অনেক পরিবারেই দেখা যায় পরপর তিন বা চারটি কন্যাসন্তানের জন্ম হয়েছে। এমন পরিস্থিতিতে অনেকেই ভুলভাবে মাকেই দায়ী করেন। তবে আধুনিক বিজ্ঞান বলছে, এই ধারণার কোনো বৈজ্ঞানিক ভিত্তি নেই। বরং কোনো পরিবারে পরপর কয়েকটি কন্যাসন্তান জন্ম নেওয়ার পেছনে কাজ করে সম্ভাব্যতার নিয়ম, বাবার জিনগত বৈশিষ্ট্য এবং কিছু জৈবিক কারণ।
বিজ্ঞানীদের মতে, প্রতিটি গর্ভধারণ একটি স্বতন্ত্র ঘটনা। অর্থাৎ আগের সন্তান মেয়ে হয়েছে বলে পরের সন্তান ছেলে হওয়ার সম্ভাবনা বেড়ে যায় না। পরিসংখ্যানের ভাষায় এই ভুল ধারণাকে বলা হয় “গ্যাম্বলারস ফ্যালাসি”। যেমন একটি কয়েন চারবার ছুড়ে পরপর চারবার একই পাশ ওঠা অসম্ভব নয়, তেমনি কাকতালীয়ভাবেই কোনো পরিবারে পরপর চারটি কন্যাসন্তান জন্ম নিতে পারে। এর পেছনে আলাদা কোনো রহস্য নাও থাকতে পারে, এটি সম্ভাব্যতারই স্বাভাবিক ফল।
মানুষের সন্তানের লিঙ্গ নির্ধারণে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে বাবার শুক্রাণু। মায়ের ডিম্বাণুতে সব সময় একটি X ক্রোমোজোম থাকে, অন্যদিকে বাবার শুক্রাণুতে থাকে X অথবা Y ক্রোমোজোম। X-বাহী শুক্রাণু ডিম্বাণুকে নিষিক্ত করলে কন্যাসন্তান (XX) এবং Y-বাহী শুক্রাণু নিষিক্ত করলে পুত্রসন্তান (XY) জন্মায়। অর্থাৎ সন্তানের লিঙ্গ নির্ধারণে মায়ের কোনো ভূমিকা নেই। তাই কন্যাসন্তান জন্মের জন্য মাকে দায়ী করারও কোনো বৈজ্ঞানিক ভিত্তি নেই।
গবেষকদের মতে, কিছু পরিবারে ছেলে বা মেয়ে সন্তান বেশি হওয়ার একটি বংশগত প্রবণতা থাকতে পারে। যুক্তরাজ্যের গবেষকেরা কয়েক শ বছরের পারিবারিক তথ্য বিশ্লেষণ করে দেখেছেন, কিছু পুরুষের জিনগত বৈশিষ্ট্য X ও Y ক্রোমোজোমবাহী শুক্রাণুর অনুপাতকে সামান্য প্রভাবিত করতে পারে। সাম্প্রতিক গবেষণাতেও এমন কিছু জিনগত ভ্যারিয়েন্টের সন্ধান পাওয়া গেছে, যা এই অনুপাতের সঙ্গে সম্পর্কিত হতে পারে। তবে এ বিষয়ে আরও গবেষণার প্রয়োজন রয়েছে।
এ ছাড়া X ও Y-বাহী শুক্রাণুর বৈশিষ্ট্যের পার্থক্যও কিছুটা প্রভাব ফেলতে পারে। X-বাহী শুক্রাণু তুলনামূলকভাবে কিছুটা বড়, ভারী ও ধীরগতির হলেও জরায়ুর পরিবেশে বেশি সময় টিকে থাকতে পারে। অন্যদিকে Y-বাহী শুক্রাণু দ্রুতগতির হলেও তুলনামূলকভাবে দ্রুত নষ্ট হয়ে যায়। ফলে মিলনের সময় এবং জরায়ুর ভেতরের পরিবেশের ওপর নির্ভর করে কন্যাসন্তান হওয়ার সম্ভাবনা কিছুটা বাড়তে পারে।
বাবার বয়স এবং জীবনযাত্রাও কিছু ক্ষেত্রে ভূমিকা রাখতে পারে। গবেষণায় দেখা গেছে, বয়স ৪০ থেকে ৫০ বছরের বেশি হলে Y-বাহী শুক্রাণুর সংখ্যা বা গুণগত মান কিছুটা কমে যেতে পারে। পাশাপাশি অতিরিক্ত ধূমপান, মানসিক চাপ বা ক্ষতিকর রাসায়নিকের সংস্পর্শেও Y-বাহী শুক্রাণু তুলনামূলক বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে। ফলে কন্যাসন্তান হওয়ার সম্ভাবনা সামান্য বৃদ্ধি পেতে পারে।
বিজ্ঞানীরা আরও বলছেন, গর্ভাবস্থার শুরুর দিকে কন্যা ভ্রূণ (XX) অনেক ক্ষেত্রে ছেলে ভ্রূণের (XY) তুলনায় বেশি সহনশীল হয়। মায়ের শরীরে সংক্রমণ, অপুষ্টি বা তীব্র মানসিক চাপ থাকলে ছেলে ভ্রূণের ক্ষতির ঝুঁকি তুলনামূলক বেশি হতে পারে। এ কারণেই দুর্যোগ বা দুর্ভিক্ষের পর কিছু এলাকায় কন্যাশিশুর জন্মহার সামান্য বেড়ে যাওয়ার তথ্য পাওয়া গেছে।
সব মিলিয়ে বিজ্ঞান বলছে, কোনো পরিবারে পরপর কয়েকটি কন্যাসন্তান জন্ম নেওয়া অস্বাভাবিক নয়। এর পেছনে সম্ভাব্যতার নিয়ম, বাবার জিনগত বৈশিষ্ট্য এবং কিছু জৈবিক কারণ ভূমিকা রাখতে পারে। তবে কন্যাসন্তান জন্মের জন্য মাকে দায়ী করার কোনো বৈজ্ঞানিক ভিত্তি নেই। তাই সমাজে প্রচলিত ভুল ধারণা থেকে বেরিয়ে এসে এ বিষয়ে বৈজ্ঞানিক তথ্যকে গুরুত্ব দেওয়ার পরামর্শ দিচ্ছেন বিশেষজ্ঞরা।
সূত্রঃ বিজ্ঞানচিন্তা