বেড়েছে মদের চাহিদা, উৎপাদনে কেরুর তোড়জোড়

গত ছয় মাসে বাংলাদেশের একমাত্র অ্যালকোহল উৎপাদনকারী প্রতিষ্ঠান কেরু অ্যান্ড কোং-এর উৎপাদিত দেশি মদের বিক্রি ৫০% বেড়েছে। একই সঙ্গে দেশে অ্যালকোহলের চাহিদাও বেড়েছে বলে জানিয়েছে প্রতিষ্ঠানটি। কেরু অ্যান্ড কোং বলছে, নতুন বছরে তারা তাদের মদের উৎপাদন আরও বাড়াচ্ছে।

এক প্রতিবেদনে এ তথ্য জানিয়েছে বিবিসি বাংলা। সেই সঙ্গে, দেশের প্রথম বিয়ার কারখানাও চালু করতে যাচ্ছে কেরু।

দেশে মদের চাহিদা বাড়ার কারণ

বিবিসি জানায়, গত পাঁচ বছর ধরে বাংলাদেশে ক্রমাগতভাবে বেড়েই চলেছে মদের চাহিদা। মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তর এবং শিল্প মন্ত্রণালয়ের কর্মকর্তারা বিবিসি বাংলাকে জানিয়েছেন, স্থানীয়ভাবে মদের চাহিদা ২০১৬ সাল থেকে বাড়ছে। গত কয়েক বছরে সরকারের বিভিন্ন উন্নয়ন প্রকল্পে কাজ করা বিদেশি প্রকৌশলী এবং কর্মীদের চাহিদার কারণে মদের চাহিদা এবং উৎপাদন বেড়েছে।

কেরু অ্যান্ড কোং-এর ব্যবস্থাপনা পরিচালক মো. মোশারফ হোসেন জানান, ২০১৯-২০ অর্থবছরে প্রতিষ্ঠানটি মদ বিক্রি করেছে ৪২ লাখ ৬২ হাজার লিটার। সেই পরিমাণ ২০২০-২১ অর্থবছরে এসে দাঁড়ায় প্রায় ৪৭ লাখ লিটার।


আরও পড়ুন- মদের উৎপাদন বাড়াচ্ছে কেরু অ্যান্ড কোম্পানি


তিনি বলেন, “করোনাভাইরাসের কারণে দেশে মদের চাহিদা থাকলেও আমদানি করা বিদেশি মদের সরবরাহ এখন অনেক কম। এছাড়াও ২০২১ সালে ভেজাল মদ খেয়ে অসুস্থ হয়ে পড়েছিলেন অসংখ্য মানুষ। কয়েকজন মারাও গিয়েছেন।” এছাড়াও দেশে বিদেশি মদের আমদানি কম হওয়াকেও দেশীয় মদের চাহিদা বাড়ার আরেকটি কারণ বলে মনে করেন।

মো. মোশারফ হোসেন বলেন, “করোনাভাইরাসের সংক্রমণের কারণে সরকার সারা দেশে বিধিনিষেধ জারি করে। এরপর ২০২১ সালে সংক্রমণ এবং মৃত্যুর গতি কিছুটা কমলে সরকার চলাচলে বিধিনিষেধ শিথিল করে। তখন মানুষ ব্যাপক হারে দেশের বিভিন্ন স্থানে, পর্যটন কেন্দ্রে ঘুরতে শুরু করে। সে সময় মদের আরেক দফা চাহিদা বাড়ে।”

তিনি জানান, চলতি অর্থবছরে অর্থাৎ ২০২১-২২ সালের অক্টোবর থেকে ডিসেম্বর মাস পর্যন্ত তিন মাসে কেরু অ্যান্ড কোং কোম্পানির উৎপাদিত মদের বিক্রি প্রায় ৫০% বেড়েছে। আগে মাসে কেরুর ১৩ হাজার কেস মদ এক মাসে বিক্রি করত। যা অক্টোবর মাসে এসে দাঁড়ায় সাড়ে ১৮ হাজারেরও বেশি কেস। নভেম্বরে প্রায় সাড়ে ১৯ হাজার এবং ডিসেম্বরে ২০ হাজারের বেশি কেস মদ বিক্রি করেছে প্রতিষ্ঠানটি।

প্রতি কেসে ৭৫০ মিলি লিটারের ১২টি বোতল, ৪৬৫ মিলি লিটারের ২৪টি বোতল এবং ১৮০ মিলি লিটারের ৪৮টি মদের বোতল থাকে। কেরুর যেসব ব্র্যান্ডের বিদেশি মদ রয়েছে, সেগুলো হলো- ইয়েলো লেভেল মল্টেড হুইস্কি, গোল্ড রিবন জিন, ফাইন ব্র্যান্ডি, শেরি ব্র্যান্ডি, ইম্পেরিয়াল হুইস্কি, সারিনা ভদকা, রোসা রাম ও ওল্ড রাম। ১৮০ মিলিলিটার, ৩৬৫ মিলিলিটার ও ৭৫০ মিলিলিটার বোতলে মদ বাজারজাত করে প্রতিষ্ঠানটি।

বিদেশি মদের আমদানি কমার কারণ

মাদক নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তরের হিসাব অনুযায়ী, ২০২০-২১ অর্থবছরে বৈধভাবে এক লাখ পাঁচ হাজার লিটারের মতো মদ বাংলাদেশে আমদানি হয়েছে। আর বিয়ার আমদানি হয়েছে প্রায় দেড় লাখ লিটারের মতো। কিন্তু মাদক নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তরের ঊর্ধ্বতন এক কর্মকর্তা বিবিসিকে বলেছেন, দেশের বার এবং ওয়্যারহাউজগুলোতে আমদানির চেয়ে কয়েকগুণ বেশি মদ বিক্রি হয়েছে বলে তাদের কাছে তথ্য আছে।

এদিকে, দেশে করোনাভাইরাসের মহামারীর আগে মদের চাহিদা ধারাবাহিকভাবে বাড়লেও লকডাউনের শুরুতে আমদানি করা মদ বিক্রি প্রায় বন্ধ হয়ে যায়। এমন অবস্থায় কয়েকমাস বন্ধ থাকে দেশের বার এবং ওয়্যারহাউজগুলো। এ সময় বিদেশি মদ আমদানিকারকরা আমদানি শুল্ক কমানোর দাবি তোলে। ঠিক একই সময়ে কর ফাঁকির অভিযোগে বিভিন্ন বার এবং ওয়্যারহাউজে অভিযান চালায় মাদক নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তর ও পুলিশ।


আরও পড়ুন- এবার বিয়ার তৈরির চিন্তা করছে কেরু এন্ড কোং


পরবর্তীতে জুলাই মাসে চোরাইপথে আনা এবং শুল্কমুক্ত আমদানি সুবিধা ব্যবহার করে আনা মদ বিক্রি ঠেকাতে একটি সফটওয়্যার চালুর উদ্যোগ নেয় জাতীয় রাজস্ব বোর্ড। তখন এর বিরোধিতা করে বন্ডেড ওয়্যারহাউজগুলো।

বার ম্যানেজাররা জানান, এ বছরের ২ জুলাই থেকে এনবিআর সফটওয়্যার ব্যবহার বাধ্যতামূলক করার পর দেশের বিদ্যমান ছয় ব্যক্তিগত কূটনৈতিক বন্ডেড ওয়্যারহাউজগুলো ধর্মঘট ডাকে। এর জেরে মদের সংকট দেখা দিলে সাম্প্রতিক সময়ে কেরুর মদের বিক্রি বেড়েছে।

মদের উৎপাদন বাড়ানোর পরিকল্পনা কেরুর

শুল্কমুক্ত আমদানি সুবিধার অপব্যবহার রোধের লক্ষ্যে তৈরি করা সফটওয়্যারের ব্যবহার নিয়ে বেসরকারি কূটনৈতিক বন্ডেড ওয়্যারহাউজ ও জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের (এনবিআর) মধ্যকার রেষারেষির কারণে দেশে বিদেশি মদের সরবরাহ কমে যায়। ফলে কেরু অ্যান্ড কোম্পানি (বাংলাদেশ) লিমিটেডের মদের চাহিদা বেড়ে যায়। আর এ বাড়তি চাহিদার কথা মাথায় রেখেই মদের উৎপাদন বাড়ানোর কথা ভাবতে শুরু করে দেশীয় ব্র্যান্ডটি।


আরও পড়ুন- চালু হচ্ছে দুটি সরকারি বন্ডেড ওয়্যারহাউস, ভাঙছে মদের সিন্ডিকেট


ঢাকা, চট্টগ্রাম ও চুয়াডাঙ্গা জেলার দর্শনায় কেরু অ্যান্ড কোম্পানির তিনটি বিক্রয়কেন্দ্র রয়েছে। কক্সবাজার ও পটুয়াখালী জেলার কুয়াকাটায় আরও দুটি বিক্রয়কেন্দ্র স্থাপন করছে তারা। এছাড়া, সম্প্রতি ঢাকা ও শ্রীমঙ্গলের ওয়্যারহাউজগুলোতে কেরু অ্যান্ড কোম্পানির মদের চাহিদা সবচেয়ে বেশি বাড়ায় প্রতিষ্ঠানটি আরও তিনটি ওয়্যারহাউজ স্থাপনে আগ্রহী।

কেরুর ব্যবস্থাপনা পরিচালক মোশারফ হোসেন জানান, নতুন মার্কেটিং পরিকল্পনার আওতায় ম্যানেজমেন্ট তিনটি ওয়্যারহাউজ ও দুটি বিক্রয়কেন্দ্র স্থাপনের সিদ্ধান্ত নিয়েছে। এ বিষয়ে মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তরের কাছে অনুমতি চেয়েছে প্রতিষ্ঠানটি।

তিনি আরও জানান, মাদকদ্রব্য অধিদপ্তর দুটি বিক্রয়কেন্দ্রের অনুমোদন দিয়েছে। এখন বিক্রয়কেন্দ্রগুলো পেতে কোম্পানিটি পর্যটন কর্পোরেশনের সঙ্গে একটি সমঝোতা স্মারক (এমওইউ) স্বাক্ষর করবে।