৫৪ বছরের পথচলায় যেভাবে বদলে গেল বাংলাদেশের বাজেট

২০২৫-২৬ অর্থবছরের প্রস্তাবিত জাতীয় বাজেট অনুমোদন করেছে অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের উপদেষ্টা পরিষদ।

সোমবার (২ জুন) প্রধান উপদেষ্টা অধ্যাপক ড. মুহাম্মদ ইউনূসের সভাপতিত্বে উপদেষ্টা পরিষদে এ অনুমোদন দেওয়া হয়।

এবার ছাত্র-জনতার গণঅভ্যুত্থানে রাজনৈতিক পটপরিবর্তনে জাতীয় সংসদ না থাকায় বিটিভিতে বাজেট ঘোষণা করবেন অর্থ উপদেষ্টা। বিকেল ৩টায় অর্থ উপদেষ্টা ড. সালেহউদ্দিন আহমেদ জাতির উদ্দেশে বাজেট পেশ করবেন।

এবারের বাজেটের আকার সাত লাখ ৮৯ হাজার ৯৯৯ কোটি টাকা। গতবছর আওয়ামী লীগ সরকারের সবশেষ ২০২৪-২৫ অর্থবছরের বাজেট থেকে এবার সাত হাজার কোটি টাকা কম ধরা হয়েছে।

২০২৫-২৬ সালে প্রস্তাবিত বাজেটটি দেশের ৫৪তম বাজেট এটি। দেশের বিগত ৫৩টি বাজেটের সারসংক্ষেপ, পরিসর দেখে নেওয়া যাক-

যুদ্ধবিধ্বস্ত দেশ পুনর্গঠনে তাজউদ্দীনের তিন বাজেট: সমাজতান্ত্রিক সমাজের ভিত্তি

দেশের বাজেটের ইতিহাস থেকে জানা যায়, যুদ্ধচলাকালীন একটি সংক্ষিপ্ত পরিসরের বাজেট ঘোষণা করেছিলেন তাজউদ্দীন আহমদ। স্বাধীনতা যুদ্ধের জন্য দরকারি, অপরিহার্য ব্যয় মেটানোর জন্য এই বাজেট পেশ করা হয়।

বাংলাদেশ আনুষ্ঠানিকভাবে স্বাধীনতা লাভের পর তিনটি বাজেট পেশ করেন তাজউদ্দীন আহমদ। তার এই তিন বাজেটের প্রধান দর্শন ছিল- অর্থনৈতিক পুনরুদ্ধার, পুনর্গঠন ও সমাজতান্ত্রিক সমাজের ভিত্তি স্থাপনের জন্য। ১৯৭২-৭৩ অর্থ বছরে তিনি ৭৮৬ কোটি টাকার, ১৯৭৩-৭৪ অর্থ বছরে ৯৯৫ কোটি টাকার এবং ১৯৭৪-৭৫ সালে এক হাজার ৮৪ কোটি টাকার বাজেট পেশ করেন।

১৯৭৩-৭৪ অর্থবছরের বাজেট বক্তৃতায় বৈদেশিক নির্ভরশীলতা ঘুচিয়ে অভ্যন্তরীণ সম্পদের সদ্ব্যবহার করার মতো প্রকল্প ও নীতি গ্রহণের কথা বলেছিলেন অর্থমন্ত্রী। তাজউদ্দীন আহমদ একইসঙ্গে রপ্তানি বৃদ্ধি এবং আমদানি বিকল্পের বিকাশ সাধনের কথা বলেছিলেন।

এ আর মল্লিকের একমাত্র বাজেটে বাড়ানো হয় বেসরকারি পুঁজি বিনিয়োগের সীমা

দেশের ক্রান্তিকালের এই বাজেটে উন্নয়ন কার্যক্রমে জোর দেওয়া হয়। ১৯৭৫-৭৬ অর্থবছরে এক হাজার ৫৪৯ কোটি টাকার বাজেট পেশ করেন এ আর মল্লিক। এই বাজেটে বেসরকারি পুঁজি বিনিয়োগের ঊর্ধ্বসীমা ২৫ লাখ টাকা থেকে বাড়িয়ে ৩ কোটি টাকায় উন্নীত করার ঘোষণা হয়।

জিয়াউর রহমানের তিন বাজেট:  আয়কর সীমাবৃদ্ধি, কালোটাকা সাদা করার সুযোগ ও নতুন বেতন স্কেল কার্যকর

সামরিক শাসক ও রাষ্ট্রপতির দায়িত্বে থাকাকালে একই সঙ্গে অর্থ মন্ত্রণালয়ের দায়িত্বও পালন করেন জিয়াউর রহমান। তার অধীনে তিনটি বাজেট পেশ করা হয়। ১৯৭৬-৭৭ অর্থবছরে ১,৯৮৯ কোটি টাকার, ১৯৭৭-৭৮ অর্থবছরে ২,১৮৪ কোটি টাকার এবং ১৯৭৮-৭৯ অর্থবছরে ২,৪৯৯ কোটি টাকার বাজেট পেশ করেন তিনি। তার প্রথম বাজেটে ব্যক্তিশ্রেণির করদাতার ন্যূনতম আয়করের সীমা ৮,৪০০ টাকা থেকে বাড়িয়ে ১০,০০০ টাকা করা হয়। তার দ্বিতীয় বাজেটে কোনো জরিমানা ছাড়াই কালোটাকা সাদা করার সুযোগ দেওয়া হয়; এবং তৃতীয় বাজেটে নতুন বেতন স্কেল কার্যকর করার কথা জানানো হয়।

মীর্জা নুরুল হুদার একমাত্র বাজেটে ‘প্রত্যক্ষ কর' এ গুরুত্ব

১৯৭৯-৮০ অর্থবছরে ৩৩১৭ কোটি টাকার বাজেট পেশ করেন মীর্জা নুরুল হুদা। তার বাজেটটির মাধ্যমে তিন বছর পর সংসদে উপস্থাপন করা হয় বাজেট। এই বাজেটে কর তদন্ত কমিশনের চূড়ান্ত রিপোর্ট অনুযায়ী বাজেটের মাধ্যমেই তা কার্যকর করার প্রস্তাব করা হয়। গুরুত্ব দেওয়া হয় প্রত্যক্ষ করকে।

এম সাইফুর রহমানের প্রথম দুই বাজেট: বাধ্যতামূলক রিটার্ন দাখিল, আমদানির উন্নয়ন সারচার্জ

দেশের ইতিহাসে সর্বোচ্চবার বাজেট পেশ করেছেন এম সাইফুর রহমান। তার প্রথম দুটি বাজেটে রিটার্ন দাখিল বাধ্যতামূলক করা হয়। যাদের আয় ২০ হাজার টাকার বেশি তাদেরকে সময়মতো রিটার্ন দাখিল করার কথা বলা হয় অন্যথায় জরিমানার বিধান করা হয়। সাইফুর রহমানের দ্বিতীয় বাজেটে কম্পিউটারের ওপর শুল্ক ১০০% থেকে কমিয়ে ৫০% ও সব আমদানির ওপর ১% হারে উন্নয়ন সারচার্জ বসানো হয়। তিনি ১৯৮০-৮১ অর্থবছরে চার হাজার ১০৮ কোটি টাকার এবং ১৯৮১-৮২ সালে চার হাজার ৬৭৭ কোটি টাকার বাজেট পেশ করেন।

জেনারেল এরশাদের সময়ে আবুল মাল আবদুল মুহিতের প্রথম দুই বাজেট

প্রধান সামরিক আইন প্রশাসক জেনারেল এইচ এম এরশাদের সচিবালয়ে প্রথম বাজেট পেশ করেন আবুল মাল আবদুল মুহিত। এই বাজেটে করমুক্ত আয়ের সীমা ১৫ হাজার টাকা থেকে বাড়িয়ে ২০ হাজার টাকা করা হয়। একইসঙ্গে সরকারি কর্মচারী-কর্মকর্তাদের জন্য মহার্ঘ ভাতার ঘোষণা দেওয়া হয়। ১৯৮২-৮৩ অর্থবছরে তিনি চার হাজার ৭৩৮ কোটি টাকার এবং ১৯৮৩-৮৪ অর্থবছরে পাঁচ হাজার ৮৯৬ কোটি টাকার বাজেট পেশ করেন। মহিতের দ্বিতীয় বাজেটের সময় প্রথমবারের মতো শুল্কায়নের জন্য আমদানি পণ্যকে তিন ভাগে ভাগ করা হয়েছিল। যেমন কাঁচামাল, শিল্পের রসদ হিসেবে ব্যবহৃত প্রক্রিয়াজাত সামগ্রী ও প্রস্তুত পণ্য।

সাইদুজ্জামানের ৪ বাজেট: নতুন আয়কর আইন, শিল্প স্থাপনে করছাড়, জ্বালানির দাম কমানো ও ২০% কর দিয়ে কালোটাকা সাদা করা

এম সাইদুজ্জামানের সময়ে বিনিয়োগ বাড়াতে নতুন শিল্পপ্রতিষ্ঠান স্থাপনে কর ছাড়ের ঘোষণা করা হয়; নতুন আয়কর আইন করার ঘোষণাও দেওয়া হয়। একইসঙ্গে দ্বিতীয়বারের মতো কালোটাকা সাদা করার সুযোগ দেওয়া হয়। তবে এক্ষেত্রে ২০% কর দেওয়ার কথা বলা হয়। এম সাইদুজ্জামান ১৯৮৪-৮৫ অর্থবছরে ৬ হাজার ৬৯৯ কোটি টাকার, ১৯৮৫-৮৬ অর্থবছরে সাত হাজার ১৩৮ কোটি টাকার এবং ১৯৮৬-৮৭ অর্থবছরে ৮ হাজার ৫০৪ কোটি টাকার বাজেট পেশ করেন।

জেনারেল মুনিম ও ওয়াহিদুল হকের বাজেট

ব্যাংক ব্যবস্থাপনা, ঋণ ব্যবস্থাপনা ও সরকারি কর্মকর্তাদের প্রথমবারের মতো আয়করের আওতায় আনা হয় এই সময়ে। মেজর জেনারেল মুনিম দুটি ও ওয়াহিদুল হক একটি বাজেট পেশ করেন। মুনিম ১৯৮৮-৮৯ অর্থবছরে ১০ হাজার ৫৬৫ কোটি টাকার এবং ১৯৯০-৯১ অর্থবছরে ১২ হাজার ৯৬০ কোটি টাকার বাজেট পেশ করেন। অন্যদিকে ওয়াহিদুল হক ১৯৮৯-৯০ অর্থবছরে ১২ হাজার ৭০৩ কোটি টাকার বাজেট পেশ করেন। জাতীয়ভিত্তিক ন্যাশনাল ট্যাক্স পেয়ারস নম্বর বণ্টন শুরু হয় মেজর মুনিমের সময়ে।

সাইফুর রহমানের আরও ৫টি বাজেট: ভ্যাট, উদার বাণিজ্যনীতি, টেকসই অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির ভিত্তি

দ্বিতীয়বারের মতো অর্থ মন্ত্রণালয়ের দায়িত্বে আসেন এম সাইফুর রহমান। এই সময়ে পাঁচ বছরে তিনি আরও পাঁচটি বাজেট পেশ করেন। এই পাঁচ বছরে প্রথম বারের মতো ভ্যাট (মূল্য সংযোজন কর), উদার বাণিজ্যনীতি ও টেকসই অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির দিকে মনোযোগ দেওয়া হয়। নমনীয় বিনিময় হার নীতি গ্রহণ করা হয়। যমুনা সেতুর জন্য আরোপিত সব সারচার্জ ও লেভি তুলে নেওয়া হয়। ১৯৯১-৯২ অর্থবছরে এম সাইফুর রহমান ১৫ হাজার ৫৮৪ কোটি টাকার, ১৯৯২-৯৩ অর্থবছরে ১৭ হাজার ৬০৭ কোটি টাকার, ১৯৯৩-৯৪ অর্থবছরে ১৯ হাজার ৫০ কোটি টাকার,  ১৯৯৪-৯৫ সালে ২০ হাজার ৯৪৮ কোটি টাকার এবং ১৯৯৫-৯৬ অর্থবছরে ২৩ হাজার ১৭০ কোটি টাকার বাজেট পেশ করেন। তিনি অর্থ মন্ত্রণালয়ের দায়িত্বে থাকাকালে ১৯৯১ সালের ১ জুলাই থেকে মূল্য সংযোজন করব্যবস্থা প্রবর্তিত হবে।

শাহ এ এম এস কিবরিয়ার ৬টি বাজেট: ৭% প্রবৃদ্ধি, দারিদ্র্য বিমোচন, সামাজিক নিরাপত্তা কর্মসূচি, শিল্পখাত-শেয়ারবাজারে কালোটাকার বিনিয়োগ

শাহ এ এম এস কিবরিয়া ৬টি বাজেট পেশ করেন। এই সময়ে প্রথমবারের মতো ৭% প্রবৃদ্ধি অর্জন করে বাংলাদেশ। একইসঙ্গে জাতীয় পর্যায়ে দারিদ্র্য দূরিকরণেল লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়। সামাজিক নিরাপত্তা কর্মসূচি ও বয়স্কভাতা চালু করা হয়। কালোটাকা সাদা করার সূবর্ণ সুযোগ তৈরি করা হয়। শেয়ারবাজার, শিল্পখাত ও বিলাসবহুল গাড়ি কিনতে কালোটাকা ব্যবহারের অনুমতি দেওয়া হয়। এস এম কিবরিয়া ১৯৯৬-৯৭ অর্থবছরে ২৪ হাজার ৬০৩ কোটি টাকার, ১৯৯৭-৯৮ অর্থবছরে ২৭ হাজার ৭৮৬ কোটি টাকার, ১৯৯৮-৯৯ অর্থবছরে ২৯ হাজার ৫৩৭ কোটি টাকার, ১৯৯৯-০০ অর্থবছরে ৩৪ হাজার ২৫২ কোটি টাকার, ২০০০-০১ অর্থবছরে ৩৮ হাজার ৫২৪ কোটি টাকার এবং ২০০১-০২ অর্থবছরে ৪২ হাজার ৩০৬ কোটি টাকার বাজেট পেশ করেন।

এম সাইফুর রহমানের তৃতীয় ইনিংস

সাইফুর রহমান তৃতীয়বারের মতো অর্থ মন্ত্রণালয়ের দায়িত্বে আসেন। ব্যাপক অর্থনৈতিক সংস্কারের ঘোষণা দেন। কালোটাকা সাদা করার বিষয়টি আবারও গুরুত্ব দেওয়া হয়। একইসঙ্গে নির্বাচনে প্রার্থী হলে বা সরকারি দরপত্রে অংশ নিলে রিটার্ন জমা বাধ্যতামূলক করা হয়। বাজেটে ভ্যাটের আওতা বাড়ানো হয়, করমুক্ত আয়ের সীমা বাড়িয়ে দেড় লাখ টাকা করা হয়। বাতিল করা হয় ৪% হারের অবকাঠামো উন্নয়ন সারচার্জ। তৃতীয়বার দায়িত্বে এসে সাইফুর রহমান আরও ৫টি বাজেট পেশ করেন। ২০০২-০৩ অর্থবছরে ৪৪ হাজার ৮৫৪ কোটি টাকার, ২০০৩-০৪ অর্থবছরে ৫১ হাজার ৯৮০ কোটি টাকার, ২০০৪-০৫ অর্থবছরে ৫৭ হাজার ২৪৮ কোটি টাকার, ২০০৫-০৬ অর্থবছরে ৬১ হাজার ৫৮ কোটি টাকার এবং ২০০৬-০৭ অর্থবছরে ৬৯ হাজার ৭৪০ কোটি টাকার বাজেট পেশ করেন তিনি।

এক-এগারোর সময়কালে দুই বাজেট

দেশের উদ্ভুত পরিস্থিতিতে ২০০৭ সালে তত্বাবধায়ক সরকারের আড়ালে ক্ষমতা গ্রহণ করে সামরিক বাহিনী। এই শাসকগোষ্ঠী প্রায় দুই বছর ক্ষমতায় থাকে। এ সময় দুটি বাজেট পেশ করা হয়। বাজেটে ভ্যাটের আওতা বাড়ানো হয়, করমুক্ত আয়ের সীমা বাড়িয়ে দেড় লাখ টাকা করা হয়। বাতিল করা হয় ৪% হারের অবকাঠামো উন্নয়ন সারচার্জ। স্থানীয় শিল্প সংরক্ষণে শুল্ককাঠামোয় পরিবর্তন আনা হয়, নতুন পদ্ধতির কর অবকাশসুবিধা দেওয়া হয়, কমানো হয় কর্পোরেট কর হার। ২০০৭-০৮ অর্থবছরে এ বি মির্জ্জা মো. আজিজুল ইসলাম ৯৯ হাজার ৯৬২ কোটি টাকার এবং পরবর্তী অর্থবছর ২০০৮-০৯-এও একই পরিমাণ বাজেট পেশ করেন।

মুহিতের দ্বিতীয় ইনিংসের ১০ বাজেট: ডিজিটাল বাংলাদেশের অর্থনীতি

২০০৮ সালে ক্ষতায় আসে বাংলাদেশ আওয়ামী লীগ। এ সময় ব্যাপক কাঠামোগত ও অবকাঠামোগত উন্নয়নের পরিকল্পনা গ্রহণ করা হয়। ডিজিটাল বাংলাদেশ বিনিমার্ণের দিকে এগোয় দেশ। ২০০৮ সালে আওয়ামী লীগ ক্ষমতা গ্রহণের পর ১০টি বাজেট পেশ করেন আবুল মাল আবদুল মুহিত। এ সময় পেশ করা বাজেটের প্রধান দর্শনগুলো তুলে ধরা হলো। 

১০% হারে কর দিয়ে অপ্রদর্শিত আয় বৈধ করার সুযোগ, সরকারি-বেসরকারি অংশীদারত্ব (পিপিপি), সঞ্চয়পত্রের সুদের ওপর কর বসানো, মোবাইল ফোনের বিলের ওপর ২% হারে সারচার্জ, করমুক্ত আয়ের সীমা ২ লাখ টাকা থেকে বৃদ্ধি করে ২ লাখ ২০ হাজার টাকায় উন্নীত, কর অবকাশ সুবিধা দুই বছর বৃদ্ধি, ৪৪ লাখ ২০ হাজার টাকার বেশি আয় থাকলে ৩০% আয়কর, ২৫ হাজার টাকার বেশি বাড়িভাড়া দিতে হবে ব্যাংকের মাধ্যমে। পোশাক খাতে ১% হারে উৎসে কর আরোপ, দুটি গাড়ি ও ৮ হাজার বর্গফুট আয়তনের গৃহ-সম্পত্তি থাকলে সারচার্জ প্রযোজ্য।

২০০৯-১০ অর্থবছরে আবুল মাল আবদুল মুহিত ১ লাখ ১৩ হাজার ৮১৫ কোটি টাকার, ২০১০-১১ অর্থবছরে ১ লাখ ৩২ হাজার ১৭০ কোটি টাকার, ২০১১-১২ অর্থবছরে ১ লাখ ৬১ হাজার ২১৪ কোটি টাকার, ২০১২-১৩ অর্থবছরে ১ লাখ ৯১ হাজার ৭৩৮ কোটি টাকার, ২০১৩-১৪ অর্থবছরে ২ লাখ ২২ হাজার ৪৯১ কোটি টাকার, ২০১৪-১৫ অর্থবছরে ২ লাখ ৫০ হাজার ৫৬০ কোটি টাকার, ২০১৫-১৬ অর্থবছরে ২ লাখ ৯৫ হাজার ১০০ কোটি টাকার, ২০১৬-১৭ অর্থবছরে ৩ লাখ ৪০ হাজার ৬০৫ কোটি টাকার, ২০১৭-১৮ অর্থবছরে ৪ লাখ ২৬৬ কোটি টাকার, ২০১৮-১৯ অর্থবছরে ৪ লাখ ৬৪ হাজার ৫৭৩ কোটি টাকার বাজেট পেশ করেন।

আ হ ম মুস্তফা কামালের ৫ বাজেট

অর্থমন্ত্রী আ হ ম মুস্তফা কামাল পাঁচটি বাজেট পেশ করেছেন আজ। এই সময়ে বিশ্বব্যাপী অর্থনৈতিক অস্থিরতা, যুদ্ধ, করোনাভাইরাস মহামারির ধকল সইতে হয়েছে। এই সময়ে অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি সমুন্নত রাখলেও বাংলাদেশের অর্থনীতিকে নানা চ্যালেঞ্জের মুখোমুখি হতে হয়।

দেশের অর্থনীতিকে মজবুত করতে মুস্তফা কামালের পেশ করা বাজেটে তরুণ উদ্যোক্তাদের প্রণোদনা, প্রবাসী আয়ে প্রণোদনা, জরুরি স্বাস্থ্যসেবাখাত, ন্যূনতম সারচার্জ প্রথার বিলোপ এবং কালোটাকা ও পাচার করা টাকা সাদা করতে অবারিত সুযোগ দেওয়া হয়।

২০২৩-২৪ অর্থবছরের বাজেট ছিল আ হ ম মুস্তফা কামালের সর্বশেষ বাজেট। ২০২৩ সালের ৬ জুন ২০২৩-২৪ অর্থবছরের জন্য ৭ লাখ ৬১ হাজার ৭৮৫ কোটি টাকার বাজেট পাস হয়। তৎকালীন অর্থমন্ত্রী আ হ ম মুস্তফা কামাল এই বাজেটের নাম দিয়েছিলেন “উন্নয়নের অভিযাত্রায় দেড় দশক পেরিয়ে স্মার্ট বাংলাদেশের অগ্রযাত্রা”।

বাজেটে মোট দেশজ উৎপাদন (জিডিপি) প্রবৃদ্ধির লক্ষ্যমাত্রা ৭.৫% নির্ধারণ করা হয়। আর মূল্যস্ফীতি ধরা হয়ে ৬%।

আ হ ম মুস্তফা কামাল ২০২৩ সালে ১ জুন সংসদে এ বাজেট উপস্থাপন করেন। এরপর অধিবেশনজুড়ে প্রস্তাবিত বাজেটের ওপর আলোচনা করেন সংসদ সদস্যরা। বিরোধী দলের সদস্যরা নতুন বাজেটের বিভিন্ন দিক নিয়ে সমালোচনা করেন।

২০২৩-২৪ অর্থবছরের বাজেটে পরিচালনসহ অন্যান্য খাতে ব্যয় ধরা হয়েছিল ৪ লাখ ৩৬ হাজার ২৪৭ কোটি টাকা। বার্ষিক উন্নয়ন কর্মসূচিতে বরাদ্দ দেওয়া হয়ে ২ লাখ ৬৩ হাজার কোটি টাকা।

বাজেটে মোট রাজস্ব আয় ধরা হয় ৫ লাখ কোটি টাকা। এর মধ্যে জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের (এনবিআর) মাধ্যমে আয় ধরা হয় ৪ লাখ ৩০ হাজার কোটি টাকা এবং অন্যান্য সূত্র থেকে কর রাজস্ব ধরা হয় ৭০ হাজার কোটি টাকা। আরও লক্ষ্যমাত্রা ছিল এনবিআর বহির্ভূত ২০ হাজার কোটি টাকা ও কর ব্যতীত প্রাপ্তি ৫০ হাজার কোটি টাকা।

বাজেটঘাটতি ২ লাখ ৬১ হাজার ৭৮৫ কোটি টাকা দেখানো হয়, যা জিডিপির ৫.২%। ঘাটতি অর্থায়নে বৈদেশিক ঋণ থেকে ১ লাখ ৬ হাজার ৩৯০ কোটি ও অভ্যন্তরীণ উৎস থেকে ১ লাখ ৫৫ হাজার ৩৯৫ কোটি টাকা আহরণ করার কথা বলা হয়।

অভ্যন্তরীণ উৎসের মধ্যে ব্যাংক ব্যবস্থা থেকে ১ লাখ ৩২ হাজার ৩৯৫ কোটি টাকা, সঞ্চয়পত্র থেকে ১৮ হাজার কোটি টাকা, ব্যাংকবহির্ভূত উৎস থেকে ২৩ হাজার কোটি টাকা এবং অন্যান্য খাত থেকে ৫ হাজার কোটি টাকা সংস্থান করার কথা বলা হয় মুস্তফা কামালের শেষ বাজেটে।

আবুল হাসান মাহমুদ আলী’র একমাত্র বাজেট

জাতীয় সংসদে গতবছরের ৬ জুন “সুখী, সমৃদ্ধ, উন্নত ও স্মার্ট বাংলাদেশ বিনির্মাণে অঙ্গীকার” শীর্ষক ২০২৪-২৫ অর্থবছরের বাজেট উপস্থাপন করেছিলেন তৎকালীন অর্থমন্ত্রী আবুল হাসান মাহমুদ আলী। এটি দেশের ৫৩তম, আওয়ামী লীগ নেতৃত্বাধীন সরকারের ২৫তম ও অর্থমন্ত্রী হিসেবে আবুল হাসান মাহমুদ আলীর প্রথম বাজেট।

বড় কোনো পরিবর্তন ছাড়াই জাতীয় সংসদে পাস হয় ২০২৪-২৫ অর্থবছরের ৭ লাখ ৯৭ হাজার কোটি টাকার বাজেট।

২০২৩-২৪ অর্থবছরের চেয়ে গত বাজেটের আকার বেড়েছিল ৪.৬%। মূল্যস্ফীতি ৬.৫% েএ নামিয়ে আনা এবং মোট দেশজ উৎপাদনের (জিডিপি) প্রবৃদ্ধির হার ৬.৭৫%৳ অর্জন করার লক্ষ্য ঠিক করে সরকার।

ওই বাজেটে ১৫% কর দিয়ে কালোটাকা সাদা করার সুযোগ রাখা হয়। সাধারণ করদাতাদের আয়ে সর্বোচ্চ করহার ২৫% বহাল রাখা হয়, যদিও বাজেট প্রস্তাবে অর্থমন্ত্রী সর্বোচ্চ করহার ৩০% নির্ধারণের প্রস্তাব করেছিলেন। ২০২৪-২৫ অর্থবছরের প্রস্তাবিত বাজেটে করমুক্ত আয়ের সীমা বাড়ানো হয়নি।

আবুল হাসান মাহমুদ আলী’র বাজেট বাজেটে ঘাটতি ধরা হয়েছিল ২ লাখ ৫৬ হাজার কোটি টাকা। বাজেট ঘাটতি মেটাতে বৈদেশিক উৎস থেকে ৯০ হাজার ৭০০ কোটি টাকা এবং অভ্যন্তরীণ উৎস থেকে ১ লাখ ৬০ হাজার ৯০০ কোটি টাকা ঋণ নেওয়ার কথা বলা হয়। বাজেটে রাজস্ব আয়ের লক্ষ্যমাত্রা ধরা হয় ৫ লাখ ৪১ হাজার কোটি টাকা। ২ লাখ ৬৫ হাজার কোটি টাকার বার্ষিক উন্নয়ন কর্মসূচি (এডিপি) আগেই অনুমোদিত হয়।

(২০২৩ সালে ঢাকা ট্রিবিউন বাংলায় প্রকাশিত এই প্রতিবেদনটি হালানাগাদ করে পুনঃপ্রকাশিত হলো।)