মানবদেহে এমন একটি অঙ্গ রয়েছে, যার একটি বড় অংশ অপসারণ করলেও সেটি আবার ধীরে ধীরে নিজস্ব আকার ও কার্যক্ষমতা ফিরে পেতে পারে। সেই অঙ্গটি হলো লিভার। এ কারণেই আধুনিক চিকিৎসাবিজ্ঞানে জীবিত ব্যক্তির কাছ থেকেও লিভারের অংশ নিয়ে প্রতিস্থাপন বা লিভার ট্রান্সপ্লান্ট করা সম্ভব হচ্ছে।
বর্তমানে লিভার প্রতিস্থাপন গুরুতর লিভার বিকল রোগীদের জন্য অত্যন্ত কার্যকর ও জীবনরক্ষাকারী চিকিৎসাপদ্ধতি হিসেবে বিবেচিত। অনেক ক্ষেত্রে নতুন লিভার ছাড়া রোগীর বেঁচে থাকার আর কোনো উপায় থাকে না। তবে মৃতদাতার লিভার সবসময় সহজলভ্য না হওয়ায় চিকিৎসকেরা জীবিত সুস্থ ব্যক্তির কাছ থেকেও লিভারের ৪০ থেকে ৬০ শতাংশ পর্যন্ত অংশ নিয়ে প্রতিস্থাপন করেন।
শুনতে ঝুঁকিপূর্ণ মনে হলেও চিকিৎসাবিজ্ঞানের দৃষ্টিতে এটি অত্যন্ত পরিকল্পিত ও নিয়ন্ত্রিত একটি প্রক্রিয়া। কারণ লিভারের রয়েছে পুনর্জন্ম বা রিজেনারেশনের বিশেষ ক্ষমতা। অর্থাৎ লিভারের একটি অংশ কেটে নেওয়ার পর অবশিষ্ট অংশ ধীরে ধীরে বড় হয়ে প্রয়োজনীয় কার্যক্ষমতা ফিরে পায়। একইভাবে গ্রহীতার শরীরে প্রতিস্থাপিত অংশটিও নতুন পরিবেশে বৃদ্ধি পেতে শুরু করে।
কেন লিভার দান করা সম্ভব?
মানবদেহের বেশিরভাগ অঙ্গ নির্দিষ্ট আকারের হলেও লিভার ব্যতিক্রম। এটি নিজে থেকেই পুনরায় বৃদ্ধি পাওয়ার ক্ষমতা রাখে। চিকিৎসকেরা দাতার শরীরে এমন পরিমাণ লিভার রেখে দেন, যাতে তার শরীর স্বাভাবিকভাবে কাজ চালিয়ে যেতে পারে। ফলে সময়ের সঙ্গে সঙ্গে দাতার লিভারও পুনরুদ্ধার হয়।
অপারেশনের পর দাতার শরীরে কী পরিবর্তন হতে পারে?
লিভার ডোনেশন সাধারণত দুই ধরনের হয়
১. লিভিং ডোনেশন: জীবিত সুস্থ ব্যক্তি লিভারের একটি অংশ দান করেন।
২. ডিসিজড ডোনেশন: ব্রেন ডেথ হওয়া ব্যক্তির পরিবারের অনুমতিতে সম্পূর্ণ লিভার দান করা হয়।
বিশেষজ্ঞদের মতে, অধিকাংশ ক্ষেত্রেই দাতার শরীরে দীর্ঘমেয়াদি বড় কোনো ক্ষতি হয় না। তবে অপারেশনের পর প্রথম কয়েক সপ্তাহ কিছু স্বাভাবিক শারীরিক পরিবর্তন দেখা দিতে পারে। যেমন,
- অপারেশনের স্থানে ব্যথা বা অস্বস্তি
- দুর্বলতা ও ক্লান্তি
- সাময়িক ক্ষুধামন্দা
- চলাফেরায় সীমাবদ্ধতা
- হজমজনিত সাময়িক সমস্যা
এসব উপসর্গ সাধারণত ধীরে ধীরে কমে আসে এবং বেশিরভাগ দাতা কয়েক মাসের মধ্যেই স্বাভাবিক জীবনে ফিরতে পারেন।
দীর্ঘমেয়াদে কি ঝুঁকি থাকে?
গবেষণায় দেখা গেছে, সঠিকভাবে স্বাস্থ্য পরীক্ষা করে নির্বাচিত অধিকাংশ দাতা দীর্ঘমেয়াদে স্বাভাবিক জীবনযাপন করতে সক্ষম হন। তবে যেহেতু এটি বড় ধরনের অস্ত্রোপচার, তাই কিছু সম্ভাব্য জটিলতা থেকে যায়। যেমন,
- সংক্রমণ
- রক্তক্ষরণ
- পিত্তনালির জটিলতা
- অস্ত্রোপচারের স্থানে হার্নিয়া
- খুব বিরল ক্ষেত্রে লিভারের কার্যকারিতা সংক্রান্ত সমস্যা
এ কারণেই দাতা নির্বাচনের আগে বিস্তৃত স্বাস্থ্য পরীক্ষা, মানসিক মূল্যায়ন এবং লিভারের কার্যক্ষমতা যাচাই করা হয়।
দাতা নির্বাচন কেন এত গুরুত্বপূর্ণ?
চিকিৎসকেরা নিশ্চিত হতে চান, দাতা সম্পূর্ণ সুস্থ এবং অস্ত্রোপচারের পর তার শরীর নিরাপদ থাকবে। এজন্য সাধারণত যেসব বিষয় পরীক্ষা করা হয়,
- লিভারের স্বাস্থ্য
- রক্তের গ্রুপের সামঞ্জস্য
- ডায়াবেটিস, হৃদরোগ বা অন্য জটিল রোগ আছে কি না
- মানসিক প্রস্তুতি
- বয়স ও শারীরিক সক্ষমতা
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, জীবিত লিভার দান অত্যন্ত মানবিক ও জীবনরক্ষাকারী উদ্যোগ হলেও এটি কখনোই হালকাভাবে নেওয়ার বিষয় নয়। দাতাকে অপারেশনের ঝুঁকি, পুনরুদ্ধারের সময় এবং ভবিষ্যৎ শারীরিক অবস্থার বিষয়ে পরিষ্কার ধারণা থাকতে হয়।
লিভার কত দিনে পুনরায় বড় হয়?
গবেষণা অনুযায়ী, অস্ত্রোপচারের পর অবশিষ্ট লিভার দ্রুত কোষ বিভাজনের মাধ্যমে বৃদ্ধি পেতে শুরু করে। কয়েক সপ্তাহের মধ্যেই উল্লেখযোগ্য পুনরুদ্ধার দেখা যায় এবং কয়েক মাসের মধ্যে কার্যক্ষমতা অনেকটাই স্বাভাবিক হয়ে আসে। তবে পুরোপুরি আগের আকারে ফিরবে কি না, তা ব্যক্তি ভেদে ভিন্ন হতে পারে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, অভিজ্ঞ সার্জন, উপযুক্ত হাসপাতাল এবং সঠিক পরবর্তী পরিচর্যা নিশ্চিত করা গেলে অধিকাংশ জীবিত লিভার দাতা সুস্থ ও স্বাভাবিক জীবনযাপন করতে পারেন।