সকালে ঘুম ভাঙার জন্য এখন মোবাইল ফোনের অ্যালার্মই যথেষ্ট। নির্দিষ্ট সময় সেট করে দিলেই সময়মতো শব্দ করে জানিয়ে দেয় - উঠতে হবে। কিন্তু কয়েক’শ বছর আগে মানুষের হাতে ছিল না স্মার্টফোন, ছিল না সহজলভ্য অ্যালার্ম ঘড়িও। তাহলে প্রতিদিনের কাজের জন্য মানুষ ঠিক সময়ে ঘুম থেকে উঠতো কীভাবে?
ইতিহাসের দিকে তাকালে দেখা যায়, মানুষ বহু আগে থেকেই ঘুম থেকে ওঠার জন্য নানা উপায় বের করেছিল। কখনো সূর্যের আলো ও মোরগের ডাক ছিল ভরসা, কখনো বা গির্জার ঘণ্টা। আবার মোমবাতি ও পানির ঘড়ির মতো যন্ত্র ব্যবহার করে নির্দিষ্ট সময়ে শব্দ তৈরির ব্যবস্থাও করা হয়েছিল। আর শিল্পবিপ্লবের সময় তৈরি হয়েছিল এমন এক পেশা, যেখানে মানুষের কাজই ছিল অন্য মানুষকে ঘুম থেকে জাগানো।
সূর্যোদয় ছিল প্রাকৃতিক অ্যালার্ম
অ্যালার্ম ঘড়ি জনপ্রিয় হওয়ার অনেক আগে মানুষের দৈনন্দিন জীবন অনেকটাই পরিচালিত হতো প্রকৃতির ছন্দে। ভোরের আলো ছিল ঘুম থেকে ওঠার অন্যতম প্রধান সংকেত। সূর্যোদয় ও সূর্যাস্তের নিয়মিত পরিবর্তনের সঙ্গে মানুষের শরীরের সার্কাডিয়ান ছন্দও (দেহঘড়ি) ঘনিষ্ঠভাবে যুক্ত।
ঘুম ও জাগরণের সময় নির্ধারণে দুটি বিষয় গুরুত্বপূর্ণ - অভ্যন্তরীণ দেহঘড়ি এবং দিনের সঙ্গে সঙ্গে জমতে থাকা ঘুমের চাপ। এই দুই প্রক্রিয়াই কখন ঘুম আসবে এবং কখন ঘুম ভাঙবে, তা নিয়ন্ত্রণে ভূমিকা রাখে।
তবে অতীতের মানুষ যে শুধু সূর্যের আলো অনুসরণ করেই ঘুমাতেন, বিষয়টি এমন ছিল না। কাজের ধরন, ধর্মীয় আচার এবং প্রয়োজনের কারণে অনেক মানুষকে রাতেও কাজ করতে হতো। ফলে নির্দিষ্ট সময়ে জেগে ওঠার প্রয়োজন তখনও ছিল।
মোরগের ডাক থেকে গির্জার ঘণ্টা
ভোরের মোরগের ডাক ছিল মানুষের প্রাচীনতম প্রাকৃতিক অ্যালার্মগুলোর একটি। ভোরের সঙ্গে মোরগের ডাকের সম্পর্ক এতটাই পরিচিত যে বহু সমাজে এটিকে দিনের শুরুর সংকেত হিসেবে ধরা হতো। মজার বিষয় হলো, গবেষণায় দেখা গেছে, মোরগ শুধু সূর্যের আলো দেখে ডাকে না; তার নিজের শরীরের সার্কাডিয়ান ছন্দ বা দেহঘড়ি ভূমিকা রাখে।
শুধু মোরগ নয়, ঘণ্টার শব্দও ছিল সময় জানানোর গুরুত্বপূর্ণ মাধ্যম। মধ্যযুগীয় ও প্রাক-আধুনিক ইউরোপের অনেক এলাকায় গির্জার ঘণ্টা নির্দিষ্ট সময়ে বাজানো হতো। সেই শব্দের মাধ্যমে মানুষ দিনের বিভিন্ন কাজের সময় সম্পর্কে ধারণা পেত।
কিছু বাড়িতে আবার শোবার ঘরের কাছেও ঘণ্টি থাকত। বাড়ির কর্মচারীরা সাধারণত সবার আগে জেগে উঠতেন এবং নির্দিষ্ট সময়ে পরিবারের কর্তা ও অন্য সদস্যদের জাগিয়ে দিতেন।
মোমবাতির আগুনেই মিলতো ঘুম ভাঙার সংকেত
প্রাচীন মানুষের সময় মাপার কৌশল ছিল বেশ চমকপ্রদ। মোমবাতিকে শুধু আলো দেওয়ার কাজে নয়, সময় নির্ধারণের কাজেও ব্যবহার করা হতো। প্রাচীন চীনে নির্দিষ্ট ব্যবধানে চিহ্ন দেওয়া মোমবাতি ব্যবহার করা হতো। মোম গলে নির্দিষ্ট পর্যায়ে পৌঁছালে একটি ছোট ধাতব পিন পড়ে নিচের ধাতব পাত্রে শব্দ তৈরি করত। সেই শব্দ নির্দিষ্ট সময়ের সংকেত হিসেবে কাজ করতো - এমনকি কাউকে ঘুম থেকে জাগাতেও এটি ব্যবহার করা সম্ভব ছিল। ধূপের ঘড়িতেও ছিল একই ধরনের বুদ্ধিদীপ্ত ব্যবস্থা। কখনো সুতোয় ঝোলানো ধাতব বল ব্যবহার করা হতো। ধূপের আগুনে সুতো পুড়ে গেলে বলটি নিচের ধাতব পাত্রে পড়ে শব্দ করত। ফলে নির্দিষ্ট সময় পার হওয়ার বিষয়টি শব্দের মাধ্যমে বোঝা যেত।
পানির ঘড়িও পারতো ‘অ্যালার্ম’ বাজাতে
সময় মাপার আরেকটি পুরোনো প্রযুক্তি ছিল পানির ঘড়ি। প্রাচীন গ্রিসে ব্যবহৃত ‘ক্লেপসিড্রা’ নামে পরিচিত এই যন্ত্রে পানির প্রবাহের মাধ্যমে সময় হিসাব করা হতো। পরে পানির ঘড়িকে অ্যালার্ম হিসেবেও ব্যবহার করা হয়। একটি পাত্রে পানি জমতে জমতে চাপ তৈরি হলে তা থেকে জোরালো, শিসের মতো শব্দ তৈরি হতো। অর্থাৎ কয়েক হাজার বছর আগেই মানুষ এমন ব্যবস্থা তৈরি করেছিল, যেখানে সময়ের সঙ্গে সঙ্গে স্বয়ংক্রিয়ভাবে একটি শব্দ তৈরি হতো। পরবর্তীতে যান্ত্রিক ঘড়ির উন্নতির সঙ্গে এই প্রযুক্তি আরও এগোয়। পঞ্চদশ শতকের শেষদিকে ঘরোয়া দেয়ালঘড়িতেও অ্যালার্মের ব্যবস্থা দেখা যায়।
‘নকার আপার’
শিল্পবিপ্লব মানুষের জীবনযাত্রায় বড় পরিবর্তন আনে। কারখানায় কাজ শুরু করার নির্দিষ্ট সময় তৈরি হয়। একজন শ্রমিক কয়েক মিনিট দেরি করলেও কখনো পুরো উৎপাদন ব্যবস্থায় সমস্যা তৈরি হয়ে যেত। কিন্তু সমস্যা ছিল, সেই সময়ের অ্যালার্ম ঘড়ি সাধারণ শ্রমিকদের জন্য সহজলভ্য ছিল না। এগুলো ছিল ব্যয়বহুল এবং সবসময় নির্ভরযোগ্যও ছিল না। তাই ব্রিটেনের শিল্পাঞ্চলে তৈরি হয় ‘নকার আপার’ নামের একটি অদ্ভুত পেশা।
নকার আপাররা ভোররাতে রাস্তায় বেরিয়ে পড়তেন। লম্বা লাঠি দিয়ে বাড়ির জানালায় টোকা দিতেন। কেউ কেউ ছোট পাইপের সাহায্যে জানালায় মটরশুঁটি ছুড়ে মানুষকে জাগাতেন। গ্রাহক ঘুম থেকে উঠেছেন - এমন কোনো সাড়া না পাওয়া পর্যন্ত তারা সেখান থেকে সরে যেতেন না।
লিডস, ম্যানচেস্টার, শেফিল্ডসহ শিল্পাঞ্চল এবং পূর্ব লন্ডনে এই পেশা বেশ জনপ্রিয় হয়ে ওঠে। অনেক নকার আপার রাত জেগে কাজ করতেন এবং ভোর ৩টা থেকেই মানুষকে জাগানোর কাজ শুরু করতেন।
নকার আপারদের কাজ শুধু মানুষকে ঘুম থেকে তোলা পর্যন্ত সীমাবদ্ধ ছিল না। তারা রাতের শহরে ঘুরে বেড়ানোর কারণে অনেক সময় এমন ঘটনাও দেখতে পেতেন, যা অন্যরা ঘুমিয়ে থাকার কারণে টের পেতেন না। ১৮৭৬ সালে ব্র্যাডফোর্ডে একটি বাড়িতে আগুন লাগার ঘটনা একজন নকার আপার রাত ২টার দিকে দেখতে পান। তিনি ঘুমন্ত পরিবারটিকে জাগিয়ে দেন এবং তাদের জীবন রক্ষা করতে সহায়তা করেন।
তবে তাদের এই জাগানোর পদ্ধতি বিরক্তির কারণও ছিল। কখনো এত জোরে বা দীর্ঘ সময় ধরে জানালায় টোকা দেওয়া হতো যে আশপাশের প্রতিবেশীদের ঘুমও ভেঙে যেত। এ নিয়ে প্রতিবেশীদের মধ্যে ঝগড়ার ঘটনাও ঘটেছে।
উনিশ শতকের শেষভাগ থেকে অ্যালার্ম ঘড়ি ধীরে ধীরে সাধারণ মানুষের নাগালে আসতে শুরু করে। শিল্পায়ন এবং কৃত্রিম আলোর বিস্তারের সঙ্গে মানুষের দৈনন্দিন জীবন আরও বেশি ঘড়িনির্ভর হয়ে ওঠে। ফলে মানুষের দরজায় কড়া নাড়ে জাগানোর প্রয়োজন কমে যায়। ১৯২০-এর দশকে ‘নকার আপার’ পেশাটি প্রায় বিলুপ্ত হয়ে যায়।