শুল্কমুক্ত আমদানি সুবিধার অপব্যবহার রোধের লক্ষ্যে তৈরি করা সফটওয়্যারের ব্যবহার নিয়ে বেসরকারি কূটনৈতিক বন্ডেড ওয়্যারহাউস ও জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের (এনবিআর) মধ্যকার রেষারেষির কারণে বিদেশি মদের সরবরাহ কমে যাওয়ায় কেরু অ্যান্ড কোম্পানি (বাংলাদেশ) লিমিটেডের মদের চাহিদা বেড়েছে। আর এ বাড়তি চাহিদার কথা মাথায় রেখেই মদের উৎপাদন বাড়ানোর কথা ভাবছে দেশীয় ব্র্যান্ডটি।
শনিবার (২৫ ডিসেম্বর) দর্শনা চিনিকলে আখ মাড়াই কার্যক্রমের উদ্বোধনকালে শিল্পমন্ত্রীর উপস্থিতিতে বাণিজ্যমন্ত্রী টিপু মুনশি ঘোষণা দেন, কেরু অ্যান্ড কোংয়ের উৎপাদন ক্ষমতা বাড়াতে দর্শনার বর্তমান স্থানে দ্বিতীয় একটি ইউনিট হবে। কারণ মদের পাশাপাশি ভিনেগার, হ্যান্ড স্যানিটাইজার ও জৈব দ্রাবকের মতো অন্যান্য পণ্যেরও চাহিদা রয়েছে।
এক প্রতিবেদনে এ কথা জানায় ইংরেজি দৈনিক দ্য বিজনেস স্ট্যান্ডার্ড।
কেরু কর্মকর্তারা জানান, গত বছরের একই সময়ের তুলনায় এ বছরের অক্টোবর-ডিসেম্বরে প্রতিষ্ঠানটির উৎপাদিত মদের বিক্রি ৫০% এরও বেশি বেড়েছে। মাড়াই করা আখ থেকে উপজাত হিসেবে অ্যালকোহল উৎপাদন করা কেরু অ্যান্ড কোং তাদের নিজস্ব ওয়্যারহাউস ও বিক্রয়কেন্দ্র থেকে চাহিদা অনুযায়ী মদ উৎপাদন করে থাকে। ক্রমবর্ধমান চাহিদা মেটাতে রাষ্ট্রায়ত্ত প্রতিষ্ঠানটি তাদের দুটি ডিস্টিলারি প্ল্যান্টে উৎপাদন বাড়িয়েছে।
কেরু অ্যান্ড কোং আগে তাদের বিদ্যমান উৎপাদন ক্ষমতার মাত্র ৫০% ব্যবহার করতো এবং প্রতি মাসে ১২ হাজার থেকে ১৪ হাজার কেস মদ উৎপাদন করত। এ মাসে প্রতিষ্ঠানটি ২০ হাজার কেসের বেশি মদ উৎপাদন করেছে।
দেশের দুই পর্যটনকেন্দ্র কক্সবাজার ও কুয়াকাটায় দুটি নতুন বিক্রয়কেন্দ্র স্থাপন করছে প্রতিষ্ঠানটি। ফলে আগে প্রতি মাসে সাধারণত কেরু অ্যান্ড কোংয়ের মদ প্রায় সাড়ে ১২ হাজার থেকে ১৩ হাজার কেস বিক্রি হলেও এ বছরের অক্টোবরে এ সংখ্যা ১৮ হাজার ৫৭৯ কেস এবং নভেম্বরে ১৯ হাজার ৪৪৬ কেসে দাঁড়িয়েছে।
কেরু অ্যান্ড কোংয়ের ব্যবস্থাপনা পরিচালক মোহাম্মদ মোশারফ হোসেন জানান, এ মাসে বিক্রির পরিমাণ ২০ হাজার কেস ছাড়িয়ে যাবে বলে আশা করছে প্রতিষ্ঠানটি। কেননা তার সারা দেশে ১৩টি ওয়্যারহাউস ও তিনটি বিক্রয়কেন্দ্র থেকে বাড়তি অর্ডার পেয়েছে।
প্রতিষ্ঠানটি ২০২০-২১ অর্থবছরে কেরু শুধুমাত্র মদ থেকেই ১৯৫ কোটি টাকা আয় করেছে। গত কয়েক বছর ধরে মদের বিক্রি উল্লেখযোগ্য হারে বাড়ার ফলে প্রতিষ্ঠার পর প্রথমবারের মতো লাভের মুখ দেখেছে কেরু অ্যান্ড কোং। এখন কেরুর মদের চাহিদা আরও বেড়ে যাওয়ায় ভবিষ্যতে আরও লাভের আশা করছে তারা।
বার ম্যানেজাররা জানান, এ বছরের ২ জুলাই থেকে এনবিআর সফটওয়্যার ব্যবহার বাধ্যতামূলক করার পর দেশের বিদ্যমান ছয় ব্যক্তিগত কূটনৈতিক বন্ডেড ওয়্যারহাউসগুলো ধর্মঘট ডাকে। এর জেরে মদের সংকট দেখা দিলে সাম্প্রতিক সময়ে কেরুর মদের বিক্রি বেড়েছে।
কেরুর যেসব ব্র্যান্ডের বিদেশি মদ রয়েছে, সেগুলো হলো—ইয়েলো লেভেল মল্টেড হুইস্কি, গোল্ড রিবন জিন, ফাইন ব্র্যান্ডি, শেরি ব্র্যান্ডি, ইম্পেরিয়াল হুইস্কি, সারিনা ভদকা, রোসা রাম ও ওল্ড রাম। ১৮০ মিলিলিটার, ৩৬৫ মিলিলিটার ও ৭৫০ মিলিলিটার বোতলে মদ বাজারজাত করে প্রতিষ্ঠানটি। প্রতিষ্ঠানটির কর্মকর্তাদের তথ্যানুযায়ী, একটি কেসে ৭৫০ মিলিলিটারের ১২টি, ৪৬৫ মিলিলিটারের ২৪টি এবং ১৮০ মিলিলিটারের মদের ৪৮টি বোতল থাকে।
ঢাকা, চট্টগ্রাম ও চুয়াডাঙ্গা জেলার দর্শনায় কেরু অ্যান্ড কোম্পানির তিনটি বিক্রয়কেন্দ্র রয়েছে। কক্সবাজার ও পটুয়াখালী জেলার কুয়াকাটায় আরও দুটি বিক্রয়কেন্দ্র স্থাপন করছে তারা। এছাড়া, সম্প্রতি ঢাকা ও শ্রীমঙ্গলের ওয়্যারহাউসগুলোতে কেরু অ্যান্ড কোম্পানির মদের চাহিদা সবচেয়ে বেশি বাড়ায় প্রতিষ্ঠানটি আরও তিনটি ওয়্যারহাউস স্থাপন করতে আগ্রহী।
সূত্রের তথ্যানুসারে, প্রতিষ্ঠানটি ম্যানুয়াল সিস্টেম ব্যবহার না করে অটোমেশনের মাধ্যমে মদের উৎপাদন বাড়ানোর পরিকল্পনা করেছে। প্রক্রিয়াধীন প্রকল্পটি একবার বাস্তবায়িত হলে উৎপাদন ক্ষমতা দ্বিগুণ হবে বলে আশা করছেন কর্মকর্তারা।
কেরুর ব্যবস্থাপনা পরিচালক মোশারফ হোসেন জানান, নতুন মার্কেটিং পরিকল্পনার আওতায় ম্যানেজমেন্ট তিনটি ওয়্যারহাউস ও দুটি বিক্রয়কেন্দ্র স্থাপনের সিদ্ধান্ত নিয়েছে। এ বিষয়ে মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তরের কাছে অনুমতি চেয়েছে প্রতিষ্ঠানটি।
তিনি আরও জানান, মাদকদ্রব্য অধিদপ্তর দুটি বিক্রয়কেন্দ্রের অনুমোদন দিয়েছে। এখন বিক্রয়কেন্দ্রগুলো পেতে কোম্পানিটি পর্যটন কর্পোরেশনের সঙ্গে একটি সমঝোতা স্মারক (এমওইউ) স্বাক্ষর করবে।