আমাদের দেশে ওজন কমানোর প্রসঙ্গ আসলেই সবার আগে খাদ্যতালিকা থেকে বাদ পড়ে ‘ভাত’। কার্বোহাইড্রেটের এই প্রধান উৎসটিকে স্থূলতা বা মোটা হওয়ার অন্যতম বড় শত্রু মনে করা হয়। তবে ডায়েটের সময় এই প্রচলিত ধারণাকে বুড়ো আঙুল দেখিয়ে চলেছে জাপান। জাপানিরা প্রায় প্রতি বেলাতেই প্রধান খাবার হিসেবে ভাত খায়। তা সত্ত্বেও তারা মোটা হয় না।
সর্বশেষ তথ্য অনুযায়ী, জাপানে স্থূলতার হার মাত্র ৪.৬%। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে এই হার প্রায় ৪০.৩%। ভাত খেয়েও জাপানিদের এই ফিট ও স্লিম থাকার রহস্য লুকিয়ে আছে তাদের খাবারের পরিমাণ, শারীরিক সক্রিয়তা এবং খাদ্যের প্রতি এক অনন্য শৃঙ্খলার মধ্যে।
ভাতের পাশাপাশি মিসো স্যুপ গ্রহণ
জাপানিদের খাবারের থালায় ভাতের পাশাপাশি একটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ উপাদান হলো ‘মিসো স্যুপ’। তারা দিনে অন্তত দুই থেকে তিনবার এই স্যুপ পান করে থাকে। এভাবে মূল খাবার বা ভারী খাবার খাওয়ার আগে স্যুপ দিয়ে শুরু করলে সামগ্রিক ক্যালোরি গ্রহণের পরিমাণ প্রায় ২০% পর্যন্ত কমে যায়। স্যুপ একটি তৃপ্তির অনুভূতি তৈরি করে, যা পরবর্তী সময়ে অতিরিক্ত খাওয়ার প্রবণতা কমায়।
এছাড়া, জাপানিরা ওমেগা-৩ ফ্যাটি অ্যাসিডসমৃদ্ধ খাবারও প্রচুর পরিমাণে খায়, যা দীর্ঘ জীবনের জন্য খুব দরকারি। আরেকটি আশ্চর্য ব্যাপার হলো, তারা মার্কিনদের তুলনায় ৫ গুণ বেশি ক্রুসিফেরাস সবজি (যেমন ব্রকলি, বাঁধাকপি, ফুলকপি ইত্যাদি) খায়।
তাতামি ম্যাট
জাপানি সংস্কৃতির একটি অনন্য দিক হলো মেঝেতে বসে খাবার খাওয়া। ঐতিহ্যবাহী এই মেঝের আসনকে বলা হয় ‘তাতামি ম্যাট’। পশ্চিমা দেশগুলোতে বা আধুনিক ডাইনিং টেবিল ও সোফায় বসার যে আরামদায়ক অভ্যাস, তার চেয়ে তাতামি ম্যাটে বসার ধরন একদম আলাদা। মেঝেতে বসার কারণে শরীরের গভীরের সুনির্দিষ্ট কিছু পেশি সক্রিয় থাকে, যা তাদের অজান্তেই প্রতিদিনের হালকা শারীরিক মুভমেন্ট বা ক্যালোরি বার্নিংয়ে সাহায্য করে।
জাপানি শিশুদের একদম ছোটবেলা থেকেই একটি বিশেষ পাঠ দেওয়া হয় - খাবার কখনো অপচয় করা যাবে না। বাটিতে ভাত ফেলে রাখা কিংবা অতিরিক্ত খাবার চেয়ে নিয়ে তা শেষ না করাকে জাপানি সমাজে অত্যন্ত নেতিবাচক ও অসম্মানজনক আচরণ হিসেবে দেখা হয়। ফলে তারা শুরু থেকেই পরিমিত খাবার নেয়।
জাপানিরা দেহভঙ্গি ঠিক রাখে
জাপানিদের দেহভঙ্গি খুব সুন্দর। ঐতিহ্যগতভাবে তারা সেইজা ভঙ্গিতে বসেন। সেইজা মানে গোড়ালির ওপর ভর দিয়ে হাঁটু মুড়ে বসা, এটাই জাপানের আনুষ্ঠানিকভাবে বসার রীতি এটা আসলে আমাদের সবার প্রাকৃতিক বসার ভঙ্গি। কিন্তু আমরা সারা দিন চেয়ারে বসে থাকি, যা শরীরের জন্য অস্বাভাবিক ও ক্ষতিকর। পশ্চিমা স্টাইলে দীর্ঘ সময় বসে থাকা আমাদের পেশি ও হাড়ের ওপর খারাপ প্রভাব ফেলে।
মুখরোচক খাবার এড়িয়ে চলে
সবচেয়ে বড় বিষয় হলো, জাপানিদের মধ্যে দুই বেলার মাঝবর্তী সময়ে মুখরোচক স্ন্যাকস বা খাওয়ার অভ্যাস নেই বললেই চলে। এমনকি রাস্তায় হাঁটতে হাঁটতে বা জনসমক্ষে কোনো কিছু খাওয়াকে সেখানে সামাজিকভাবে অনাকাঙ্ক্ষিত বা অনুচিত আচরণ মনে করা হয়। জাপানিরা এমন খাবার খায়, যা সহজে হজম হয় ও অন্ত্রের ক্ষতি করে না। তাই তাদের শরীর সাধারণত অনেক বেশি সুস্থ থাকে। তারা প্রচুর ফারমেন্টেড খাবার (যেমন মিসো ও কিমচি) খেয়ে থাকে, যা হজমের জন্য অত্যন্ত উপকারী। এ ছাড়া জাপানিরা পরিমাণে কম খায়। ফলে তাদের হজমপ্রক্রিয়াকে কখনো অতিরিক্ত চাপ নিতে হয় না এবং শরীর হালকা থাকে।
খাবারের পেছনে খরচের খতিয়ান দেখলেও পশ্চিমা বিশ্বের সাথে জাপানের আকাশ-পাতাল তফাত চোখে পড়ে। যেমন, মার্কিন নাগরিকরা তাদের খাদ্য বাজেটের প্রায় অনেকাংশে খরচ করে প্রক্রিয়াজাত জাঙ্ক ফুডের পেছনে, যার মধ্যে কেবল সোডা বা কোমল পানীয়র পেছনেই যায়স। বিপরীতে, জাপানিরা এই ধরনের অভ্যাস থেকে সম্পূর্ণ দূরে থাকে।
গরম পানিতে গোসল
জাপানিরা ঠান্ডা পানিতে গোসল করেন না। গরম পানিতে স্নান করলে শরীরে ‘হিট শক প্রোটিন’ তৈরি হয়। এই প্রোটিন মেদ ঝরার প্রক্রিয়াকে তরান্বিত করে।
‘হারা হাচি বু’ পন্থা
কখনো পেট ঠেসে খাবার খান না তারা। যখনই মনে হয় পেটের ৮০% ভরে গিয়েছে, তখন খাওয়া থামিয়ে দেন। জাপানি ভাষায় এই পন্থার নাম ‘হারা হাচি বু’। খাবার যতই লোভনীয় হোক না কেন, ঠিক সংযম বজায় রেখে চলেন তারা।
ব্যস্ত জীবনযাপন করেও নিয়মিত ব্যায়াম করে
ওজন কমাতে জাপানিদের আলাদা করে কোনো জিমে যাওয়ার প্রয়োজন পড়ে না। জাপানে গাড়ি রাখা বেশ ব্যয়সাপেক্ষ, একধরনের বিলাসিতা। ফলে কর্মস্থলে যাতায়াতের জন্য তাদের হাঁটতে হয়, সাইকেল চালাতে হয় কিংবা ট্রেনে চড়তে হয়। আর ট্রেনেও জায়গার অভাবে তারা দাঁড়িয়ে থাকে। ফলে সারা দিনে তারা অনেক হাঁটাহাঁটি ও দাঁড়িয়ে থাকে। দিনে যত বেশি সময় বসে কাটাবেন, আপনার আয়ুও তত কমবে। জাপানিরা যেহেতু বেশি হাঁটে ও দাঁড়িয়ে থাকে, তাই তারা দীর্ঘায়ু। তাছারা কোনো পরিকল্পিত জিম ছাড়াই স্বাভাবিক নিয়মে প্রতিদিন কিলোমিটারের পর কিলোমিটার হাঁটা বা সাইকেল চালানোর ফলে প্রাকৃতিকভাবেই তাদের শরীরের মেদ ঝরে যায়।
জাপানিদের এই জীবনধারা একটি চিরন্তন সত্যকেই সামনে আনে - স্থূলতা কিংবা ওজন বাড়ার পেছনে ‘ভাত’ মূল কারণ নয়। বরং খাবারের পরিমাপ নিয়ন্ত্রণ, প্রক্রিয়াজাত খাবার বর্জন এবং প্রাত্যহিক জীবনের ছোট ছোট শারীরিক সক্রিয়তাই সুস্থ ও স্লিম থাকার আসল মূলমন্ত্র।