দুই দশকেরও বেশি সময় ধরে এআইজিতে কাজ করেছেন যুক্তরাষ্ট্রের হিউস্টন শহরের কার্লিন পুটম্যান। এ বছরের শুরুতে চাকরি হারিয়ে ভেঙে পড়েন তিনি। ২০২৩ সালের আগেই প্রতিষ্ঠান বিমা খাতের জায়ান্ট প্রতিষ্ঠান এআইজি ব্যয় সংকোচন নীতি গ্রহণ করে বলে নোটিশ দিয়ে দেয়।
পুটম্যান আল জাজিরাকে বলেন, “কাজ যতই করেছি। তবে চিন্তা করেছি। এরপর ঘোষণা এলো।”
সম্পত্তি ও দুর্ঘটনা বিমা খাত প্রতিষ্ঠান এআইজির সর্বোচ্চ বেতনপ্রাপ্ত সিইও ছিলেন পিটার জাফিনো। ২০২২ সালে তিনি ৭৫ মিলিয়ন ডলারের বেশি আয় করেছেন, যার বেশিরভাগই এসেছে স্টক অনুদান থেকে।
গবেষণা সংস্থা ইকুইলার বলছে, মার্কিন কর্পোরেট জগতের তৃতীয়-সর্বোচ্চ বেতন পাওয়া ব্যক্তি জাফিনো।
এআইজি কর্মী ছাঁটাইয়ের সময় বেতন কাটা নিয়ে কোনো স্পষ্ট বক্তব্য দেয়নি। সম্প্রতি আল জাজিরা তাদের কাছে মন্তব্য চাইলেও তারা জবাব দেয়নি। প্রতিষ্ঠানটির নীতির বিষয়ে এখনও কোনো স্পষ্ট বক্তব্য পাওয়া যায়নি। তাদের বার্ষিক সভায় পুরো বছরের নির্বাহী ক্ষতিপূরণ অন্তর্ভুক্ত থাকে।
প্রতিষ্ঠানটির এমন বৈঠক ছিল এ বছরের মার্চে। বেশিরভাগ প্রতিষ্ঠানের মতো ২০২৪ সালের শুরুতে তারা তথ্য জানাবে।
এআইজি মন্তব্য না করলেও বেশ কিছু প্রতিষ্ঠান তাদের নির্বাহী ক্ষতিপূরণের কথা জানানোর আশ্বাস দিয়েছে। টি-মোবাইল এপ্রিল মাসে সিইও মাইক সিভার্টের ক্ষতিপূরণ প্যাকেজের সুনির্দিষ্ট বিবরণ প্রকাশ করবে। যেমন ফাইজার, মরগান স্ট্যানলি, ফোর্ড, গোড্যাডির হিসেব জানানো হয়েছে।
রেকর্ড চাকরি বৃদ্ধির মধ্যে উচ্চ ছাঁটাই
জানুয়ারি মাসে, সেলসফোর্স প্রায় ১০% কর্মী ছাঁটাই করেছে। সিইও মার্ক বেনিওফ অর্থনৈতিক অবস্থাকে দায়ী করেছেন।
মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে চাকরি যেমন রেকর্ড বেড়েছে, পাল্লা দিয়ে বেড়েছে ছাঁটাই। ২০২২ সালে, মার্কিন অর্থনীতি ৪৫ লাখ নতুন চাকরির সুযোগ সৃষ্টি করেছে, যা গত ৪০ বছরের মধ্যে দ্বিতীয় সর্বোচ্চ। এছাড়া ২০২৩ সালের ডিসেম্বর ছাড়া বাকি সময়ে ২৫ লাখেরও বেশি চাকরি দেওয়া হয়েছে।
২০২২ সালের জুনে যুক্তরাষ্ট্রের সর্বোচ্চ মূল্যস্ফীতি ৬০% ছিল বলে জানায় হোয়াইট হাউস।
সেলসফোর্স প্রথম ত্রৈমাসিকে ৮.২ বিলিয়ন রাজস্ব প্রতিবেদন প্রকাশ করেছে।
সারাহ ইনস্টিটিউট ফর পলিসি স্টাডিজের গ্লোবাল ইকোনমি প্রজেক্টের পরিচালক অ্যান্ডারসন আল জাজিরাকে বলেন, ছাঁটাইয়ের জন্য সিইওরা পুরস্কৃত হন। ওয়াল স্ট্রিট এটিকে একটি নিদর্শন হিসেবে দেখে।
তাদের মতে, ছাঁটাইয়ের পরে শেয়ারের দামে বড় পরিবর্তন আসে।
তিনি বলেন, এমন পরিস্থিতিতে শেয়ারের দাম বাড়লে শেয়ারহোল্ডাররা খুশি হয়।
সেলসফোর্স সিইও মার্ক বেনিওফ কর্মীদের কাছে এক চিঠিতে বলেন, অতিরিক্ত কর্মী নিয়োগের কারণে আমরা অর্থনৈতিক মন্দার মুখোমুখি হয়েছি।
ইকুইলার তথ্য বলছে, মার্ক বেনিওফ ব্যবসার সংবাদ টিভিতে তার উপার্জনের প্রতিবেদনটি তুলে ধরেছেন। ২০২২ সালে বেনিওফের বেতন ৪% বৃদ্ধির পর তিনি ছাটাইয়ের ঘোষণা দেন। তবে বিষয়টি নিয়ে কোনো প্রশ্ন ওঠেনি।
সাম্প্রতিক ছাঁটাইয়ের পর আবার ৩,০০০ এর বেশি নিয়োগ দিয়েছে সেলসফোর্স। যদিও বেনিওফ বেতন কমানোর কোনো প্রতিশ্রুতি দেননি। সেলসফোর্স মন্তব্যের জন্য আল জাজিরার অনুরোধে সাড়া দেয়নি।
প্রযুক্তি শিল্পের ছাঁটাইয়ের তালিকা রাখা লেঅফ ডট ফ্লাই বলছে, গত দুই বছরে মার্কিন অর্থনীতি চাঙ্গা থাকার পরেও এই খাতে ২ লাখ ৬০ হাজার কর্মী ছাঁটাইয়ের শিকার হয়েছেন।
চ্যালেঞ্জার, গ্রে ও ক্রিসমাসের প্রতিবেদন অনুসারে, ২০২৩ সালে মিডিয়া শিল্পে প্রায় ২০,০০০ ছাঁটাই হয়েছে। একই অবস্থা অন্য খাতেও। যেমন খুচরা খাত ৭৮,০০০ চাকরি কমিয়েছে। আর স্বাস্থ্যসেবা শিল্প প্রায় ৫৭,০০০ কমিয়েছে।
বেতন কাটা সবসময় ভালো সিদ্ধান্ত নয়
বিভিন্ন শিল্পের অন্তত ৯০টিরও বেশি প্রতিষ্ঠানের তথ্য যাচাই করে দেখা যায়, বহু প্রতিষ্ঠান তাদের কর্মীদের বেতন কমিয়েছে।
বেশ কিছু প্রতিষ্ঠান জানায়, তাদের প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা বেতন কমাবেন।
এ বছরের ফেব্রুয়ারিতে টুইলিও জানায়, তাদের সিইও জেফ লসনের ৫০% বেতন কমানো হবে। মাইক্রন টেক জানায়, তাদের সিইও ২০% বেতন কমাবেন। গোল্ডম্যান শ্যাক্সের ডেভিড সলোমন ঘোষণা করেন, তিনিও বেতন কমাবেন।
অ্যালফাবেট-এর সুন্দর পিচাই বলেন, “তিনি এ বছর বোনাস নেবেন না।”
তবে এই ঘোষণা আসলে কতটা কাজের তা নিয়ে প্রশ্ন রয়েছে। ২০২২ সালের জন্য বড় ক্ষতিপূরণ ঘোষণার পর পিচাইয়ের ঘোষণাটি আসে। ইকুইলারের তথ্য অনুসারে, এটি আগের বছরের তুলনায় ৩,৪৭৪% বৃদ্ধি পেয়েছিল।
সবচেয়ে উল্লেখযোগ্য ছাটাই হয়েছিল জুম কমিউনিকেশনে। প্রতিষ্ঠানের সিইও এরিক ইউয়ান এই বছরের শুরুর দিকে খবরের পাতায় উঠে আসেন। তিনি জানান, কনফারেন্সিং জায়ান্টে ছাঁটাইয়ের মধ্যে তিনি নিজের ৯৮% বেতন কমাবেন। কোভিড-১৯ মহামারীর সময় এই প্রতিষ্ঠানের জনপ্রিয়তা বেড়েছিল। তখন তিনি অতিরিক্ত নিয়োগ দেন।
প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তাদের বেতন কমানো সবসময় সহজ নয়। এটি প্রতিষ্ঠানকে দুর্বল দেখায়। ফলে এর প্রভাব পড়ে স্টক মূল্যেও।
তবে বেতন কমানো বা বৃদ্ধি করার বিষয় সব সময় একই রকম থাকে না।
টেক জায়ান্ট ইন্টেল জানায়, তাদের সিইও ও এনইওদের মূল বেতন ২৫-১৫% কমানো হবে। ২০২৩ সালে টার্গেট বোনাসের সঙ্গে মিলিয়ে নেওয়া এই সিদ্ধান্তের কারণে তাদের আগের বেতনের সঙ্গে নতুন নির্ধারিত বেতনের খুব একটা হেরফের হবে না।
নিউ মেক্সিকো স্টেট ইউনিভার্সিটির অর্থ বিভাগের অধ্যাপক হরিকুমার শঙ্করান আল জাজিরাকে বলেন, “সিইওরা যেখানে কাটছাঁট করছে তা আমাদের বুঝতে হবে। যদি তারা বেতনে কাটছাঁট করে, তবে এটি সত্যিই সবচেয়ে তাৎপর্যপূর্ণ।”
“ইন্টেলের ক্ষেত্রে, টেক জায়ান্টটি তাদের সিইও প্যাট গেলসিঞ্জারের নগদ বোনাস কেটেছে। আবার সিলিকন ভ্যালি-ভিত্তিক টেক জায়ান্টটি তাদের নির্বাহীর ক্ষতিপূরণ প্যাকেজে ঠিকই তার আয়ের সুযোগ বাড়িয়ে দিয়েছে।”
অ্যান্ডারসন বলেন, “অনেক এক্সিকিউটিভ খুব ধুমধাম করে ঘোষণা করেন, তারা বেতন নিচ্ছেন না। তারপরে যখন আমরা মোট ক্ষতিপূরণের দিকে তাকালাম, তখন এটি আগের বছরের মতোই বড় ছিল।”
তিনি বলেন, “বেতন কমানোর প্রভাব যদি মোট আয়ে কোনো ভূমিকা না রাখে, তবে এটি একেবারেই অনর্থক।”
প্রতিষ্ঠানের সাম্প্রতিক তথ্য বলছে, তাদের সিইও ক্ষতিপূরণ বাবদ ১১.৬ মিলিয়ন ডলার পেয়েছেন। যার ৮.৮ মিলিয়ন ডলার ছিল স্টক পুরস্কার।
একদিকে অর্থের অভাবে কর্মীরা চাকরি হারাচ্ছেন, অন্যদিকে সিইওরা নিজেদের জন্য মোটা অংকের ক্ষতিপূরণ নিচ্ছেন। এটি কর্মীদের জন্য প্রতিষ্ঠানের দ্বিমুখী অবস্থানকেই তুলে ধরে।