যেভাবে বেশি চিবানো আপনার মস্তিষ্কের কার্যক্ষমতা বাড়ায়

আমরা যখন টেবিলে পছন্দের খাবার নিয়ে বসি, তখন জিভে জল আসা বা ক্ষুধা মেটানোই থাকে মূল উদ্দেশ্য। কিন্তু আপনি কি জানেন, প্লেটের খাবারটি আপনি ঠিক কতবার চিবিয়ে খাচ্ছেন, তার ওপর নির্ভর করছে আপনার স্মৃতিশক্তি, ওজন, এমনকি মানসিক প্রশান্তি? বিংশ শতাব্দীর শুরুতে আমেরিকান পুষ্টিবিদ হোরেস ফ্লেচার একটি পেঁয়াজ গিলে ফেলার আগে ৭২২ বার চিবিয়ে হইচই ফেলে দিয়েছিলেন। ফ্লেচারের সেই পদ্ধতিকে কিছুটা চরমপন্থী মনে হলেও, আধুনিক বিজ্ঞান বলছে - ভালোভাবে খাবার চিবিয়ে খাওয়ার অনেক সুফল রয়েছে। 

হজম প্রক্রিয়ার উন্নতি থেকে শুরু করে অ্যালজেইমার প্রতিরোধে আছে ‘বাইট-ব্রেইন অ্যাক্সিস’। সংবাদমাধ্যম বিবিসি - এর এক বিশেষ প্রতিবেদনে এই বিষয়ে একাধিক গবেষণামূলক তথ্য তুলে ধরা হয়েছে।

হিডেন ব্লাড পাম্প

বিজ্ঞানীরা লক্ষ্য করেছেন, চিবানোর প্রক্রিয়াটি কেবল খাবার গুঁড়ো করার কাজ করে না। সুইডেনের ক্যারোলিনস্কা ইনস্টিটিউটের ডেন্টাল হেলথ বিভাগের অধ্যাপক ম্যাটস ট্রুলসন বিবিসি-কে বলেন, “তত্ত্বটি হলো চিবানো একটি পাম্পের মতো কাজ করে, যা সরাসরি মস্তিষ্কে রক্ত প্রেরণ করে।” আমরা যখন মাড়ি আর চোয়াল ব্যবহার করে শক্ত কোনো খাবার চিবাই, তখন মুখের পেশিগুলোর উদ্দীপনা মস্তিষ্কে রক্ত ও অক্সিজেনের প্রবাহ বাড়িয়ে দেয়, যা ব্রেন সেলকে সতেজ ও তীক্ষ্ণ রাখে।

পরিপাকের গুরুত্বপূর্ণ ধাপ

সবচেয়ে মৌলিক স্তরে, চিবানো খাবারকে ছোট ছোট কণায় ভাগ করে এবং লালার মাধ্যমে সেগুলোকে ভেজায় যাতে সহজে গিলে ফেলা যায়। নেদারল্যান্ডসের ইউনিভার্সিটি মেডিকেল সেন্টার ইউট্রেখ্টের ওরালি ফিজিওলজি এবং চিবানো বিষয়ের গবেষক আন্ড্রিস ভ্যান ডার বিল্ট বলেন, “এটি হজমের প্রথম ধাপ।”

চিবানো কেবল লালা উৎপাদন এবং খাবারের শর্করা ভাঙতে সাহায্যকারী এনজাইম ‘অ্যামাইলেজ’-এর পরিমাণ বাড়ায় না, এটি অন্ত্র ও অগ্ন্যাশয়কে পাচক রস নিঃসরণেও সংকেত দেয়। ট্রুলসন বলেন, “যদি আপনি না চিবান, তবে অন্ত্র খাবার গ্রহণের জন্য প্রস্তুত হয় না।”

স্মৃতিশক্তি বা মনোযোগ বৃদ্ধি

জাপানি গবেষকদের এক পরীক্ষায় দেখা গেছে, চিবানোর সময় মস্তিষ্কের কর্মক্ষমতা এবং সতর্কতা প্রায় ১০% থেকে ২০% পর্যন্ত বৃদ্ধি পায়। শুধু তাই নয়, মস্তিষ্কের যে অংশটি স্মৃতি ধরে রাখতে সাহায্য করে (হিপোক্যাম্পাস), চিবানোর নিউরাল সংকেত সরাসরি সেখানে গিয়ে আঘাত করে। ২৮,৫০০ জন মানুষের ওপর করা এক ইউরোপীয় জরিপে দেখা গেছে, যাদের চিবানোর ক্ষমতা ভালো, তারা শব্দ মনে রাখা, সাবলীল কথা বলা এবং গাণিতিক দক্ষতায় অন্যদের চেয়ে উল্লেখযোগ্যভাবে এগিয়ে ছিলেন। বয়স বাড়ার সাথে সাথে ডিমেনশিয়া বা অ্যালজেইমারের মতো রোগ দূরে রাখতেও এর বড় ভূমিকা রয়েছে।

অনেকেরই ধারণা, পরিপাক প্রক্রিয়া শুরু হয় পেটে গিয়ে। কিন্তু এর সূচনা হয় আমাদের মুখেই। চিবানোর ফলে মুখে পর্যাপ্ত লালা এবং অ্যামাইলেজ নামক এনজাইম তৈরি হয়, যা খাবারের শর্করা ভাঙতে শুরু করে। খাবার পেটে পৌঁছানোর আগেই পাকস্থলী পাচক রস নিঃসরণ করে প্রস্তুত থাকে। উল্টোদিকে, বড় টুকরো খাবার তাড়াহুড়ো করে গিলে ফেললে তা অন্ত্রে দীর্ঘক্ষণ আটকে থাকে এবং ব্যাকটেরিয়ার কারণে ফার্মান্ট বা গেঁজে ওঠে। পেট ফাঁপা, গ্যাস, বুক জ্বালাপোড়া বা কোষ্ঠকাঠিন্যের মতো যন্ত্রণার আসল কারণ কিন্তু এখানেই।

২০০৯ সালের এক গবেষণায় দেখা গেছে, এক মুঠো কাঠবাদাম যারা স্বাভাবিকের চেয়ে বেশিবার চিবিয়ে খেয়েছেন, তাদের শরীর থেকে কম চর্বি নির্গত হয়েছে। অর্থাৎ, বেশি চিবানোর কারণে বাদামের ভেতরের শক্তি ও পুষ্টি শরীর প্রায় এক-তৃতীয়াংশ বেশি শোষণ করতে পেরেছে।

ওজন কমানোর উপায়

পাশাপাশি, এটি ওজন কমানোর সবচেয়ে সহজ পন্থা। আমরা খাওয়া শুরু করার পর পেট যে ভরে গেছে - এই সংকেত মস্তিষ্কে পৌঁছাতে অন্তত ২০ মিনিট সময় লাগে। যারা দ্রুত গিলে খায়, তারা এই ২০ মিনিটে প্রয়োজনের চেয়ে দ্বিগুণ ক্যালরি গিলে ফেলে। কিন্তু ধীরে চিবিয়ে খেলে কম খাবারেই তৃপ্তি আসে। তাছাড়া, বেশি চিবোলে রক্তে ক্ষুধার হরমোন ‘ঘ্রেলিন’ - এর মাত্রা কমে যায় এবং পেট ভরার অনুভূতি দেওয়া হরমোনের নিঃসরণ বাড়ে।

মানসিক চাপ কমানো

ল্যাবরেটরির বাইরেও চিবানো একটি ভালো স্ট্রেস-রিলিভার বা মানসিক চাপ কমানোর উপায় হতে পারে। একদল তুর্কি গবেষক যখন মিড-টার্ম পরীক্ষার প্রস্তুতি নেওয়া ১০০ জন নার্সিং শিক্ষার্থীর ওপর গবেষণা চালান, তখন তারা দেখেন যারা প্রতিদিন অন্তত ৩০ মিনিট গাম চিবিয়েছেন, তাদের স্ট্রেস, উদ্বেগ ও বিষণ্নতার মাত্রা অন্যদের চেয়ে কম ছিল। তারা পরীক্ষা শুরুর ১৫ দিন আগে নাকি ২ দিন আগে থেকে গাম চিবানো শুরু করেছেন, তার ওপর এই ফলাফল নির্ভর করেনি।

তাহলে উপায় কী?

খাদ্যাভ্যাসে ছোট কিছু পরিবর্তন এনে এই অভ্যাস গড়া যায় -  

তরল খাবারের চেয়ে শক্ত খাবার যেমন কমলার জুসের বদলে আস্ত কমলা এবং কম পিচ্ছিল খাবারের চেয়ে আঠালো বা আঁশযুক্ত খাবার যেমন সাদা ভাত বা পাস্তার বদলে ওটমিল ও তিল বেছে নেওয়ার পরামর্শ দেওয়া হয়েছে।