চলতি ২০২৪-২৫ অর্থবছরের তৃতীয় মাস সেপ্টেম্বরেও মানুষ সঞ্চয়পত্র ভাঙার চেয়ে কিনেছে বেশি। এর আগে ২০২৩-২৪ অর্থবছরের বেশির ভাগ সময়েই নেতিবাচক ধারায় ছিল সঞ্চয়পত্র বিক্রি। গত জুলাই থেকে ইতিবাচক ধারায় ফিরে আসা জাতীয় সঞ্চয়পত্রের বিক্রি অব্যাহত আছে। বাংলাদেশ ব্যাংকের সর্বশেষ হালনাগাদ প্রতিবেদন থেকে এসব তথ্য জানা গেছে।
খাতসংশ্লিষ্টরা বলছেন, মানুষ এখন ব্যাংকের চেয়ে সঞ্চয়পত্রকে বেশি নিরাপদ মনে করছে। কিছু ব্যাংক গ্রাহকের আমানতের টাকা ফেরত দিতে না পারায় ব্যাংকের ওপর মানুষের আস্থা কমেছে। এ জন্য মানুষ টাকা ব্যাংকে না রেখে সঞ্চয়পত্র কিনছে।
নিম্ন মধ্যবিত্ত, সীমিত আয়ের মানুষ, নারী, প্রতিবন্ধী ও অবসরপ্রাপ্ত কর্মকর্তা-কর্মচারীদের জন্য সঞ্চয়পত্রের বিভিন্ন প্রকল্প চালু রয়েছে। সামাজিক সুরক্ষার কথা বিবেচনায় নিয়ে সঞ্চয়পত্রে তুলনামূলক বেশি মুনাফা দেয় সরকার।
বর্তমানে পেনশনার সঞ্চয়পত্রে সুদের হার ১১.৭৬%। এ ছাড়া পারিবারিক সঞ্চয়পত্রে সুদের হার ১১.৫২%, ৫ বছর মেয়াদি বাংলাদেশ সঞ্চয়পত্রে সুদ ১১.২৮% ও তিন মাস অন্তর মুনাফাভিত্তিক সঞ্চয়পত্রে সুদের হার ১১.০৪%।
অন্যদিকে বাজারের ওপর ছেড়ে দেওয়ার পর ব্যাংকে ঋণের সুদহারের পাশাপাশি আমানতের সুদহার বেশ বেড়েছে। বর্তমানে কোনো কোনো ব্যাংকে আমানতের সুদের হার ১২% ছাড়িয়েছে। তারপরও ব্যাংকখাতে আমানতের দেখা মিলছে কম।
চলতি অর্থবছরের সেপ্টেম্বর পর্যন্ত ব্যাংকখাতে আমানতের বার্ষিক প্রবৃদ্ধি হয়েছে ৭.২৬%। অথচ কয়েক মাস আগে এ খাতে আমানতের প্রবৃদ্ধি ১১% এর ওপর ছিল। গত বছর ডিসেম্বরে প্রবৃদ্ধি হয়েছিল ১১.০৪%।
সংশ্লিষ্টরা জানান, বিভিন্ন আর্থিক অনিয়মের কারণে আগে থেকেই ব্যাংকখাতের ওপর মানুষের আস্থার ঘাটতি তৈরি হয়েছিল। নতুন সরকার দায়িত্ব নেওয়ার পর এস আলমের নিয়ন্ত্রণাধীন থাকা অবস্থায় বিভিন্ন আর্থিক অনিয়মের সংকটে পড়া ব্যাংকগুলো পুনর্গঠন করার পর ওইসব ব্যাংক থেকে আমানত তোলার বাড়তি চাপ তৈরি হয়েছে। আবার সম্প্রতি শেয়ারবাজারে মন্দাভাব বিরাজ করছে। সব মিলিয়ে নিরাপদ বিনিয়োগের উৎস হিসেবে সঞ্চয়পত্রে আগ্রহ বাড়ছে মানুষের।
বাংলাদেশ ব্যাংকের প্রতিবেদন অনুযায়ী, চলতি ২০২৪-২৫ সালের তৃতীয় মাস সেপ্টেম্বরে সঞ্চয়পত্র বিক্রি ইতিবাচক ধারায় রয়েছে। এ মাসে আগের সুদ-আসল পরিশোধ করেও ৪,১০৯ কোটি টাকা ইতিবাচক রয়েছে। এ ছাড়া চলতি বছরের প্রথম তিন মাসে (জুলাই-সেপ্টেম্বর) আগের আসল-সুদ পরিশোধ করেও ৮,৩৩২ কোটি টাকা ইতিবাচক রয়েছে।
কেন্দ্রীয় ব্যাংকের তথ্য অনুযায়ী, গত অর্থবছরের তৃতীয় মাস সেপ্টেম্বরে সঞ্চয়পত্র বিক্রির ধারা ছিল নেতিবাচক। ওই সময়ে বিক্রির চেয়ে আগের সুদ-আসল বাবদ বেশি পরিশোধ করতে হয়েছিল প্রায় ১৪৮ কোটি টাকা। আর একই অর্থবছরের প্রথম তিন মাসে (জুলাই-সেপ্টেম্বর) বিক্রির চেয়ে আগের সুদ-আসল বাবদ বেশি পরিশোধ করতে হয়েছিল ১,২৬৪ কোটি টাকা।
তথ্য বলছে, আগের মাস আগস্টেও সঞ্চয়পত্র বিক্রি ইতিবাচক ধারায় ছিল। ওই মাসে আগের সুদ-আসল পরিশোধ করেও ২,০৩৬ কোটি টাকা ইতিবাচক ছিল। এমনকি চলতি অর্থবছরের প্রথম মাস জুলাইয়েও সঞ্চয়পত্র বিক্রি ছিল ইতিবাচক ধারায়। ওই মাসে আগের সুদ-আসল পরিশোধ করেও ২,১৮৭ কোটি ৫৬ লাখ টাকা ইতিবাচক ছিল। আর গত অর্থবছরের শেষ মাস জুনে সঞ্চয়পত্র নিট বিক্রি (ঋণাত্মক) ৩,৩৮১ কোটি ৪৩ লাখ টাকা। অর্থাৎ বিক্রির চেয়ে আগের সুদ-আসল বাবদ বেশি পরিশোধ করতে হয়েছে ৩,৩৮১ কোটি ৪৩ লাখ টাকা।
আর গত অর্থবছরের ১২ মাসে (জুলাই-জুন) সঞ্চয়পত্র নিট বিক্রি ঋণাত্মক ধারায় হয়েছে। অর্থাৎ ২০২৩-২৪ অর্থবছরের ১২ মাসে আগের আসল ও সুদ বাবদ ২১ হাজার ১২৪ কোটি ৩৮ লাখ টাকা বিক্রির চেয়ে বেশি পরিশোধ করতে হয়েছে। গত অর্থবছরের প্রথম দুই মাস (জুলাই-আগস্ট) সঞ্চয়পত্র বিক্রির ধারা ইতিবাচক ছিল। এরপর সেপ্টেম্বর থেকেই নেতিবাচক ধারায় চলে যায় সঞ্চয়পত্র বিক্রি, যেটা চলে অর্থবছরের শেষ মাস জুন পর্যন্ত।