সরকারের প্রথম বাজেট: গুরুত্ব পাচ্ছে যেসব বিষয়

২০২৬-২৭ অর্থবছরের জাতীয় বাজেট জাতীয় সংসদে উপস্থাপন করবেন অর্থমন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী। গত ফেব্রুয়ারিতে অনুষ্ঠিত জাতীয় সংসদ নির্বাচনের মাধ্যমে ক্ষমতায় আসা প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের নেতৃত্বাধীন বিএনপি সরকারের এটি প্রথম বাজেট।

সরকারি বার্তা সংস্থা বাসস জানিয়েছে, প্রস্তাবিত বাজেটের সম্ভাব্য আকার ৯ লাখ ৩৮ হাজার কোটি টাকা, যা দেশের ইতিহাসে সর্ববৃহৎ বাজেট হিসেবে বিবেচিত হবে। অর্থবিভাগের কর্মকর্তাদের মতে, সরকারের নির্বাচনী অঙ্গীকার বাস্তবায়ন এবং অর্থনৈতিক পুনরুদ্ধার কর্মসূচিকে গুরুত্ব দেওয়ার কারণেই বাজেটের আকার উল্লেখযোগ্যভাবে বৃদ্ধি পাচ্ছে।

প্রস্তাবিত বাজেটে আগামী অর্থবছরে মোট দেশজ উৎপাদনের (জিডিপি) আকার ৬৮ লাখ ৩০ হাজার কোটি টাকা নির্ধারণ করা হয়েছে। একই সঙ্গে অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির লক্ষ্য ধরা হয়েছে ৬.৫%।

মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণে বিশেষ গুরুত্ব

দেশে দীর্ঘদিন ধরে উচ্চ মূল্যস্ফীতি বিরাজ করছে। বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর (বিবিএস) সর্বশেষ তথ্য অনুযায়ী, এ বছরের মে মাসে মূল্যস্ফীতির হার ৯.৪২% হয়েছে।। এ পরিস্থিতিতে নতুন বাজেটে মূল্যস্ফীতি কমিয়ে ৭.৫ শতাংশে নামিয়ে আনার লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়েছে।

বাজেটের খসড়ায় মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণ, খাদ্য নিরাপত্তা নিশ্চিতকরণ, অর্থনীতির পুনরুদ্ধার, উচ্চতর প্রবৃদ্ধি অর্জন, সামাজিক সুরক্ষা কর্মসূচির সম্প্রসারণ, কর্মসংস্থান সৃষ্টি এবং সরকারের নির্বাচনী ইশতেহার বাস্তবায়নসহ ১৩টি বিষয়কে অগ্রাধিকার দেওয়া হয়েছে।

উদ্যোক্তা ও এসএমই খাতে নতুন উদ্যোগ

প্রস্তাবিত বাজেটে উদ্যোক্তা উন্নয়ন তহবিলের জন্য ২২৫ কোটি টাকা বরাদ্দ এবং ক্ষুদ্র ও মাঝারি শিল্প (এসএমই) খাতের জন্য ২ হাজার কোটি টাকার বিশেষ তহবিল গঠনের উদ্যোগ থাকতে পারে।

এছাড়া সরকারি চাকরিজীবীদের জন্য নতুন বেতন কাঠামোর আংশিক বাস্তবায়নের ঘোষণাও আসতে পারে বলে জানা গেছে।

সামাজিক সুরক্ষা কর্মসূচিতে বড় বরাদ্দ

বহুল আলোচিত ফ্যামিলি কার্ড ও কৃষক কার্ড কর্মসূচিসহ বিভিন্ন সামাজিক সুরক্ষা উদ্যোগের আওতায় মোট ১ লাখ ৩৮ হাজার ৩৩৯ কোটি টাকা বরাদ্দের প্রস্তাব থাকতে পারে। একই সঙ্গে ২৫ লাখ নাগরিকের জন্য ‘ই-হেলথ কার্ড’ কর্মসূচি চালুর উদ্যোগ নেওয়ার কথাও জানা গেছে।

সরকারের লক্ষ্য হলো নিম্ন ও মধ্যআয়ের মানুষের জীবনযাত্রার ব্যয় কমিয়ে সামাজিক নিরাপত্তা জোরদার করা।

রাজস্ব আদায়ে বড় চ্যালেঞ্জ

আগামী অর্থবছরে সরকারের মোট রাজস্ব আহরণের লক্ষ্যমাত্রা ধরা হয়েছে ৬ লাখ ৯৫ হাজার কোটি টাকা, যা চলতি অর্থবছরের লক্ষ্যমাত্রার তুলনায় প্রায় ২৩% বেশি।

এর মধ্যে জাতীয় রাজস্ব বোর্ড (এনবিআর) থেকে ৬ লাখ ৪ হাজার কোটি টাকা, এনবিআর বহির্ভূত উৎস থেকে ২৫ হাজার কোটি টাকা এবং কর-বহির্ভূত খাত থেকে ৬৬ হাজার কোটি টাকা সংগ্রহের পরিকল্পনা রয়েছে।

অর্থনীতিবিদদের মতে, বর্তমান অর্থনৈতিক বাস্তবতায় এই উচ্চ রাজস্ব লক্ষ্যমাত্রা অর্জন সরকারের জন্য অন্যতম বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়াবে।

বাজেট ঘাটতি ও ঋণ নির্ভরতা

প্রস্তাবিত বাজেটে প্রায় ২ লাখ ৪৩ হাজার কোটি টাকার ঘাটতি রাখা হয়েছে। এই ঘাটতি পূরণে সরকারকে অভ্যন্তরীণ ব্যাংক ঋণ, ব্যাংকবহির্ভূত উৎস এবং বৈদেশিক সহায়তার ওপর নির্ভর করতে হবে।

সরকার ব্যাংকিং খাত থেকে এক লাখ কোটি টাকারও বেশি ঋণ নেওয়ার পরিকল্পনা করেছে বলে জানা গেছে।

ব্যবসা ও বিনিয়োগবান্ধব সংস্কার

বাজেটে ব্যবসা সহজীকরণের লক্ষ্যে লাইসেন্স, অনুমোদন ও কর ব্যবস্থায় সংস্কারের উদ্যোগ থাকতে পারে। ‘বাংলাবিজ’ নামে একটি সমন্বিত ওয়ান-স্টপ ডিজিটাল সেবা প্ল্যাটফর্ম চালুর পরিকল্পনাও রয়েছে, যার মাধ্যমে ব্যবসাসংক্রান্ত বিভিন্ন সেবা অনলাইনে পাওয়া যাবে।

এছাড়া অনলাইনে কর রিটার্ন দাখিল, সরাসরি ব্যাংক হিসাবে কর ফেরত প্রদান এবং কর-সংক্রান্ত বিরোধ দ্রুত নিষ্পত্তির ব্যবস্থাও চালুর প্রস্তাব আসতে পারে।

অর্থনীতিবিদদের পর্যবেক্ষণ

বিশ্লেষকদের মতে, উচ্চ মূল্যস্ফীতি, নিম্নমুখী বেসরকারি বিনিয়োগ, রপ্তানি প্রবৃদ্ধির নেতিবাচক ধারা এবং মূলধনী যন্ত্রপাতি আমদানির দুর্বল প্রবণতার মধ্যে এবারের বাজেট ঘোষণা হচ্ছে।

বিশ্লেষকরা আরো মনে করছেন, সরকারের সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ হবে মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণের মাধ্যমে সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রার ব্যয় কমানো, বিনিয়োগ বৃদ্ধি, কর্মসংস্থান সৃষ্টি এবং রাজস্ব আহরণ বাড়িয়ে অর্থনীতিতে স্থিতিশীলতা ফিরিয়ে আনা।

নজরে থাকবে ভর্তুকি ও ঋণ পরিশোধ

গ্যাস, বিদ্যুৎ ও সার খাতে ক্রমবর্ধমান ভর্তুকির চাপ এবং উন্নয়ন প্রকল্পের জন্য নেওয়া দেশি-বিদেশি ঋণের কিস্তি পরিশোধের দায়ও আগামী অর্থবছরে সরকারের জন্য গুরুত্বপূর্ণ চ্যালেঞ্জ হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে।

বিশ্লেষকদের মতে, এসব চাপ মোকাবিলায় অভ্যন্তরীণ রাজস্ব আয় বৃদ্ধি, ব্যয় ব্যবস্থাপনায় দক্ষতা এবং বিনিয়োগবান্ধব পরিবেশ নিশ্চিত করার ওপরই বাজেটের সাফল্য অনেকাংশে নির্ভর করবে।