আমরাই কি ‘জোনাকির আলো’ দেখা শেষ প্রজন্ম?

নিঝুম রাতে বাঁশঝাড় কিংবা গ্রামের কোনো জলাভূমির ধারে জোনাকি পোকার মিটিমিটি আলো এক সময় গ্রামীণ বাংলার এক চিরচেনা রূপকথা ছিল। কিন্তু বিজ্ঞানীদের সাম্প্রতিক এক সতর্কবার্তা সেই চেনা রূপকথাকে এক নির্মম বাস্তবতার মুখোমুখি দাঁড় করিয়ে দিয়েছে। গবেষকরা বলছেন, দ্রুত বদলে যাওয়া পৃথিবীর বুকে জোনাকি পোকা এখন তীব্র অস্তিত্বের সংকটে। সম্ভবত আমরাই পৃথিবীর শেষ প্রজন্ম, যারা প্রকৃতির এই জাদুকরী আলো দেখার সৌভাগ্য নিয়ে বেঁচে আছি।

বিশ্বজুড়ে পরিবেশ বিজ্ঞানীদের করা একাধিক গবেষণায় উঠে এসেছে, জোনাকি পোকার এই দ্রুত বিলুপ্তির পেছনে প্রাকৃতিক কোনো কারণ নেই; বরং মানুষের তৈরি কিছু সুনির্দিষ্ট সংকটই এদের আলো নিভিয়ে দিচ্ছে।   

জোনাকির আলো নিভে যাওয়ার কারণ

গবেষকদের মতে, মূলত চারটি কারণে বিশ্বজুড়ে আশঙ্কাজনক হারে কমছে জোনাকির সংখ্যা:

আবাসস্থল ধ্বংস: জোনাকির টিকে থাকার জন্য প্রয়োজন আর্দ্র, বনাঞ্চল এবং জলাভূমি। কিন্তু অপরিকল্পিত ও দ্রুত শহরায়ণ এবং নির্বিচারে বন উজাড়ের কারণে তাদের এই প্রাকৃতিক বাসস্থানগুলো পুরোপুরি ধ্বংস হয়ে যাচ্ছে।

ফায়ারফ্লাই ট্যুরিজম: জাপান, তাইওয়ান কিংবা যুক্তরাষ্ট্রের গ্রেট স্মোকি মাউন্টেন্সে জোনাকি দেখার জন্য প্রতি বছর লাখ লাখ মানুষ ভিড় করে।হাজার হাজার মানুষের পায়ের নিচে পিষ্ট হয়ে মারা যায় জোনাকির লার্ভা এবং ডিম, কারণ জোনাকিরা মাটির কাছাকাছি বা স্যাঁতসেঁতে মাটিতে ডিম পাড়ে। মানুষের অজান্তেই তাদের হাঁটাচলার কারণে একটি পুরো প্রজন্ম ধ্বংস হয়ে যাচ্ছে।

কৃত্রিম আলোক দূষণ: জোনাকির আলো কোনো সাধারণ আলো নয়, এটি তাদের প্রজননের প্রধান মাধ্যম। একে বিজ্ঞানের ভাষায় বলা হয় ‘জৈব-আলোকিত সংকেত’। পুরুষ জোনাকি আলো জ্বেলে স্ত্রী জোনাকিকে আকর্ষণ করে। কিন্তু আধুনিক শহরের তীব্র কৃত্রিম আলো এবং রাতের আলোর আধিক্যের কারণে জোনাকিরা একে অপরের এই সংকেত আর চিনতে পারছে না, যা তাদের প্রজনন চক্রকে ব্যাহত করছে।

আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যম ‘দ্য গার্ডিয়ানে’ পরিবেশ বিষয়ক ফিচারে মালয়েশিয়া এবং দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার ম্যানগ্রোভ বনাঞ্চলের জোনাকিদের নিয়ে একটি বিশেষ প্রতিবেদন প্রকাশ হয়েছিল। সেখানে দেখানো হয়, পর্যটকদের অতিরিক্ত আনাগোনা এবং ক্রুজ শিপের তীব্র সার্চলাইটের কারণে নদীর ধারের বিখ্যাত জোনাকিরা (যাদের 'ঘোস্ট ফায়ারফ্লাই' বলা হয়) দিকভ্রান্ত হয়ে পড়ছে। আলোর এই তীব্রতায় তারা নিজেদের অস্তিত্ব হারিয়ে ফেলছে। কীটনাশকের ব্যবহার: আধুনিক কৃষিকাজে রাসায়নিক ও কীটনাশকের ব্যাপক ব্যবহারের সরাসরি শিকার হচ্ছে এই কোমল পোকাগুলো। কীটনাশক ব্যবহারে জোনাকি যেমন মারা যাচ্ছে, তেমনি ধ্বংস হচ্ছে তাদের লার্ভার প্রধান খাদ্য যেমন - শামুক বা ছোট কৃমি।

জলবায়ু পরিবর্তন: বৈশ্বিক তাপমাত্রা বৃদ্ধি এবং অনিয়মিত আবহাওয়া জোনাকির স্বাভাবিক জীবনচক্রকে ওলটপালট করে দিচ্ছে। সময়মতো বৃষ্টি না হওয়া বা অতিরিক্ত খরা এদের বংশবৃদ্ধির পরিবেশ নষ্ট করছে।

সংস্কৃতি ও চলচ্চিত্রে জোনাকি

কেবল বাস্তুসংস্থানই নয়, মানুষের সংস্কৃতিতেও জোনাকির স্থান অনেক উঁচুতে। বিশেষ করে জাপানি সংস্কৃতি ও শিল্পকলায় জোনাকি পোকা এক গভীর আবেগের নাম। জাপানি চলচ্চিত্র (যেমন বিখ্যাত অ্যানিমে ফিল্ম ‘গ্রেভ অফ দ্য ফায়ারফ্লাই’ এবং চিত্রকলায় জোনাকিকে জীবন, ক্ষণস্থায়ী সৌন্দর্য এবং আত্মার প্রতীক হিসেবে ফুটিয়ে তোলা হয়। কিন্তু আজ সেই চেনা বনাঞ্চল ও জলাভূমি হারিয়ে বাস্তব জগতেই টিকে থাকার কঠিন সংগ্রামে লিপ্ত তারা।

এখনও কি বাঁচানো সম্ভব?

বিজ্ঞানীরা বলছেন, সময় ফুরিয়ে গেলেও একেবারে শেষ হয়ে যায়নি। এই উজ্জ্বল পোকাগুলোকে পৃথিবী থেকে চিরতরে হারিয়ে যাওয়া থেকে রক্ষা করতে এখনই বিশ্বব্যাপী কিছু সুনির্দিষ্ট পদক্ষেপ নেওয়া জরুরি:

আবাসস্থল পুনরুদ্ধার: জোনাকি প্রজনন করতে পারে এমন জলাভূমি ও বনাঞ্চলকে সুরক্ষিত এলাকা হিসেবে ঘোষণা করা।

রাতের আলো নিয়ন্ত্রণ: জোনাকির অভয়ারণ্য বা গ্রামীণ এলাকায় রাতের বেলা কৃত্রিম আলোর (বিশেষ করে নীল ও সাদা আলো) ব্যবহার কমানো এবং প্রজনন মৌসুমে আলো নিয়ন্ত্রণ করা।

পরিবেশবান্ধব কৃষি: রাসায়নিক কীটনাশক বর্জন করে জৈব কৃষিকে উৎসাহিত করা।

জনসচেতনতা: সাধারণ মানুষের মধ্যে জোনাকির গুরুত্ব এবং তাদের রক্ষায় করণীয় সম্পর্কে সচেতনতা বৃদ্ধি করা।

পরিবেশবিদদের মতে, জোনাকি কেবল একটি সুন্দর পোকা নয়, তারা পরিবেশের স্বাস্থ্যের ‘ব্যারোমিটার’ বা পরিমাপক। জোনাকি কোনো এলাকায় থাকা মানে সেখানকার মাটি, পানি এবং বাতাস এখনও বিশুদ্ধ রয়েছে। কোনো এলাকা থেকে জোনাকি বিলুপ্তি হয়ে যাওয়ার অর্থ হলো - সেখানকার পুরো ইকোসিস্টেম বা বাস্তুসংস্থান বিনষ্ট হচ্ছে।