সিপিডি: বাজেট বাস্তবায়ন কঠিন, অর্থনীতির সব সূচকই চাপে

২০২৬-২৭ অর্থবছরের প্রস্তাবিত বাজেটের সামষ্টিক অর্থনীতির লক্ষ্যমাত্রাগুলো অর্জন করাই সরকারের জন্য সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ হবে বলে জানিয়েছে সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগ (সিপিডি)। বর্তমানে অর্থনীতির প্রায় সব সূচকই চাপের মুখে রয়েছে বলে জানিয়েছে বেসরকারি গবেষণা সংস্থাটি ।

শুক্রবার (১২ জুন) সকালে রাজধানীর গুলশানে হোটেল লেকশোরে ‘জাতীয় বাজেট ২০২৬-২৭: সিপিডির পর্যালোচনা’ শীর্ষক অনুষ্ঠানে সংস্থাটির নির্বাহী পরিচালক ড. ফাহমিদা খাতুন এ কথা বলেন।

সংস্থাটি বলছে, ২০২৬-২৭ অর্থবছরের প্রস্তাবিত জাতীয় বাজেট অত্যন্ত উচ্চাভিলাষী অনুমানের ওপর ভিত্তি করে তৈরি করা হয়েছে।

সিপিডির বিশিষ্ট ফেলো মোস্তাফিজুর রহমান বলেন, “মূল্যস্ফীতি, প্রবৃদ্ধি, বিনিয়োগ এবং রাজস্ব আদায়ের বিষয়ে বাজেটে যেসব লক্ষ্যমাত্রা ধরা হয়েছে, তা বর্তমান অর্থনৈতিক বাস্তবতার সঙ্গে পুরোপুরি সংগতিপূর্ণ নয়। ফলে এর বাস্তবায়ন কঠিন হয়ে পড়বে।”

সিপিডির নির্বাহী পরিচালক ফাহমিদা খাতুন সরকারের আগামী অর্থবছরে মূল্যস্ফীতি ৭.৫% নামিয়ে আনার লক্ষ্য নিয়ে প্রশ্ন তোলেন। তার মতে, বিদ্যমান অর্থনৈতিক পরিস্থিতিতে এই লক্ষ্য অর্জন করা অত্যন্ত কঠিন হবে।

তিনি বলেন, “মূল্যস্ফীতি ৭.৫% নামিয়ে আনতে কেবল পর্যাপ্ত খাদ্য ও জ্বালানি সরবরাহ নিশ্চিত করলেই হবে না, বরং একটি কার্যকর ও বাস্তবসম্মত মুদ্রানীতিও প্রয়োজন হবে। সংকোচনমূলক মুদ্রানীতি হয়তো আরও কিছু সময় ধরে চালিয়ে যেতে হবে।”

ফাহমিদা খাতুন সতর্ক করে জানান, সরকারের পরিকল্পিত ব্যয় বৃদ্ধি যদি উৎপাদনশীলতা, কর্মসংস্থান ও বিনিয়োগ না বাড়ায়, তবে তা মূল্যস্ফীতির চাপ আরও বাড়াতে পারে।

তিনি বলেন, “এটি একটি বড় বাজেট। সরকারি ব্যয় বাড়বে। কিন্তু সেই ব্যয় যদি উৎপাদনশীলতা না বাড়ায়, তাহলে তা মূল্যস্ফীতির চাপ আরও বাড়িয়ে দিতে পারে।”

সিপিডির মতে, দেশে বর্তমানে মূল্যস্ফীতি মূলত সরবরাহজনিত, যা শুধু মুদ্রানীতি কঠোর করে নিয়ন্ত্রণ করা সম্ভব নয়। খাদ্য সরবরাহ বাড়ানো, জ্বালানি স্থিতিশীল রাখা এবং সরবরাহ শৃঙ্খল উন্নত করা মূল্য নিয়ন্ত্রণে গুরুত্বপূর্ণ।

প্রতিষ্ঠানটি সরকারের মূল্যস্ফীতি পূর্বাভাস নিয়েও সন্দেহ প্রকাশ করেছে। মে মাস পর্যন্ত ১২ মাসের গড় হিসেবে মূল্যস্ফীতি দাঁড়িয়েছে ৮.৬%, আর পয়েন্ট-টু-পয়েন্ট হিসেবে ৯.৪%। যা এখনও উচ্চ মূল্যচাপের ইঙ্গিত দেয়।

ফাহমিদা খাতুন বলেন, “এমন একটি সময়ে এই বাজেট প্রণয়ন করা হয়েছে যখন বাংলাদেশের অর্থনীতি দীর্ঘমেয়াদি উচ্চ মূল্যস্ফীতি, দুর্বল বেসরকারি বিনিয়োগ, ধীরগতির কর্মসংস্থান সৃষ্টি, রাজস্ব ঘাটতি এবং ব্যাংকিং খাতের ভঙ্গুরতাসহ বহুমুখী চ্যালেঞ্জের মুখোমুখি হচ্ছে।”

তিনি আরও জানান, রেমিট্যান্স প্রবাহ বাড়ায় বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ কিছুটা উন্নতি হয়েছে, তবে জ্বালানি সরবরাহ ও বৈশ্বিক তেলের দামের অনিশ্চয়তা এখনও বড় ঝুঁকি হিসেবে রয়ে গেছে।

সরকারের জিডিপি প্রবৃদ্ধির লক্ষ্যমাত্রা নিয়েও দ্বিমত পোষণ করেছে সিপিডি। ২০২৬-২৭ অর্থবছরের বাজেটে জিডিপি প্রবৃদ্ধির লক্ষ্যমাত্রা ধরা হয়েছে ৬.৫%। অথচ চলতি অর্থবছরের সাময়িক প্রাক্কলন ধরা হয়েছে ৫%, যেখানে সরকারি পরিসংখ্যান অনুযায়ী প্রকৃত প্রবৃদ্ধি ৪%-এর কিছুটা ওপরে রয়েছে।

সিপিডির মতে, বেসরকারি বিনিয়োগের প্রাক্কলনও অতিরিক্ত আশাবাদী বলে মনে হচ্ছে। দীর্ঘ সময় ধরে বিনিয়োগকারীদের আস্থার সংকট থাকা সত্ত্বেও, বাজেটে প্রত্যাশা করা হয়েছে যে আগামী অর্থবছরে বেসরকারি বিনিয়োগ জিডিপির ২১.৩% উন্নীত হবে, যা চলতি অর্থবছরের সংশোধিত প্রাক্কলনে রয়েছে ২১.২%।

এছাড়া বেসরকারি খাতে ঋণ প্রবৃদ্ধি ৯.৪% হবে বলে সরকারের যে প্রত্যাশা, তা নিয়েও প্রশ্ন তুলেছে সিপিডি। সংস্থাটি উল্লেখ করেছে, গত এপ্রিল মাসে এই ঋণ প্রবৃদ্ধি ছিল মাত্র ৪.৭৫%।

সিপিডি জোর দিয়ে বলেছে, উচ্চ প্রবৃদ্ধি অর্জন এবং মূল্যস্ফীতি কমিয়ে আনার জন্য ব্যবসায়ী ও বিনিয়োগকারীদের আস্থা ফিরিয়ে আনা অপরিহার্য।