জনশুমারি বলছে, কোটি মানুষের শহর ঢাকায় প্রায় ১১%-এর বসবাস বস্তিতে। খেয়ে-পরে বেঁচে থাকার তাগিদে রাজধানীর বুকে ঠাঁই খুঁজতে গিয়ে তাদের আশ্রয় হয়েছিল এক চিলতে ঘরে। এসব মানুষের দ্বিতীয় প্রজন্মের অনেকেই এখন শিক্ষার আলোয় আলোকিত। হয়েছেন সফল, করছেন ভালো চাকরিও।
তবে এই পথচলার শুরুটা মোটেই মসৃণ ছিল না। বারবার আত্ম-পরিচয়, সামাজিক অবস্থান সবক্ষেত্রে মুখ্য হয়ে উঠেছে। তাই পরিচয় লুকিয়ে, ঠিকানা গোপন করেই তারা মিশেছেন সমাজের মূলধারায়।
রবিন আলী (ছদ্মনাম) রাজধানীর অন্যতম সেরা শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান নটরডেম কলেজ থেকে উচ্চমাধ্যমিক শেষ করেছেন। আর ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের রাষ্ট্রবিজ্ঞান বিভাগ থেকে সম্পন্ন করেছেন স্নাতক। পড়াশোনা শেষে এখন একটি ভালো কর্পোরেট প্রতিষ্ঠানে চাকরিও করছেন। ব্যক্তিগত জীবনে মোটামুটি সফল রবিনের বেড়ে ওঠাটা রাজধানীর কল্যাণপুর বস্তিতে; যেখানে তার শৈশব কেটেছে বেশ কষ্টে। স্মৃতির মানসপটে সেই কষ্টের দিনগুলোর দুঃসহ স্মৃতি এখনও বয়ে বেড়ান তিনি।
দীর্ঘ সংগ্রামে সফল হলেও রবিনের আসল ঠিকানা গোপন করেই তাকে আজকের অবস্থানে আসতে হয়েছে।
“আদিবাড়ি বগুড়ার সারিয়াকান্দিতে। নদীতে ঘরবাড়ি হারিয়ে বাবা-মা ঢাকায় এসেছিলেন কাজের সন্ধানে। থাকতাম কল্যাণপুর বস্তিতে। আমার বয়স যখন ছয়, তখন বাবা মারা গেলেন,” নিজের জীবনসংগ্রামের কথা এই প্রতিবেদকের কাছে এভাবেই বলছিলেন তিনি।
এরপর রবিনকে নিয়ে মা হাসনা বেগমের (ছদ্মনাম) নতুন সংগ্রাম শুরু হয়। কখনও ভিক্ষা করে, কখনও কাগজ-প্লাস্টিক কুড়িয়ে, মানুষের বাড়িতে গৃহকর্মীর কাজ করে ছেলের পড়াশোনার খরচ জোগাড় করেছেন। মেধাবী ছেলে রবিন আর্থিকভাবে সমর্থ্যবান হলে সরে আসেন বস্তি থেকে। ফ্ল্যাট বাড়ি ভাড়া নেন নিকটবর্তী আবাসিক এলাকাতে। বিয়ে দেন ছেলের। এখন মোটামুটি সুখেই আছেন ছেলে আর তার বউয়ের নতুন সংসার নিয়ে।
তবে সবাই হাসনা বেগম বা রবিনের জীবনসংগ্রামের শুরুর দিকের গল্পটুকু জানেন না। তারাও ওই পরিচয়টুকু বলতে চান না কাউকেই। কেন গোপন করেন, এমন প্রশ্নে রবিন বেশ স্মৃতিকাতর হয়ে পড়েন। জানালেন সেই দুঃসহ গল্প, “মা ভালো স্কুলে পড়াতে চাইতেন। আমাদের ভাগ্য একদিন পরিবর্তন হবে, এমনটা বিশ্বাস রাখতেন। কিন্তু বস্তিতে থাকি, এই পরিচয় গোপন না করলে স্কুলেই ভর্তি নিচ্ছিল না। স্যাররা বলতেন, বস্তির ছেলে-মেয়েরা এই স্কুলে পড়ে এটা অন্য অভিভাবকরা জানলে তাদের সন্তানকেও পড়তে দেবেন না। স্কুলেরও দুর্নাম হবে।”
তিনি বলেন, “শিক্ষকদেরও এজন্য দোষ দেয়া যায় না। কারণ, তাদেরও স্কুলটা চালাতে হয়। অন্য শিক্ষার্থীর অভিভাবকরা মনে করেন, বস্তির ছেলেদের সঙ্গে পড়াশোনা করলে তাদের ছেলে-মেয়েরা বখে যাবে। ফলে স্কুলের শিক্ষকরাও আমাদের ভর্তি নিতে চাইতেন না। আসলে ভালো কিছু করতে গেলে- আমি বস্তিবাসী-এই পরিচয়টাই আমাদের জন্য লজ্জার হয়ে দাড়িয়েছে বারবার।”
“শুধু কি তাই? বন্ধুদেরও তো বলা যায় না যে আমি বস্তিতে থাকি, স্বচ্ছল পরিবারের ছেলে-মেয়েরা মিশতে চাইত না। অথচ আমি আর দশটা ছেলের মতো পড়তে চেয়েছি, সফল হতে চেয়েছি জীবনে। কিন্তু প্রতিনিয়ত আমার সামনে আমার বাসস্থানের পরিচয় বড় হয়ে উঠেছে। এমনি এমনি তো পরিচয় গোপন করিনি।”
তবে আক্ষেপের সুরে রবিন বলেন, “এলাকার এক বড় ভাইয়ের সহায়তায় আমি আমার শিক্ষাজীবন ভালো প্রতিষ্ঠানেই সম্পন্ন করতে পারলেও আমার বেশিরভাগ বন্ধুই তা পারেনি।”
রবিনের মতো বস্তিতে থাকা এমন অনেক তরুণই আছেন, যারা শিক্ষাজীবন শেষ করেছেন পরিচয় গোপন করে। তাদের কয়েকজনের সঙ্গে কথা বলেও এর সত্যতা মিলেছে। জানা গেছে, নিকটবর্তী আবাসিক এলাকার বাসার ঠিকানায় তারা ভালো স্কুলে ভর্তি হন। সঠিক তথ্য দিলে ভালো স্কুল হিসেবে পরিচিত শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলো তাদের ভর্তি করে না। এজন্য জাতীয় পরিচয়পত্রেও (এনআইডি কার্ড) বস্তির ঠিকানা গোপন করা হয়।
কড়াইল বস্তিতে কথা হয় সরকারি তিতুমীর কলেজ থেকে স্নাতক শেষ করা সোহান আখতারের সঙ্গে। তিনিও জানালেন অনেকটা একইরকম গল্প।
সোহান বলেন, “পড়াশোনা তো কোনোমতে শেষ করেছি। এখন চাকরি খুঁজছি পরিচয় গোপন করে। কারণ বস্তিতে থাকি, এই পরিচয় জানলে আমি যতই ভালো ইন্টারভিউ দিই না কেন, শুরুতেই তালিকা থেকে নাম কেটে দেবে। মানুষের মধ্যে ধারণাই হচ্ছে, বস্তির লোক ভালো না।”
পল্লবী এলাকার এক বস্তির তরুণী সুমাইয়া আকতার কাজ করছেন একটি বিউটি পার্লারে। তবে সেখানেও তিনি কাজ করেন পরিচয় গোপন করে। তার আক্ষেপ, “কাজের বেলায় আমাদের লাগে, কিন্তু অধিকার চাইতে গেলে আমরা ‘অবৈধ' আখ্যা পাই, এটা কোনোভাবেই মানবিক না। আমি একটা মানুষ এটাই তো বড় পরিচয়। অথচ ভালো জায়গায়, ভালো পরিবেশে যেতে গেলে সবাই আটকে দেয়ার জন্য উঠে পড়ে লাগে।”
সবশেষ ২০২২ সালের জনশুমারীর তথ্য বলছে, ১ কোটি ২ লাখেরও বেশি মানুষের ঢাকা শহরে ৮ লাখ ৮৪ হাজার মানুষের বসবাস বস্তি এলাকায়। বিশ্বব্যাংক বলছে, টেকসই উন্নয়ন লক্ষ্যমাত্রা (এসডিজি) বাস্তবায়ন করতে হলে বাংলাদেশকে ২০৩০ সালের মধ্যে ৯০% মানুষকে সামাজিক নিরাপত্তার আওতায় নিয়ে আসতে হবে।
দীর্ঘদিন ধরে বস্তিবাসীদের অধিকার নিয়ে কাজ করে আসছে নগর দরিদ্র বস্তিবাসীর উন্নয়ন সংস্থা (এনডিবাস)। এই প্রতিষ্ঠানের কর্মকর্তা আন্জুমানারা বেগম তরুণদের এই পরিচয় সংকটের জন্য সামাজিক দৃষ্টিভঙ্গিকেই দায়ী করলেন। তার দাবি, “বস্তি এলাকার তরুণদের অর্থনৈতিক নিরাপত্তা নিশ্চিতের সঙ্গে সঙ্গে সামাজিক নিরাপত্তা নিশ্চিতকরণ জরুরি। সেটা সম্ভব না হলে বিপাকে পড়বে রাষ্ট্রই।”
বস্তিবাসী তরুণদের এই আত্ম-পরিচয়ের সংকট নিয়ে কথা হয় জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালের অর্থনীতি বিভাগের শিক্ষক ইশতিয়াক রায়হানের সঙ্গে। তিনি বলেন, “বস্তি সৃষ্টি হয়েছিল কাজের সন্ধানে ঢাকায় আসা নিম্নবিত্ত পরিবারের মানুষগুলোর জন্য। কেউ নদী ভাঙনের কারণে, কেউ কাজের সন্ধানে এসে এসব বস্তিতে আশ্রয় নিয়ে কম টাকায় থাকা শুরু করেন। ফলে শুরু থেকেই তাদের নিয়ে মানুষের একটা নেতিবাচক দৃষ্টিভঙ্গি বিরাজমান।”
তিনি আরও বলেন, “এই দৃষ্টিভঙ্গির পেছনে অর্থনৈতিক কারণ অনেক বেশি। এটা থেকে বের হতে হলে আমাদের সামাজিক নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে হবে। দৃষ্টিভঙ্গিও বদলাতে কাজ করতে হবে সবাইকেই। কারণ সবাইকে নিয়েই সমাজ । বস্তিবাসী তরুণদের মূল ধারা থেকে বের করে রেখে উন্নয়ন সম্ভব নয়। বাস্তবে বস্তিবাসীর সামাজিক নিরাপত্তা নিশ্চিত না হলে দেশের উন্নয়ন অধরায় থেকে যাবে।”
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের রাষ্ট্রবিজ্ঞান বিভাগের শিক্ষক ড. শান্তনু মজুমদারও বললেন অনেকটা একইরকম কথা। তার দাবি, “রাষ্ট্র যেমন মৌলিক অধিকার দিতে বাধ্য, তেমনি সামাজিক অধিকারও নিশ্চিত করতে বাধ্য।”
তিনি বলেন, “বস্তিবাসীর তরুণরাও আমাদের সম্পদ। তাদেরও দক্ষতা আছে, পরিচয় আছে। রাষ্ট্রের সকল সুযোগ সুবিধা ও মূলধারায় বেড়ে ওঠার অধিকার তাদের রয়েছে। এই সামাজিক পরিচয় নিশ্চিত করতে রাষ্ট্র প্রয়োজনীয় কাজ করতে বাধ্য। বাংলাদেশকে কল্যাণ রাষ্ট্র বানাতে হলে অবশ্যই নিম্নবিত্তের সামাজিক নিরাপত্তা- সামাজিক পরিচয়-স্বাভাবিক বেড়ে ওঠার সুযোগ নিশ্চিত করতেই হবে। মনে রাখতে হবে, বস্তিবাসীর তরুণ জনগোষ্ঠীকে পিছিয়ে রেখে কোনো সমাজ বা দেশ এগোতে পারবে না।”
সামাজিক নিরাপত্তা নিয়ে সমাজসেবা অধিদপ্তরের উপ-সচিব (সামাজিক নিরাপত্তা) মুহাম্মদ শাখীর আহম্মদ চৌধুরী বলেন, “এটা আমার নোটসে রইল। বস্তির বাসিন্দাদের সমাজের মূলধারার সঙ্গে মেশাতে আমরা কিছু কাজ হাতে নিয়েছি। এ অবস্থা উন্নয়নে যত দ্রুত সম্ভব আমরা উদ্যোগ নিচ্ছি।”