শহরের হলে ‘হাওয়া’ দেখতে চান কলকাতার দর্শকরা

দেশের গণ্ডি পেরিয়ে বিদেশেও বইছিল “হাওয়া”। বাংলাদেশে ঝড় তোলা ছবিটি কলকাতার দর্শকদের মাঝে সাড়া জাগিয়েছে। শনিবার (২৯ অক্টোবর) থেকে রবীন্দ্রসদনের নন্দনে শুরু হওয়া চতুর্থ বাংলাদেশ চলচ্চিত্র উৎসবে ছবিটি প্রদর্শিত হচ্ছে।

দর্শকদের চাপে সিনেমাটির শো বাড়ানো হয়েছে। ৩১ অক্টোবর সকাল ১০টায় নন্দন-১ ও সন্ধ্যায় ৬টায় নন্দন-২ এবং বুধবার একই জায়গায় একই সময়ে দেখানো হচ্ছে হাওয়া।

আনন্দবাজার পত্রিকার এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, প্রথম দিন নন্দনে শো ছিল বেলা দেড়টায়। কিন্তু বেলা সোয়া ১১টায় দর্শকের লম্বা লাইন নন্দন ছাড়িয়ে গগনেন্দ্র শিল্প প্রদর্শনশালার সামনে গিয়ে পৌঁছায়। সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে ছড়িয়ে পড়া কিছু ছবি এবং ভিডিওতেও নন্দনের বাইরে দীর্ঘ লাইন দেখা যায়।

আনন্দবাজার লিখেছে, “শনিবার কলকাতার নন্দন প্রাঙ্গণে কান পাতলে যেন শোনা যাচ্ছিল এই সুরই। থিক থিক করছে মাথা। পাঁচ হাজার মানুষ তো হবেই। শেষ হয় তো শ্রীভূমির দুর্গাপুজোর প্যান্ডেলে এমন ভিড় দেখা গিয়েছিল। প্রতিমা দর্শনের উত্তেজনার পর মনে হয় এই চঞ্চল দর্শনের ভিড়। আসন না পেয়ে অনেকে মেঝেতে বসেও ছবিটি দেখেছেন। যারা শো দেখার সুযোগ পাননি, তারা হতাশা প্রকাশ করেছেন। দর্শকদের অনেকে সিনেমাটি হলে মুক্তি দেওয়ারও আহ্বান জানিয়েছেন।”

আরও পড়ুন- এবার ‘হাওয়া'য় ধূমপানকে উৎসাহিত করার অভিযোগে আইনি নোটিশ

বাংলাদেশের একটি অনলাইন পত্রিকার প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, “রবিবার রাতে হাওয়া সিনেমার ফেসবুক পেজে কলকাতার দর্শকদের জন্য জানানো হয় সুখবর। সেখানে বলা হয়, ‘প্রচুর দর্শকদের চাপে চতুর্থ বাংলাদেশ চলচ্চিত্র উৎসবে হাওয়া সিনেমার শো সংখ্যা বাড়ানো হয়েছে। অনেক ভালবাসা এবং কৃতজ্ঞতা কাঁটাতারের ওপারের দর্শক এবং সমর্থকদের'।”

নির্মাতা মেজবাউর রহমান সুমন গ্লিটজকে বলেন, “প্রায় ৯০০ সিটের হল পরিপূর্ণ হয়ে গেলে দর্শক মেঝেতে বসে সিনেমা দেখেন। অনেকেই দুপুরের শো দেখে বের হয়ে আবার সন্ধ্যার শো দেখার জন্য লাইনে দাঁড়ান। হাওয়া দেখার সুযোগ না পেয়ে ফিরে যাওয়া দর্শকের সংখ্যাও বিশাল। তারা পশ্চিমবঙ্গের হলে হাওয়া মুক্তির দাবি জানিয়েছেন। দর্শকদের অনুরোধে, আয়োকজরা দু'টো শো বাড়ানোর সিদ্ধান্ত নেন। পুরো উৎসবে হাওয়ার যেখানে চারটি শো হওয়ার কথা ছিল এখন সেখানে ছয়টি শো হবে।”


কলকাতার দর্শকদের মাঝে সাড়া জাগিয়েছে ‘হাওয়া'/ সংগৃহীত


সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে অভিনেতা চঞ্চল চৌধুরীকেও প্রশংসায় ভাসিয়েছেন কলকাতার দর্শক। চঞ্চলের সঙ্গে তোলা ছবি পোস্ট করেছেন কেউ কেউ।

নির্মাতা রাজ চক্রবর্তী তার স্ত্রী চিত্রনায়িকা শুভশ্রী গাঙ্গুলিকে নিয়ে এসেছিলেন হাওয়া দেখতে। সিনেমাটি দেখার পর অভিনয়শিল্পীদের কাজ এবং সিনেমার নির্মাণশৈলীতে মুগ্ধ রাজ, বিশেষ করে তার নজর কেড়েছে অভিনেতা চঞ্চল চৌধুরী।

ফেসবুকে দেওয়া এক পোস্টে রাজ লিখেছেন, “অসাধারণ অভিনয়, ক্যামেরা, ডিরেকশন এবং যার কথা সব থেকে বেশি বলতে হয়, চঞ্চল চৌধুরী। তিনি এলেন, অভিনয় করলেন এবং জয় করে নিলেন আমাদের মন। পুরো কাস্ট অ্যান্ড ক্রুকে ধন্যবাদ, অসাধারণ এই ছবি তৈরির জন্য।”

আরও পড়ুন- অস্কারে যাচ্ছে ‘হাওয়া'

একজন হল থেকে বেরিয়ে জানিয়েছেন, “এটির টিকেট ৫০০ টাকা হলেও আরও কয়েকবার দেখতাম। এই ছবি কলকাতার হলে আসলে হয়তো অনেক মানুষের সিনেমার টেস্ট বদলে যাবে।”

শাশ্বতী বোস নামে আরও একজন “সিনে মে সিনেমা” গ্রুপে লিখেছেন, “চঞ্চল চৌধুরী সাহেব আমার প্রিয় অভিনেতা। এই সুযোগ হাতছাড়া করতাম না। তাই যেমন ভাবা, তেমন কাজ। শনিবার নন্দনে সন্ধ্যা ৬টার শোতে প্রায় ৩ ঘণ্টা লাইন দিয়ে, সুযোগ পেলাম হাওয়া দেখার। নির্ভেজাল হাস্যরস, জমজমাট রহস্য, এই ছবিতে সবকটি ফর্মুলাই উপস্থিত।”

চঞ্চল চৌধুরীর সঙ্গে দেখা হওয়ার অনুভূতি ব্যক্ত করে সাগ্নিক লিখেছেন, “ভারতে হাওয়া-এর প্রথম শো-তে থাকতে পেরে যারপরনাই খুশি। অনেক সুখকর অভিজ্ঞতা হলো। ছবি দেখা শেষে মাত্র দু'মিনিটের অতি সংক্ষিপ্ত বাক্যালাপ হলো প্রিয় মানুষটির সঙ্গে। নিঃসন্দেহে বলছি, এত মাটির মানুষের সঙ্গে আমার বহুকাল সাক্ষাৎ হয়নি।”


হাওয়ার প্রদর্শনী শেষে দর্শকদের সঙ্গে সংক্ষিপ্ত মতবিনিময় করছেন চঞ্চল চৌধুরী/ সংগৃহীত


অর্কপাল দত্ত নামের এক দর্শক তার সঙ্গে আসা আরও চারজনকে ট্যাগ করে একটি পোস্ট দেন। তিনি লেখেন, “ঘণ্টা চারেক লাইন, মাঝে গলা ভেজানো লেবু চা, ঠোঁট ভেজানো সিগারেট; গেটের মুখে ‘হাউসফুল' বার্তায় ফেরত আসার মুখে, পুলিশ কাকু ও নন্দন কর্তৃপক্ষের সঙ্গে বচসায় ও ভালোবাসায় অবশেষে মাটিতে বসে দেখা প্রথম সিনেমা।”

সৌম্যদীপ বসু তার অভিজ্ঞতার বর্ণনা দিয়ে লিখেছেন, “গতকাল হাওয়ার স্ত্রিনিং ছিল নন্দনে। দীর্ঘ ১০ ঘণ্টার লাইনও দিয়েছেন মানুষ। আমি নিজেই ৪ ঘণ্টার লাইন দিয়েছিলাম। তবে এই সিনেমা দেখার অভিজ্ঞতার কাছে অপেক্ষা বা দীর্ঘ লাইন কিছুই না।”

আরও পড়ুন- ‘হাওয়া'য় মেতেছে দর্শক

“এর সঙ্গে এই সিনেমায় আছেন চঞ্চল চৌধুরী। এই মুহূর্তে উপমহাদেশের সেরা অভিনেতাদের অন্যতম দু'জন বাংলাদেশের মোশারফ করিম এবং চঞ্চল চৌধুরী। চঞ্চল চৌধুরী প্রতিটি সিনেমায় নিজেকে জাত অভিনেতা হিসাবে প্রতিষ্ঠা করেই চলেছেন। তার সঙ্গে অন্যান্য অভিনেতারা যেমন শরিফুল রাজ বা নাসিরুদ্দিন খান বা সোহেল মণ্ডল দিয়েছেন অনবদ্য সঙ্গ। একমাত্র নারী চরিত্রে নাজিফা তুষীও বেশ ভালো।”

সৌম্যজিৎ লেখেন, “ছবিটা বাণিজ্যিকভাবে ভারতে রিলিজ করলে পশ্চিমবঙ্গ থেকে রেকর্ড বক্স অফিস কালেকশন করত। সিম্পল একটা স্টোরিকে কীভাবে উপাদেয় আহার বানিয়ে পরিবেশন করতে হয় সেটা বাংলাদেশি পরিচালকরা হাতে ধরে শিখিয়ে দিচ্ছেন।…। হাওয়া বইতে থাকুক!”

ফেইসবুকে পোস্ট করা ভিডিওতে দেখা যায়, হাওয়ার প্রদর্শনী শেষে চঞ্চল চৌধুরী দর্শকদের সঙ্গে সংক্ষিপ্ত মতবিনিময় করেন। এ সময় মঞ্চে উপস্থিত ছিলেন বাংলা চলচ্চিত্রের আরেক জনপ্রিয় মুখ প্রসেনজিৎ চট্টোপাধ্যায়।

এর আগে হাওয়া ছবিটি কানাডা ও আমেরিকায় প্রদর্শিত হয়। দুই দেশেই বেশ সাড়া জাগিয়েছিল সিনেমাটি।