আইনগতভাবে ১৮ বছর বয়সে একজন মানুষকে ‘প্রাপ্তবয়স্ক’ বা পরিপক্ক হিসেবে গণ্য করা হলেও, বিজ্ঞানের হিসেবে কিন্তু তা নয়। যুক্তরাজ্যের কেমব্রিজ বিশ্ববিদ্যালয়ের গবেষকদের সাম্প্রতিক এক গবেষণায় দেখা গেছে, ১৮ বছর বয়সে মানুষের শরীর বাড়লেও মস্তিষ্ক আসলে তখনও ‘কৈশোর’ পার করেনি। মানুষের মস্তিষ্কের প্রকৃত পরিপক্কতা বা প্রাপ্তবয়স্ক অবস্থা আসতে সময় লাগে প্রায় ৩২ বছর!
৯০ বছর বয়স পর্যন্ত প্রায় ৪ হাজার মানুষের মস্তিষ্ক স্ক্যানিংয়ের মাধ্যমে পরীক্ষা করে গবেষকেরা এই চাঞ্চল্যকর তথ্য পেয়েছেন। বিজ্ঞানবিষয়ক সাময়িকী ‘নেচার কমিউনিকেশনসে’ এই গবেষণার ফল প্রকাশ করা হয়েছে। বিজ্ঞানীরা বলছেন, মানুষের জীবনকালে মোট পাঁচটি ধাপে মস্তিষ্কের বয়স বৃদ্ধি পায় এবং এর মধ্যে মূল পরিবর্তনগুলো আসে যথাক্রমে ৯, ৩২, ৬৬ ও ৮৩ বছর বয়সে।
গবেষণার নেতৃত্ব দেওয়া কেমব্রিজ বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক ড. অ্যালেক্সা মাউসলি জানান, আমরা আগে ভাবতাম ১৯ বছর বয়সের পর মানুষের মস্তিষ্কের কৈশোর কেটে যায়। কিন্তু নতুন গবেষণায় দেখা গেছে, মানুষের বয়স যখন ত্রিশের কোঠার শুরুর দিকে (৩২ বছর) পৌঁছায়, তখনো তার মস্তিষ্ক কৈশোরেই অবস্থান করে।
বিজ্ঞানীদের চিহ্নিত করা মানুষের মস্তিষ্কের বয়সের ৫টি ধাপ এবং মানুষের পরিপক্কতার সমীকরণ নিচে তুলে ধরা হলো:
১. শৈশব (জন্ম থেকে ৯ বছর)
জন্মের পর থেকে ৯ বছর পর্যন্ত মস্তিষ্কের আকার দ্রুত বাড়ে। তবে এই সময়ে জীবনের শুরুতে তৈরি হওয়া মস্তিষ্কের কোষগুলোর মধ্যকার অতিরিক্ত সংযোগ (সাইন্যাপস) কমতে থাকে। এই বয়সে মস্তিষ্ক কিছুটা উদ্দেশ্যহীনভাবে কাজ করে।
২. কৈশোর (৯ থেকে ৩২ বছর) পরিপক্কতার দীর্ঘ লড়াই
৯ বছর বয়স থেকে মানুষের মস্তিষ্কে হঠাৎ বড় পরিবর্তন শুরু হয়, যা চলে দীর্ঘ ৩২ বছর বয়স পর্যন্ত। গবেষকরা বলছেন, ১৮ বছর বয়সে মানুষ সামাজিক বা আইনগতভাবে পরিপক্কতার স্বীকৃতি পেলেও তার মস্তিষ্ক তখনও এই কৈশোরের ধাপেই থাকে। এটি মস্তিষ্কের একমাত্র পর্যায় যখন স্নায়ুকোষের সংযোগগুলো আরও বেশি সক্ষম ও দক্ষ হয়ে ওঠে। তবে চিন্তার বিষয় হলো, এই দীর্ঘ সময়েই মানুষের মানসিক স্বাস্থ্যজনিত সমস্যায় আক্রান্ত হওয়ার ঝুঁকি সবচেয়ে বেশি থাকে।
৩. প্রাপ্তবয়স্ক অবস্থা (৩২ থেকে ৬৬ বছর) আসল পরিপক্কতা
কৈশোরের দীর্ঘ ধাপ পেরিয়ে অবশেষে ৩২ বছর বয়সে মানুষের মস্তিষ্ক পুরোপুরি ‘প্রাপ্তবয়স্ক’ বা পরিপক্ক রূপ ধারণ করে। এই পর্যায়টি চলে সবচেয়ে দীর্ঘ সময় ধরে—প্রায় তিন দশকেরও বেশি। ড. অ্যালেক্সা মাউসলি বলেন, “৩২ বছরের পর মস্তিষ্কের প্রাপ্তবয়স্ক অবস্থা মানুষের বুদ্ধিমত্তা ও ব্যক্তিত্বের একটি স্থির এবং পূর্ণ পরিপক্ক অবস্থার সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ।” এই সময়ে এসে মানুষ জীবনের বড় সামাজিক পরিবর্তন যেমন: মাতৃত্ব ও পিতৃত্বের দায়িত্ব নেওয়ার মতো মানসিক সক্ষমতা অর্জন করে।
৪. বার্ধক্যের শুরু (৬৬ থেকে ৮৩ বছর)
৬৬ বছর বয়স থেকে মস্তিষ্কের এই পর্যায় শুরু হয়। এ সময় হঠাৎ করে মস্তিষ্কের সক্ষমতা কমে না গেলেও কোষের সংযোগের ধরনে বড় বদল আসে। পুরো মস্তিষ্ক একটি একক হিসেবে কাজ করার বদলে, এর ভেতরের অংশগুলো আলাদা আলাদা ভাগে ভাগ হয়ে কাজ করতে শুরু করে। এই বয়সে ডিমেনশিয়া (স্মৃতিভ্রম) ও উচ্চ রক্তচাপের মতো সমস্যা দেখা দেয়।
৫. বার্ধক্যের শেষ ভাগ (৮৩ বছর থেকে বাকি জীবন)
মানুষের বয়স ৮৩ বছর হলে মস্তিষ্ক তার চূড়ান্ত বা শেষ পর্যায়ে প্রবেশ করে। এ সময় বার্ধক্যের শুরুর দিকের পরিবর্তনগুলো আরও বেশি স্পষ্ট ও তীব্র হয়ে ওঠে।
কেমব্রিজ বিশ্ববিদ্যালয়ের গবেষকদের মতে, মানুষের জীবনের গুরুত্বপূর্ণ বাঁক যেমন: বয়ঃসন্ধি, ত্রিশের কোঠার সামাজিক দায়িত্ব এবং জীবনের শেষভাগের স্বাস্থ্যগত উদ্বেগের সঙ্গে মস্তিষ্কের এই বয়স পরিবর্তনের হুবহু মিল রয়েছে। এই গবেষণা আগামী দিনে মানুষের মানসিক স্বাস্থ্য সমস্যা ও ডিমেনশিয়ার ঝুঁকি কেন ভিন্ন ভিন্ন বয়সে ভিন্ন রকম হয়, তা বুঝতে চিকিৎসকদের ব্যাপকভাবে সাহায্য করবে।