জুলাই অভ্যুত্থানের বৈষম্যহীন আদর্শের সঙ্গে বাজেট প্রস্তাবনার সাযুজ্য নেই বলে দাবি করেছে বেসরকারি গবেষণা প্রতিষ্ঠান সেন্টার ফর পলিসি ডায়লগ (সিপিডি)। বাজেটের অনেক ক্ষেত্রে বিশেষ করে করখাতে এখনও বৈষম্য বিদ্যমান রয়েছে বলেও জানিয়েছে প্রতিষ্ঠানটি।
সিপিডির পক্ষ থেকে বলা হয়, সামগ্রিক বিচারে এবারের বাজেট বৈষম্যহীন বাংলাদেশের প্রত্যাশা পূরণে ব্যর্থ। অর্থ উপদেষ্টাকে বাজেটের নানা দিক পুর্নমূল্যায়নের আহ্বান জানিয়েছে সিপিডি।
মঙ্গলবার (৩ জুন) সকালে রাজধানীর লেক শোর হোটেলে বাজেটোত্তর সংবাদ সম্মেলনে এসব কথা বলেন সিপিডি নির্বাহী পরিচালক ফাহমিদা খাতুন। এ সময় প্রতিষ্ঠানটির সম্মাননীয় ফেলো মোস্তাফিজুর রহমান ও প্রতিষ্ঠানটির অন্যান্য গবেষক উপস্থিত ছিলেন।
“জাতীয় বাজেট ২০২৫-২৬ সিপিডির পর্যালোচনা” শীর্ষক সংবাদ সম্মেলনে ফাহমিদা খাতুন বলেন, “এবারের বাজেটের মূল্য উদ্দেশ্য ছিল বাজেটকে প্রবৃদ্ধিমুখী ও ভৌত কাঠামগত উন্নতির দিকে না নিয়ে দেশের সামগ্রিক উন্নয়ন ও জনবান্ধব করা। কিন্তু অর্থ উপদেষ্টা যে বাজেট উত্থাপন করেছেন, তার সঙ্গে বাজেটের প্রত্যয়ের প্রতিফলন ঘটেনি।”
করমুক্ত আয়সীমা প্রসঙ্গে সিপিডি বলছে, “৩ লাখ ৫০ হাজার টাকা থেকে করমুক্ত আয়সীমা ৩ লাখ ৭৫ হাজার টাকা করা হয়েছে। কিন্তু এই আয়সীমা কার্যকর হবে ২০২৬-২৭ এবং ২০২৭-২৮ অর্থবছর থেকে। সেই সময়ের মূল্যস্ফীতির সঙ্গে তুলনা করলে কর আদায়ে যে ছাড় দেওয়া হয়েছে তা নিতান্ত নগণ্য।”
অন্যান্য বাজেটের মতো এবারের বাজেটেও করের বড় চাপ পড়বে নিম্ন মধ্যবিত্ত এবং মধ্যবিত্ত মানুষের ওপর। বিশেষ করে যাদের বার্ষিক আয় ৬ লাখ থেকে ১৬ লাখের মধ্যে তাদেরকে গুণতে হবে বড় করহার। অন্যদিকে যাদের আয় ৩০ লাখের ওপরে তাদের ওপর আরোপিত কর অপেক্ষাকৃত কম—যা পরিষ্কার বৈষম্য বলে মনে করে সিপিডি।
এবারের বাজেটে মূল্যস্ফীতি ৬.৫%-এর মধ্যে রাখার লক্ষ নির্ধারণ করা হয়েছে, যা উচ্চাকাঙ্ক্ষী উল্লেখ করে ফাহমিদা বলেন, “বছরের বিগত মাসের মূল্যস্ফীতির হার দেখে মনে হচ্ছে না এটি ৬.৫%-এর মধ্যে রাখা সম্ভব। বার্ষিক মূল্যস্ফীতি ৬.৫% রাখা সরকারের জন্য চ্যালেঞ্জিং হবে।”
কালো টাকা সাদা করার সুযোগের কড়া সমালোচনা করে ফাহমিদা বলেন, “প্রথমত নৈতিকতার জায়গা থেকে এটি মেনে নেওয়া যায় না। তার ওপর আবাসন খাতে বিনিয়োগের মাধ্যমে কালো টাকা সাদা করার সুযোগ দিচ্ছে সরকার। অন্যদিকে এই খাতের নানা পণ্যের ওপর বাড়তি শুল্ক আরোপ করা হয়েছে। এ সিদ্ধান্ত মধ্যবিত্ত জনগোষ্ঠীর ওপর চরম বৈষম্য।”
এখন পর্যন্ত দেশে ২০টি মেগা প্রকল্পের কাজ চলমান আছে, যার ৮টি প্রকল্পের কাজ ২০২৬ সালে শেষ হওয়ার কথা। তবে সিপিডি ধারণা করছে, নির্ধারিত সময়ের মধ্যে এসব প্রকল্পের কাজ শেষ হবে না এবং ব্যয় বাড়বে, যা বাজেটের এডিপি খাতে বরাদ্দকৃত অর্থের ওপর চাপ ফেলবে।
খাতভিত্তিক বরাদ্দের সমালোচনা করে ফাহমিদা বলেন, “এবারের বাজেটেও শিক্ষাখাতে বরাদ্দ জিডিপির ২%-এর কম এবং স্বাস্থ্য খাতের বরাদ্দ ১%-এর কম। এ ধরনের বরাদ্দ দিয়ে এই দুই খাতের উন্নতি আশা করা যায় না।”
এদিকে, বাজেটে যে রাজস্ব লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়েছে, তা পূরণ করাও কষ্টসাধ্য উল্লেখ করে মুস্তাফিজুর রহমান বলেন, “রাজস্ব বিভাগ আগের মতোই আছে। এই বিভাগকে এখন পর্যন্ত পুনর্গঠন করা সম্ভব হয়নি। এবারের বাজেটে সরকার রাজস্ব বিভাগের কাছে এক রকমের আত্মসমর্পণ করেছে।”
তিনি আরও বলেন, “বাজেটে প্রবৃদ্ধির যে লক্ষমাত্রা ধরা হয়েছে, ঋণমানের যে কাঠামো নির্ধারণ করেছে সরকার এবং করহারে যে বৈষম্য আছে; তা নতুন অর্থবছরের বাজেট থেকে পূর্ব অনুমিত হলেও প্রত্যাশিত ছিল না।”
সামাজিক নিরাপত্তা প্রসঙ্গে এই খাতে বরাদ্দকৃত অর্থ থেকে সরকারি চাকরিজীবীদের পেনশন এবং কৃষি ভর্তুকি বাদ দিয়ে আসল সুবিধাভোগীদের জন্য বরাদ্দকৃত অর্থের পরিমাণ বৃদ্ধির ওপর জোর দেয় প্রতিষ্ঠানটি।