রাজশাহীতে মায়েদের কাঁথা সেলাইয়ের আয়ে চলছে বিদ্যালয়

শিশুরা বই-খাতা হাতে ঢুকছে শ্রেণিকক্ষে। বিদ্যালয়ের পাশেই সুঁই-সুতা নিয়ে বসেছেন তাদের মায়েরা। একসঙ্গে ২০ থেকে ২৫ জন নারী নকশিকাঁথায় ফুটিয়ে তুলছেন ফুল, লতা-পাতা, পাখি ও গ্রামীণ আলপনা। কাজের ফাঁকে নিজেদের মধ্যে কথা বলছেন সাঁওতালি কিংবা মাহালী ভাষায়। তাদের সেলাই করা কাঁথা বিক্রির আয়েই চলছে সন্তানদের বিদ্যালয়। 

রবিবার (২১ জুন) রাজশাহীর পবা উপজেলার ভুগরইল খ্রিস্টানপাড়া গ্রামের ‘শিশুপ্রভাত বিদ্যানিকেতন’-এ গিয়ে এমন দৃশ্য দেখা যায়। বিদ্যালয়টি এখানকার নারীদের কাছে শুধু একটি পাঠশালা নয়, এটি তাদের স্বনির্ভর হয়ে ওঠা এবং সন্তানদের ভবিষ্যৎ গড়ার সম্মিলিত উদ্যোগ। 

এক মা মাহালী ভাষায় বলেন, “মাকার কি ইস্কুলে বে আমালকো লেখাপড়া মিললেনি।” বাংলায় যার অর্থ, এই স্কুল না থাকলে আমাদের বাচ্চারা লেখাপড়া শিখতে পারত না। 

একসময় মাঠে শ্রম দিয়েও যেসব মা সন্তানদের সময় দিতে পারতেন না, তারাই এখন নকশিকাঁথা সেলাই করে সংসারের আয় বাড়ানোর পাশাপাশি বিদ্যালয় চালাচ্ছেন। তাদের সুঁইয়ের প্রতিটি ফোঁড়ে তাই শুধু বাহারি নকশা নয়, লেখা হচ্ছে নারীর স্বনির্ভরতা, সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতি এবং নতুন প্রজন্মের শিক্ষিত ভবিষ্যতের গল্প। 

এই উদ্যোগের নেপথ্যে রয়েছেন সুমী মুর্মু। ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠীর নারীদের কর্মসংস্থানের পাশাপাশি তাদের সন্তানদের শিক্ষার সুযোগ করে দিতে তিনি গড়ে তুলেছেন ‘নারী ও শিশু কল্যাণ সংস্থা’। সংস্থাটির পরিচালকও তিনি। বাইরে থেকে কোনো অনুদান না নিয়ে নারীদের হাতের কাজ বিক্রির অর্থেই সংগঠন ও বিদ্যালয়ের ব্যয় মেটানো হচ্ছে। 

এবিষয়ে জানতে চাইলে সুমী মুর্মু জানান, ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠীর মায়েরা সকালে মাঠে কাজে যান। বিকেলে ফিরে সংসার সামলাতে হয়। ফলে সন্তানদের সময় দেওয়ার সুযোগ থাকে না। শিশুরা বড় হয়ে অধিকাংশ ক্ষেত্রে বাবা-মায়ের পেশাতেই যুক্ত হয়। অশিক্ষা, মাদকাসক্তি, নারী নির্যাতন ও বাল্যবিবাহের মতো সংকট থেকে নিজ সম্প্রদায়ের মানুষকে বের করে আনতেই তিনি কাজ শুরু করেন। 

রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের মার্কেটিং বিভাগ থেকে এমবিএ শেষ করা সুমী মুর্মু নিজ সম্প্রদায়ের নারীদের জন্য কিছু করার তাগিদে নকশিকাঁথা তৈরির কাজ শুরু করেন। পরে মাঠে কাজ করা নারীদের হাতে তুলে দেন সুঁই-সুতা। বর্তমানে তার উদ্যোগে ১৭২ জন নারী কাজ করছেন। কেউ নকশিকাঁথা সেলাই করেন, কেউ ব্লক প্রিন্ট করেন। অন্যরা কাঁথা পরিষ্কার, ইস্ত্রি ও বিক্রির উপযোগী করে তোলেন। 

তাদের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, দক্ষতা ও কাজের পরিমাণ অনুযায়ী তারা মাসে ৩ হাজার থেকে ১৫ হাজার টাকা পর্যন্ত আয় করছেন। একেকটি কাঁথা বিক্রি হচ্ছে ৮০০ থেকে ১০ হাজার টাকায়। প্রতি মাসে গড়ে প্রায় ১৫০টি কাঁথা বিক্রি হয়। 

ভুগরইল গ্রামের মারীয়া বিশ্বাস জানান, মাসে সাড়ে তিন থেকে চার হাজার টাকা আয় করেন। এই প্রতিষ্ঠানে এসে হাতের কাজ শেখার পর সংসারে আগের চেয়ে অনেক ভালো আছেন। 

২০২২ সালে সমাজসেবা অধিদপ্তর থেকে নিবন্ধন পাওয়ার পর ভুগরইলে একটি বন্ধ বিদ্যালয় নামমাত্র ভাড়ায় নিয়ে শিক্ষা কার্যক্রম শুরু করে সংস্থাটি। পরে সন্তোষপুর গ্রামের আরেকটি বন্ধ বিদ্যালয় চালু করা হয়। দুটি বিদ্যালয়ে এখন প্লে থেকে চতুর্থ শ্রেণি পর্যন্ত সব সম্প্রদায়ের শিশু একসঙ্গে পড়ছে। প্রতিটি বিদ্যালয়ে চারজন শিক্ষক ও একজন আয়া রয়েছেন। তাদের বেতন, ঘরভাড়াসহ সব ব্যয় বহন করছে সংস্থাটি। 

এই মহতী উদ্যোগের বিষয়ে ভুগরইল গির্জার ফাদার লিটন কস্তা বলেন, “পিছিয়ে থাকা সম্প্রদায়ের শিশুদের পড়াশোনা চালিয়ে নেওয়ার জন্য নামমাত্র ভাড়ায় বিদ্যালয় ভবনটি ব্যবহার করতে দেওয়া হয়েছে।”