আপনার কন্যাসন্তান কি ট্রমার মধ্যে দিয়ে যাচ্ছে? যেভাবে বুঝবেন

শৈশবের যে আঙিনায় আমরা পরম আত্মীয় বা নিরাপদ প্রতিবেশী বলে মেলামেশা করি, তাদের সবার ভেতরের মানুষটা কি আসলেই এক? যে পরিচিত মানুষকে আমরা সবচেয়ে নিরাপদ ভাবি, অনেক সময় সেখানেই লুকিয়ে থাকে এক চরম বিভীষিকা। শৈশবে চারপাশের মানুষের আসল রূপ কী, তা বোঝার মতো ক্ষমতা বা সচেতনতা কোনো শিশুরই থাকে না। আর বড় হয়ে যখন তারা সেই সত্য বুঝতে পারে, তখন জীবনের খাতায় যোগ হয়ে যায় এক দীর্ঘস্থায়ী মানসিক যন্ত্রণা বা ট্রমা।  

দুর্ভাগ্যবশত, চেনা মানুষের দ্বারা শিশুদের এই অনাকাঙ্ক্ষিত অভিজ্ঞতার মুখোমুখি হওয়া আজ আর কোনো বিচ্ছিন্ন ঘটনা নয়। সম্প্রতি ঢাকার পল্লবীতে প্রতিবেশীর ফ্ল্যাটে দ্বিতীয় শ্রেণীর এক কন্যাশিশুকে নৃশংসভাবে ধর্ষণ ও হত্যার ঘটনা দেশজুড়ে নতুন করে এক চরম উদ্বেগ ও আতঙ্কের জন্ম দিয়েছে।যেখানে ঘরের পাশের মানুষই ঘাতক হয়ে ওঠে, সেখানে আমাদের কন্যাসন্তানেরা কতটা নিরাপদ? পরিবারগুলো কীভাবে এই অদৃশ্য ঝুঁকি চিনবে?

চেনা মানুষই যখন জীবনের বড় ঝুঁকি

সাধারণত আমরা ভাবি, বাইরের কোনো অপরিচিত মানুষ বোধহয় শিশুদের জন্য ভীতিকর। কিন্তু বাস্তবতার চিত্র সম্পূর্ণ ভিন্ন। দেশে এবং বিদেশে বিভিন্ন গবেষণায় দেখা গেছে, শিশুদের প্রতি ঘটে যাওয়া যৌন সহিংসতার সিংহভাগের নেপথ্যেই থাকে অত্যন্ত পরিচিত এবং বিশ্বস্ত কোনো মুখ। 

সম্প্রতি নিজের আপনজন বা পরিচিত মানুষের দ্বারাই শিশু থেকে নারী যে এই নির্যাতনের শিকার হয় এবং পরিবারের সচেতনতাই পারে সন্তানকে  নিরাপদে রাখতে সে সংক্রান্ত বিবিসির প্রতিবেদনে উঠে এসেছে নানা তথ্য।

জাতীয় মানসিক স্বাস্থ্য ইনস্টিটিউটের তথ্য এবং ‘চাইল্ড সেক্সুয়াল অ্যাবিউজ ইন বাংলাদেশ’ শীর্ষক গবেষণা অনুযায়ী, প্রায় ৮৫% ক্ষেত্রে নির্যাতনকারী হয় শিশুর কোনো আত্মীয়, পারিবারিক বন্ধু বা প্রতিবেশী।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের রাজনীতি বিশ্লেষক ও অধ্যাপক ড. জোবাইদা নাসরীনের যৌথ গবেষণায় দেখা গেছে, শিশু নির্যাতনের মাত্র ২৫% ঘটে সম্পূর্ণ অপরিচিত মানুষের দ্বারা। বাকি ৭৫% এর মধ্যে ৪২% প্রতিবেশী বা নিয়মিত যাতায়াতকারী চেনা মানুষ এবং ৩৩% ক্ষেত্রে স্বয়ং শিশুর কোনো না কোনো আত্মীয় জড়িত থাকে।

জাতিসংঘের শিশু বিষয়ক সংস্থা ইউনিসেফের মতে, বিশ্বের প্রতি আটজন নারীর মধ্যে একজন ১৮ বছর বয়সের আগেই যৌন নির্যাতনের শিকার হন, যাদের বড় অংশই ১৪-১৬ বছরের কিশোরী। এমনকি যুক্তরাষ্ট্রের ‘আরএআইএনএন’ (RAINN) সংস্থার তথ্য বলছে, সেখানেও ৯৩% ঘটনার পেছনে থাকে পরিচিত কেউ, যার মধ্যে ৩৪% পরিবারের সদস্য।

বিশেষজ্ঞদের মতে, শিশুরা সহজে কাউকে কিছু বলতে পারে না এবং নিকটাত্মীয় বা প্রতিবেশীদের ওপর পরিবারের যে অন্ধবিশ্বাস থাকে, অপরাধীরা মূলত সেই সুযোগকেই হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার করে।

আপনার শিশু কি কোনো মানসিক যন্ত্রণার মধ্য দিয়ে যাচ্ছে?

নির্যাতনের শিকার শিশুরা অনেক সময় ভয়ে বা হুমকিতে মুখে কিছু বলতে পারে না। তবে তাদের আচরণ এবং শরীরে কিছু নীরব পরিবর্তন আসে। মানসিক রোগ বিশেষজ্ঞ ডা. মেখলা সরকারের মতে, হঠাৎ করেই যদি শিশুর মধ্যে নিচের লক্ষণগুলো দেখা যায়, তবে অভিভাবকদের অবিলম্বে সতর্ক হতে হবে:

অকারণ বিষণ্ণতা ও উদ্বেগ: শিশু হঠাৎ চুপচাপ হয়ে যেতে পারে বা তার মধ্যে তীব্র হীনমন্যতা ও ভয় কাজ করতে পারে।

মেজাজের পরিবর্তন: অকারণে অতিরিক্ত জেদ করা, খিটখিটে হয়ে যাওয়া বা আচরণে রুক্ষতা আসা।

স্কুল ও পড়াশোনায় অনীহা: হঠাৎ করে পড়ালেখায় মনোযোগ হারিয়ে ফেলা এবং কোনো অবস্থাতেই স্কুলে যেতে না চাওয়া।

মানুষের প্রতি ভীতি: স্বাভাবিক মেলামেশা বন্ধ করে দেওয়া, বিশেষ করে পুরুষদের এড়িয়ে চলার বা ভয় পাওয়ার তীব্র প্রবণতা।

শারীরিক জটিলতা (নির্দিষ্ট কোনো রোগ ছাড়াই): রাতে ঘুমের মধ্যে হঠাৎ কেঁপে ওঠা বা অনিদ্রা, ঘন ঘন মাথা ব্যথা কিংবা বুকে ব্যথা হওয়া, সামান্য মানসিক চাপেই জ্ঞান হারানো, খিঁচুনি বা দম আটকে আসার মতো সমস্যা দেখা দেওয়া প্রভৃতি।

সুরক্ষায় অভিভাবকের ঢাল: কী করবেন, কীভাবে শেখাবেন?

আপনার সন্তানকে নিরাপদ রাখতে এবং কোনো অনাকাঙ্ক্ষিত পরিস্থিতি এড়াতে ডা. মেখলা সরকার কিছু জরুরি পরামর্শ দিয়েছেন:

১. স্পর্শের ভালো-মন্দ শেখানো: তিন থেকে চার বছর বয়স থেকেই শিশুকে তার শরীরের সংবেদনশীল অঙ্গ সম্পর্কে ধারণা দিন। তাকে স্পষ্ট বুঝিয়ে বলুন যে, মা-বাবা (গোসল বা অসুস্থতার সময়) এবং চিকিৎসক (অসুস্থতায়) ছাড়া অন্য কেউ যেন সেখানে স্পর্শ না করে। অস্বস্তিকর উপায়ে কেউ স্পর্শ করলে সঙ্গে সঙ্গে ‘না’ বলা, চিৎকার করা এবং সেখান থেকে সরে এসে মা-বাবাকে জানানোর সাহস দিতে হবে।

২. অপরিচিতদের নিয়ে সচেতনতা: অপরিচিত কেউ কিছু দিলে তা না নেওয়া এবং তাদের সাথে কোথাও না যাওয়ার শিক্ষা প্রথম থেকেই দিতে হবে।

৩. সচেতন নজরদারি: শিশু কোথায় যাচ্ছে, কার সাথে খেলছে তা মা-বাপের নজরে থাকতে হবে। যারা কর্মজীবী, তারা ঘরে সিসি ক্যামেরা ব্যবহার করতে পারেন। এমনকি গৃহশিক্ষক বা কোনো আত্মীয়ের কাছে শিশু পড়তে বসলেও মা-বাবাকে হুটহাট সেখানে গিয়ে খোঁজ নিতে হবে, যাতে চারপাশের মানুষ বোঝে যে শিশুর ওপর সার্বক্ষণিক নজর রয়েছে।

৪. আস্থা ও বিশ্বাসের পরিবেশ: যদি শিশুর মধ্যে কোনো অস্বাভাবিক লক্ষণ দেখেন, তবে তাকে বকাঝকা বা ভয় না দেখিয়ে আশ্বস্ত করুন। তাকে নিরাপদ অনুভব করান এবং প্রয়োজনে দ্রুত মনোরোগ বিশেষজ্ঞ বা পেশাদার কাউন্সেলরের সাহায্য নিন।

আইন বনাম বাস্তবতা

‘নারী ও শিশু নির্যাতন দমন আইন, ২০০০’ অনুসারে ধর্ষণের শাস্তি মৃত্যুদণ্ড বা যাবজ্জীবন কারাদণ্ডসহ অর্থদণ্ড। দলবদ্ধ ধর্ষণ বা ধর্ষণের পর হত্যার ক্ষেত্রে আরও কঠোর শাস্তির বিধান রয়েছে।

তবে মানবাধিকারকর্মী অ্যাডভোকেট এলিনা খান ও অ্যাডভোকেট সালমা আলী বলেন, “আইন আছে কিন্তু প্রয়োগ নেই। মামলা দীর্ঘদিন ঝুলে থাকে, তদন্তে দেরি হয় এবং অনেক পরিবার লজ্জার ভয়ে ঘটনা ধামাচাপা দেয়। থানায় নারীবান্ধব পরিবেশেরও অভাব রয়েছে।”

মূলত শিশুর সুরক্ষায় কেবল পরিবার নয় - স্কুল, সমাজ ও রাষ্ট্রকে সম্মিলিতভাবে এগিয়ে আসতে হবে। পাশাপাশি দ্রুত মনিটরিং জোরদার করা, গণমাধ্যম ও সামাজিক সংগঠনগুলোর সক্রিয় ভূমিকা এ জনসচেতনতা তৈরি করতে পারে। 

সর্বোপরি সচেতনতা এবং সন্তানের সাথে বন্ধুত্বের সম্পর্কই পারে তাকে চারপাশের চেনা মুখোশধারী মানুষদের হাত থেকে সুরক্ষিত রাখতে।