘের সঙ্গে টিকে থাকার লড়াই। বাঘ নিজের আধিপত্য বিস্তারের দ্বন্দ্বে বা যুদ্ধে লিপ্ত থেকেই জীবনপ্রক্রিয়া চালায়। তাই বড় হোমরেঞ্জ মানেই বাঘের সংখ্যা কমার আশংকা। সেক্ষেত্রে খাবারের প্রাচুর্য থাকলে বাঘের হোমরেঞ্জও ছোট হয়। এতে বাঘের বেঁচে থাকার চ্যালেঞ্জ কমে।”
সুন্দরবন পশ্চিম বন বিভাগের বিভাগীয় কর্মকর্তা (ডিএফও) এবং সুন্দরবন বাঘ সংরক্ষণ প্রকল্পের প্রধান এজেডএম হাসানুর রহমান বলেন, “নানা ধরনের চ্যালেঞ্জের মধ্য দিয়ে হলেও সুন্দরবনের বাঘের সংখ্যা বাড়ছে। বর্তমানে ১২৫টি বাঘ রয়েছে। এ সংখ্যা ২০২৮ সাল নাগাদ ১৪০ থেকে ১৪৫টি হবে বলে আমরা আশাবাদী।”
তিনি আরও বলেন, “২০২৩-২৪ সালে ক্যামেরা ট্যাপিং করে গণনায় ২২টি বাঘের শাবককে নিয়ম অনুযায়ী গণনায় আনা হয়নি। সুতরাং এই শাবকগুলি পূর্ণবয়স্ক হয়ে আগামী গণনায় চলে আসবে। এছাড়াও এ সময়ের মধ্যে স্বাভাবিক প্রজনন প্রক্রিয়ায়ও বাঘের সংখ্যা বাড়বে।”
তিনি বলেন, “বাঘের পরজীবী সংক্রমণ, অন্যান্য ব্যাধির মাত্রা নির্ধারণ কার্যক্রম, বাঘ এবং হরিণ শিকারপ্রবণ ২৫টি ‘হটস্পট’ এলাকা নির্ধারণ এবং ক্যামেরা ট্যাপিংয়ের মাধ্যমে পর্যবেক্ষণ,‘বাঘ-মানুষ’ দ্বন্দ্ব নিরসনে ঝুঁকিপূর্ণ ৭৪ কিলোমিটার এলাকায় বেষ্টনি নির্মাণ, বাঘ এবং শিকার প্রাণীর জন্য কিল্লা স্থাপন, বন্যপ্রাণীর সুপেয় পানির জন্য পুকুর খনন ইত্যাদি কার্যক্রমে বাঘের আবাসস্থলকে টেকসই করতে ভূমিকা রাখছে।”
জানা যায়, সুন্দরবনে বাঘের খাবারের ৮০% আসে হরিণ, ১০% শুকর, ৪% বানর এবং অন্যান্য উৎস ৬% থেকে। সুতরাং বাঘের টিকে থাকা এবং বংশবৃদ্ধির জন্য এসব প্রাণীর সংখ্যার ভারসাম্য বজায় রাখা খুবই গুরুত্বপূর্ণ। ২০২৪ সালের এক গবেষণায় জানা যায় সুন্দরবনে ১,৩৬,০০০ হাজারের বেশি হরিণ, ৪৭,৫০০ শুকর, ১,৫২,০০০ বানর, ২৫,০০০ গুই সাপ, ১২,২০০ সজারু, ২০,০০০-২৫,০০০ ভোদড় রয়েছে।
বন বিভাগের পরিসংখ্যানে জানা যায়, ২০০১ সাল থেকে ২০২৫ সাল পর্যন্ত ৬১টি বাঘ বিভিন্ন কারণে মারা যায়। এর মধ্যে লোকালয়ে চলে এলে স্থানীয় মানুষ পিটিয়ে মেরেছে ১৪টি, দুষ্কৃতকারীরা হত্যা করেছে ২৬টি, স্বাভাবিক মৃত্যু হয়েছে ১৯টি এবং সিডরসহ প্রাকৃতিক কারণে দুইটি মারা যায়।
বন বিভাগ সূত্র জানায়, সুন্দরবনের বাঘসহ বন্যপ্রাণীর আবাসস্থল বৃদ্ধি করা হয়েছে। ৬ লাখ ১ হাজার ৭ শত হেক্টরের মধ্যে ৩ লাখ ১৭ হাজার ৯৫০ হেক্টর অভয়ারণ্য রয়েছে। যা ১৯৯৬ সালে মোট বনের ২৩% এবং পরে সম্প্রসারণ করায় বর্তমানে ৫৩% অভয়ারণ্য এলাকা রয়েছে। যার আয়তন ৩ লাখ ১৭ হাজার ৯৫০ হেক্টর।
বন বিভাগ সূত্রে জানা যায়, ২০০৪ সালে এক জরিপে ২১টি বাচ্চাসহ বাঘের সংখ্যা ছিল ৪৪০টি। ২০০৯ সালে বনবিভাগ এক জরিপে ৪০০ থেকে ৪৫০ বাঘের সন্ধান পান। ২০১৩ সালের নভেম্বর থেকে ২০১৫ সালের এপ্রিল মাস পর্যন্ত এক জরিপে বাঘের সংখ্যা কমে দাঁড়ায় মাত্র ১০৬টি। ২০১৬ সালের ১ ডিসেম্বর থেকে ২০১৮ সালের ২৪ এপ্রিল পর্যন্ত ২২৯ দিনে ১,৬৫৯ কিলোমিটার এলাকায় ২৪৯টি জায়গায় গাছের সঙ্গে ৪৯১টি সর্বাধুনিক ক্যামেরা ট্যাপিং পদ্ধতিতে জরিপে বাঘের সংখ্যা দাঁড়ায় ১১৪টি। ২০২৩ সালের জানুয়ারি থেকে ২০২৪ সালের মার্চ মাস পর্যন্ত এক জরিপে বাঘের সংখ্যা দাঁড়ায় ১২৫টিতে। সুন্দরবনের ৬০৫টি স্থানে ১,২১০টি ক্যামেরা ৩১৮ দিন রেখে এ জরিপ চালানো হয়। ভারত, নিউজিল্যান্ড ও যুক্তরাষ্ট্রের বিশেষজ্ঞ দলের মতামতের ভিত্তিতে জরিপের ছবি ও তথ্য বিশ্লেষণ করে বাঘের সংখ্যা নির্ধারণ করা হয়। ১০ লক্ষাধিক ছবি ও ভিডিও থেকে ৭,২৯৭টি বাঘের ছবি পাওয়া যায়। যা এর আগে কখনই পাওয়া যায়নি। এ জরিপ সম্পন্ন করতে ব্যয় ধরা হয় ৩ কোটি ৪০ লাখ টাকা।
এদিকে, গত ১১ জুলাই পূর্ব সুন্দরবনের শরণখোলা রেঞ্জ অফিস সংলগ্ন এলাকায় বাঘ হানা দেয়। এ সময় বাঘের তাড়া খেয়ে ৮-১০টি হরিণ অফিসের সামনে এসে হুমড়ি খেয়ে পড়ে। পরে অফিসের কাছাকাছি বাঘের পায়ের ছাপ দেখা গেছে। গত ৪ জুলাই একই এলাকায় বাঘের উপস্থিতি টের পাওয়া যায়। ফলে বনরক্ষীদের চলাচল বিঘ্ন ঘটে। এক পর্যায় বনরক্ষীদরে দুইদিন পর ফাঁকা গুলি ছুঁড়ে বাঘ তাড়াতে হয়। চলতি বছরের ১৯ জানুয়ারি দুপুরে একই রেঞ্জের কটকা অভয়ারণ্য এলাকার বেতমোর নদীর পাড়ে একত্রে তিনটি বাঘ দেখতে পান পর্যটকরা।
পূর্ব সুন্দরবন বিভাগের বিভাগীয় কর্মকর্তা মো. রেজাউল করিম চৌধুরী বলেন, “২০১৫ সাল থেকে এ পর্যন্ত যেভাবে বাঘ বৃদ্ধি পেয়েছে তা তুলনামূলকভাবে কম। এর সংখ্যা যদি ১৫০ থেকে ২০০টিতে দাঁড়ায় সেটা স্বাভাবিক হবে।”
তিনি আরও বলেন, “সুন্দরবন থেকে যদি বনদস্যু ও ডাকাত নির্মূল করা যায় তবেই বৃদ্ধি পাবে বাঘের সংখ্যা। সরকারি ও বিভিন্ন এনজিওগুলো আন্তরিকভাবে কাজ করলে বাঘ শিকার বন্ধ হবে। সুন্দরবনের বনদস্যু ও ডাকাতের কারণে তুলনামূলকভাবে বাঘ বাড়ছে না। সুন্দরবন থেকে বনদস্যু ও ডাকাত নির্মূল করা জরুরি হয়ে পড়েছে। গত দেড় বছরে সুন্দরবনে শরণখোলা রেঞ্জে কটকায় এলাকায় বার্ধক্যজনিত কারণে একটি বাঘের মৃত্যু হয়েছে। বাঘ সুরক্ষায় সুন্দরবনের একটি প্রকল্প চালু রয়েছে। যা শেষ হবে আগামী ২০২৬ সালে।”