প্রচণ্ড গরমে সামায়িক স্বস্তির পরশ পেতে আমরা অনেকেই এক বোতল ঠাণ্ডা কোমল পানীয় পান করে থাকি। মুদ্রাস্ফীতির কারণে প্রায় সবকিছুর দাম বেড়ে গেলেও কোমল পানীয়ের মূল্য অপরিবর্তিত ছিল। কিন্তু খুব বেশি দিন আর আগের দামে কোমল পানীয় মিলবে না।
আসন্ন ২০২৪-২৫ অর্থবছরের জন্য প্রস্তাবিত বাজেটে কার্বোনেটেড বেভারেজ (কোমল পানীয়) পণ্য বিক্রি থেকে প্রাপ্ত আয়ের ওপর কর (টার্নওভার ট্যাক্স) ৫% করার প্রস্তাব করা হয়েছে, যা বর্তমানে ০.৬%। অতিরিক্ত টার্নওভার ট্যাক্স আরোপের ফলে প্রস্ততকারক প্রতিষ্ঠানগুলো কোমল পানীয়র দাম ২০-৩০% বাড়াতে পারে বলে ধারণা করা হচ্ছে।
খাতসংশ্লিষ্টদের আশঙ্কা, আসন্ন বাজেটে অতিরিক্ত টার্নওভার ট্যাক্স আরোপের প্রস্তাবের কারণে কোমল পানীয়র ব্যবসা প্রবৃদ্ধি বাধাগ্রস্ত হতে পারে।তাছাড়া অতিরিক্ত লোকসানের ঝুঁকিতে অনেকের ব্যবসা গুটিয়ে ফেলার সম্ভাবনাও রয়েছে। এমনকি ভবিষ্যতে এ ব্যবসায় বিনিয়োগও নিরুৎসাহিত হওয়ার ঝুঁকি রয়েছে।
কোমল পানীয়ের দাম বেড়ে গেলে একদিকে যেমন গ্রাহকের সংখ্যা কমে যাবে তেমনি সরকারের রাজস্বও কমবে। সংশ্লিষ্টদের ধারণা, এর ফলে কোমল পানীয় খাত থেকে সরকারের আয় ২০%-২৫% কমে যাবে। তাদের ভাষ্যমতে, বর্তমানে বাংলাদেশের জিডিপির ১.১% আসে এ খাত থেকে, যা ২০১২ সালের তুলনায় দ্বিগুণ।
প্রতিবছর বাংলাদেশের পানীয় শিল্পের প্রবৃদ্ধি ২০% হারে বাড়ছে। কোমল পানীয়ের খাত থেকে বর্তমানে জাতীয় কোষাগারে প্রায় দেড় হাজার কোটি টাকা আসে। প্রস্তাবিত টার্নওভার কর বেড়ে যাওয়ার সরাসরি ফলাফল হিসেবে এটি যে ব্যাপকভাবে কমে যাবে, তা বলাই বাহুল্য।
বাংলাদেশে বিনিয়োগ
বাংলাদেশে কোমল পানীয়র অধিকাংশ কাঁচামাল স্থানীয়ভাবে সরবরাহ করা হয়ে থাকে। পাশাপাশি কোমল পানীয়র ব্যবসার মাধ্যমে প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষভাবে রয়েছে প্রায় সাড়ে তিন লাখ মানুষের কর্মসংস্থান। তাই কোমল পানীয় ব্যবসার সম্প্রসারণের কথা মাথায় রেখে অনেক প্রতিষ্ঠানই বড় বিনিয়োগের পরিকল্পনা করছে।
২০২০ সালে বাংলাদেশ সফরে এসেছিলেন কোকাকোলার গ্লোবাল চেয়ারম্যান এবং প্রধান নির্বাহী (সিইও) জেমস কুইন্সি। তার তথ্যমতে, আগামী পাঁচ বছরে প্রতিষ্ঠানটি বাংলাদেশে ২০০ মিলিয়ন মার্কিন ডলার বিনিয়োগের পরিকল্পনা নিয়েছে। কোকাকোলা ছাড়া অন্যান্য কোমল পানীয় প্রস্তুতকারীরাও বাংলাদেশে বিনিয়োগের চিন্তা করছে।
কোমল পানীয় উৎপাদনে কোকাকোলা বাংলাদেশ বেভারেজ ১০০০ কোটি আর কোকাকোলার মালিকানাধীন বোতলজাত প্রতিষ্ঠান এবং ফ্র্যাঞ্চাইজ আব্দুল মোনেম লিমিটেড ২৯০ কোটি টাকার বেশি বিনিয়োগ করেছে। সেই সঙ্গে ট্রান্সকম বেভারেজ ৭৫৬ কোটি টাকা, গ্লোব সফট ড্রিংকস ৫৬৫ কোটি টাকা, এএসটি বেভারেজ ৩৮৪ কোটি টাকা, প্রাণ বেভারেজ ৪৮৫ কোটি টাকা, পারটেক্স বেভারেজ ২২৯ কোটি টাকা, সজীব কর্পোরেশন ১৪০ কোটি টাকা এবং মেঘনা গ্রুপ ৩৩৬ কোটি টাকা বিনিয়োগ করেছে।
প্রতিবেশী দেশগুলোর সঙ্গে তুলনা
বাজার বিশেষজ্ঞদের মতে, বিদ্যমান কর কাঠামোতেই লড়াই করতে হচ্ছে পানীয় ব্যবসায়ীদের। সেখানে নতুন এই করের বোঝা তাদের জন্য আরও কঠিন হবে। কর্পোরেশন এবং বাণিজ্যিক করসহ পানীয় শিল্পে সম্পূরক শুল্ক ৪৩.৭৫%।
বাংলাদেশের প্রতিবেশি দেশগুলোর দিকে তাকালে দেখা যায়, পানীয় শিল্পে সম্পূরক শুল্কের পরিমাণ ভারতে ৪০%, নেপালে ৩৮.৪৩%, ভুটানে ৩০%, এবং মালদ্বীপে ৬%। শুধু তাই না, কোমল পানীয়র ব্যবসায় বিশ্বের অধিকাংশ দেশেই কোনো আবগারি বা অতিরিক্ত শুল্ক দিতে হয় না।
সংশ্লিষ্টরা যা বলছেন
কোকাকোলা বাংলাদেশ বেভারেজের ব্যবস্থাপনা পরিচালক মায়াঙ্ক অরোরা ঢাকা ট্রিবিউনকে বলেন, “আমরা এনবিআরের রাজস্ব কৌশল ২০৩২ এর সত্যিই প্রশংসা করি। এটির সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে আমরা একটি ন্যায্য, সামঞ্জস্যপূর্ণ এবং ন্যায়সঙ্গত কর ব্যবস্থার অনুরোধ রাখছি।”
অন্যদিকে, নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক এনবিআরের এক কর্মকর্তা বলেন, “আগে আমরা আইএমএফের শর্ত পূরণের জন্য ২০২৪-২৫ অর্থবছরের জন্য প্রস্তাবিত বাজেটে অতিরিক্ত ভ্যাট সংগ্রহের জন্য চারটি চ্যানেলের মাধ্যমে রাজস্ব ব্যবস্থাসহ একটি নির্দিষ্ট পথ তৈরি করেছিলাম। এ তালিকায় কোমল পানীয় এবং তামাক ওপরের দিকে ছিল, কারণ সরকার তাদের আরও বেশি চাপ দেওয়ার পরিকল্পনা করেছে।”
আকিজ ফুড অ্যান্ড বেভারেজের সেলস অ্যান্ড বিপণন মহাব্যবস্থাপক রেজাউল করিম ঢাকা ট্রিবিউনকে বলেন, “চিনি আমদানির উচ্চমূল্য, লাগামহীন মূল্যস্ফীতি, উচ্চমূল্য ও জ্বালানির ঘাটতি এবং এলসি খুলতে না পারা যখন শিল্পের ক্ষেত্রে প্রতিবন্ধকতা হিসেবে কাজ করছে, তখন এক ধাক্কায় আট গুণেরও বেশি কর আরোপ হলে তা শিল্পে প্রবৃদ্ধির জন্য ভয়াবহ হবে।”
তিনি আরও বলেন, “ফলস্বরূপ আমাদের মতো প্রতিষ্ঠানগুলোর পক্ষে টিকে থাকা কঠিন হবে, যা কোমল পানীয়ের দাম এবং এ খাতে কর্মসংস্থানের ওপর প্রভাব ফেলবে। আমরা নিজেরা গতকাল একটি বৈঠক করেছি। শিগগিরই আমরা সরকারের নীতিনির্ধারণী পর্যায়ে আনুষ্ঠানিক প্রস্তাব জমা দেব।”
সবশেষে তিনি বলেন, “এ পরিপ্রেক্ষিতে পানীয় শিল্পের জন্য এনবিআর এবং কর কর্তৃপক্ষকে আমরা কর কাঠামো পুনর্বিবেচনার অনুরোধ জানাচ্ছি। পাশাপাশি ৫% টার্নওভার কর বাড়ানোর প্রস্তাবও বিবেচনা করা উচিত যেন সমৃদ্ধিশীল শিল্পকে সরকারের প্রবৃদ্ধির উচ্চাকাঙ্ক্ষার সঙ্গে ধাপে ধাপে শক্তিশালী হতে পারে।”