বাজেট, মূল্যস্ফীতি ও মজুতদারি নিয়ে ইসলাম কী বলে

প্রতিবার জাতীয় বাজেট ঘোষণার পর সাধারণ মানুষের সবচেয়ে বড় উদ্বেগ থাকে নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের দাম নিয়ে। দেশের সামষ্টিক অর্থনীতির গতিপ্রকৃতি কিংবা মেগা প্রকল্পের বরাদ্দের চেয়েও সাধারণ ভোক্তার কাছে বাজেটের সবচেয়ে বড় অর্থ হলো, বাজার খরচ কমবে নাকি বাড়বে; চাল, ডাল, তেল, চিনি আর ওষুধের দাম নাগালের মধ্যে থাকবে কিনা। এসব বিষয় নিয়ে প্রথম আলোর একটি প্রতিবেদনে বিস্তারিত তুলে ধরা হয়েছে।

বর্তমান বাজারে মূল্যস্ফীতির যে চাপ, তার সঙ্গে নতুন বাজেটের কর প্রস্তাবনা ও বাজার ব্যবস্থাপনার সম্পর্ক অত্যন্ত নিবিড়। এই পরিস্থিতিতে বাজার নিয়ন্ত্রণ, মূল্যস্ফীতি, সিন্ডিকেট এবং কৃত্রিম সংকটের মুখে সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রা নিয়ে ইসলামের স্পষ্ট দৃষ্টিভঙ্গি ও সুনির্দিষ্ট নির্দেশনা রয়েছে। যেহেতু ইসলাম শুধু কিছু আনুষ্ঠানিক ইবাদতের সমষ্টি নয়, বরং এটি একটি পূর্ণাঙ্গ জীবনবিধান, তাই মানুষের অর্থনৈতিক জীবন যাতে শোষণমুক্ত, সহজ ও ভারসাম্যপূর্ণ হয়, ইসলামি অর্থনীতিতে তার সুস্পষ্ট রূপরেখা দেওয়া হয়েছে।

মজুতদারি ও কৃত্রিম সংকট তৈরি ইসলামে সম্পূর্ণ ‘হারাম’
বাজারের স্বাভাবিক নিয়ম হলো, পণ্যের সরবরাহ ও চাহিদার ওপর ভিত্তি করে দাম নির্ধারিত হবে। কিন্তু আমাদের দেশে প্রায়ই দেখা যায়, বাজেটকে কেন্দ্র করে বা যেকোনো অজুহাতে কিছু অসাধু ব্যবসায়ী সিন্ডিকেট করে পণ্য মজুত করে রাখেন। এর ফলে বাজারে কৃত্রিম সংকট তৈরি হয় এবং দাম সাধারণ মানুষের নাগালের বাইরে চলে যায়। ইসলাম এ ধরনের অপতৎপরতাকে সম্পূর্ণ ‘হারাম’ বা নিষিদ্ধ ঘোষণা করেছে। ইসলামি পরিভাষায় একে বলা হয় ‘ইহতিকার’ বা মজুতদারি।

যারা বাজারকে অস্থিতিশীল করে তোলে, তারা মূলত সমাজের অসহায় মানুষের পকেট কাটে। এ ধরনের উপার্জন কোনোভাবেই বরকতময় হতে পারে না। মজুতদারদের মানসিকতার নিন্দা করে মহানবী হযরত মুহাম্মদ (সা.) বলেছেন, যে ব্যক্তি মুসলমানদের খাদ্যশস্য মজুত করে কৃত্রিম সংকট তৈরি করে, আল্লাহ তাআলা তাকে কুষ্ঠরোগ ও দারিদ্র্য দ্বারা শাস্তি দেন (সুনান ইবনে মাজাহ)। অন্য হাদিসে আরও কঠোর ভাষায় বলা হয়েছে, মজুতদার ব্যক্তি কতই না নিকৃষ্ট! আল্লাহ যদি দাম সস্তা করেন, তবে সে চিন্তিত হয়ে পড়ে, আর যদি দাম বৃদ্ধি পায়, তবে সে আনন্দিত হয় (বাইহাকি, শুআবুল ইমান)।

বাজার নিয়ন্ত্রণে রাষ্ট্রের নৈতিক দায়িত্ব ও ‘হিসবাহ’ নীতি
মূল্যস্ফীতি যখন সাধারণ মানুষের জীবনকে বিপর্যস্ত করে তোলে, তখন শুধু ব্যবসায়ীদের নসিহত বা উপদেশ দিলেই রাষ্ট্রের দায়িত্ব শেষ হয়ে যায় না। বাজার স্থিতিশীল রাখতে এবং ক্রেতা-ভোক্তার স্বার্থ রক্ষায় রাষ্ট্রকে কঠোর ভূমিকা পালন করতে হয়। ইসলামি রাষ্ট্রব্যবস্থায় বাজার তদারকির এই প্রক্রিয়াকে বলা হয় ‘আল-হিসবাহ’।

মুসলিম খলিফাদের আমলে বাজার নিয়ন্ত্রণের জন্য বিশেষ পরিদর্শক বা ‘মুহতাসিব’ নিয়োগ দেওয়া হতো। নবীজি (সা.) নিজেও মদিনার বাজার পরিদর্শনে যেতেন এবং পণ্যের মান ও দামের দিকে নজর রাখতেন। একবার এক শস্য বিক্রেতার স্তূপের ভেতর হাত ঢুকিয়ে ভেজা শস্য পেয়ে তিনি বলেছিলেন, যে ব্যক্তি প্রতারণা করবে, সে আমার দলভুক্ত নয় (সহিহ মুসলিম)।

উন্নয়নশীল দেশে করের বোঝা কিংবা আন্তর্জাতিক বাজারের দোহাই দিয়ে অনেক সময় দাম বাড়ানো হয়। ব্যবসায়ীদের লাভ নিশ্চিত করতে হবে, কিন্তু সেই লাভ যেন শোষণে রূপ না নেয়। ইসলামে মুনাফার কোনো নির্দিষ্ট শতকরা হার বেঁধে দেওয়া না হলেও, একে ন্যায্য ও যৌক্তিক রাখার তাগিদ দেওয়া হয়েছে।

কোরআনে ব্যবসায়ীদের সততার নির্দেশ দিয়ে বলা হয়েছে, হে মুমিনগণ, তোমরা একে অপরের সম্পত্তি অন্যায়ভাবে গ্রাস কোরো না, কেবল পারস্পরিক সম্মতিতে ব্যবসার মাধ্যমে যা হয় তা ব্যতীত (সুরা নিসা, আয়াত: ২৯)। এখানে পারস্পরিক সম্মতি বলতে কেবল মুখে রাজি হওয়া বোঝায় না, বরং ক্রেতা যাতে কোনো পরিস্থিতির শিকার বা নিরুপায় হয়ে চড়া দামে পণ্য কিনতে বাধ্য না হয়, সেই মনস্তাত্ত্বিক দিকটিও শামিল। সংকটের সময়ে সাধারণ মানুষের দুঃখ-কষ্টের সুযোগ নিয়ে অতিরিক্ত মুনাফা করা একধরনের জুলুম। মহানবী (সা.) বলেছেন, সহজ সরল ও উদার ক্রেতা-বিক্রেতার ওপর আল্লাহ রহমত বর্ষণ করুন (সহিহ বুখারি)।

মূল্যস্ফীতিতে সমাজের করণীয় ও উচ্চবিত্তের ভূমিকা
নতুন বাজেটে করের পরিধি বৃদ্ধি বা নিত্যপণ্যের দাম বাড়লে সবচেয়ে বেশি চাপে পড়ে মধ্যবিত্ত ও নিম্নবিত্ত পরিবারগুলো, যারা লোকলজ্জার ভয়ে কারও কাছে হাত পাততে পারে না। কোরআনে আল্লাহ তাআলা এই আত্মমর্যাদাশীল শ্রেণির কথা উল্লেখ করে বলেছেন, অজ্ঞ লোকেরা সম্ভ্রম ও আত্মমর্যাদার কারণে তাদেরকে অভাবমুক্ত মনে করে; তুমি তাদেরকে তাদের লক্ষণ দেখে চিনতে পারবে, তারা মানুষের কাছে আকুল হয়ে ভিক্ষা চায় না (সুরা বাকারা, আয়াত: ২৭৩)।

তাই বাজার মূল্যের এই কঠিন সময়ে বিত্তবান শ্রেণির উচিত রাষ্ট্রীয় হিসাবের বাইরে গিয়ে নিজেদের জাকাত, সদকা ও দানের মাধ্যমে একটি নিজস্ব সামাজিক নিরাপত্তাবলয় তৈরি করা। কারণ, প্রতিবেশী ক্ষুধার্ত থাকলে নিজের পেট পুরে খাওয়াকে ইসলামে ইমানের পরিপন্থী বলা হয়েছে (বুখারি, আল-আদাবুল মুফরাদ)।

রাষ্ট্রীয় অপচয় রোধ ও সুশাসন
বাজেট বাস্তবায়নে একটি বড় সংকট হলো অপচয় এবং সম্পদের সঠিক ব্যবহার না হওয়া। অনেক সময় মেগা প্রকল্প বা উন্নয়ন বাজেটের একটা বড় অংশ দুর্নীতি ও অপচয়ের পেটে চলে যায়, যার খেসারত দিতে হয় সাধারণ করদাতাদের। ইসলাম রাষ্ট্রীয় সম্পদকে জনগণের ‘আমানত’ হিসেবে বিবেচনা করে। অপচয়ের ব্যাপারে পবিত্র কোরআনে বলা হয়েছে, নিশ্চয়ই অপব্যয়কারীরা শয়তানের ভাই (সুরা ইসরা, আয়াত: ২৭)।

আধুনিক ইসলামি অর্থনীতি বিশেষজ্ঞ মুহাম্মদ ওমর চাপরা তাঁর গবেষণায় লিখেছেন, উন্নয়নশীল দেশগুলোতে বাজেট ঘাটতির অন্যতম প্রধান কারণ হলো অনুৎপাদনশীল খাতে অতিরিক্ত রাষ্ট্রীয় ব্যয় এবং অপচয়, যা পরোক্ষভাবে মূল্যস্ফীতি উসকে দেয়। রাষ্ট্র যদি নিজের ব্যয় সংকোচন করে অপচয় রোধ করতে পারে, তবে বাজেটের ঘাটতি মেটাতে জনগণের ওপর অতিরিক্ত কর বা ঋণের বোঝা চাপাতে হয় না, ফলে মূল্যস্ফীতিও নিয়ন্ত্রণে থাকে।

সুতরাং, নতুন বাজেট যদি সত্যিই সাধারণ মানুষের কল্যাণ বয়ে আনতে চায়, তবে সামষ্টিক অর্থনীতির গালভরা খতিয়ানের পাশাপাশি সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রার বাস্তব চিত্রকে সামনে রাখতে হবে। ইসলাম আমাদের শেখায়, অর্থনীতির মূল লক্ষ্য হওয়া উচিত মানবকল্যাণ এবং সম্পদের সুষম বণ্টন।