চা’য়ে চা’য়ে বিপ্লব

চা! ইতিহাসে না গিয়ে আমরা কেবল এই পানীয়টির উপযোগিতা, বিচরণ আর একে ঘিরে গল্প-গান-আড্ডার কথা ভাবি। লাল চা, আদা চা, দুধ চা থেকে চা এখন জেসমিনের ফ্লেভার দিয়েও হয়। তবে রাস্তার পাশে দাঁড়িয়ে চোখ বুঁজে চায়ের কাপে চুমুকের সংজ্ঞা সম্ভবত একটিই, “আহ!”

এই চায়ের কাপে ঝড় ওঠে, শান্ত হয়। বিপ্লবও কি হয়? সম্ভবত হয়। অন্তত একজন মানুষের এমন প্রয়াস চোখে পড়ে বায়ান্ন শ' বাজার, তিপ্পান্ন শ' গলির শহর ঢাকায়।

ইয়াসিন স্বপন নামের মানুষটি ঢাকার শান্তিনগর এলাকায় চায়ের দোকান করেন। দোকানের নাম “বিপ্লবীদের চা”। নামেই কেমন একটা রাজনীতির গন্ধ। বামপন্থী রাজনীতির নস্টালজিয়া!

কেন এই নাম? কে এই ইয়াসিন স্বপন

এই দুটি প্রশ্নের উত্তর জানার আগে জেনে রাখা ভালো, “বিপ্লবীদের চা” কেবল ভালো মানুষদের জন্য। তাই এই দোকানের ক্রেতাও সীমিত। সবাই ব্যবসার পরিধি বাড়ায়, তিনি কমিয়েছেন। একসময় দৈনিক ১,২০০ কাপের জায়গায় এখন ইয়াসিন স্বপনের দৈনিক বিক্রি ৩০০ কাপ চা।

স্বপন মনে করেন মাতৃগর্ভ থেকে মানুষের বিপ্লবের শুরু। রাজনীতি সচেতন এই মানুষটির পোড় খাওয়া জীবনের গল্প দীর্ঘ।

তিনি বলেন, জীবন বাঁচাতে গিয়ে যখন যা করা দরকার তাই করছি। কখনো কুলিগিরি করেছি, জুতা সেলাই করেছি, কখনো কাগজ টোকাইছি, কখনো ক্ষুধা পেটেই ভ্যান গাড়ি চালাইছি। কখনো সিএনজি চালাইছি, ৬ নম্বর বাস চালাইছি।

চায়ের দোকানের শুরুটা ২০০৭ সালে। স্বপনের ভাষায়, “ওই সময় আমার পেশা ছিল ড্রাইভিং। আমার নিজের কিছু একটা করার স্বপ্ন ছিল। আচমকা চিনি, চা, দুধ নিয়ে বসে পড়া। পাশের দোকান থেকে একটা কেটলি এনে তিন লিটার দুধ নিয়ে জ্বাল দিয়ে দিয়ে চা বানাই।”

“মানুষ খেলো। মানুষ প্রশংসা করলো। আরও দুই লিটার দুধের চা বানালাম সেদিন। প্রথম দিনেই বাজিমাৎ। উৎসাহ পেলাম। পকেটে কিছু টাকাও এলো। ৩০-৩৫ বছর ধরে কিছু একটা করার সাধনা সফল হলো। এই শুরু। তারপর মানুষের উৎসাহ-উদ্দীপনা। এভাবেই এই বিপ্লবীদের চা।”

মজার ছলে পুরোনো স্মৃতি হাতড়ে তিনি বললেন, ‍“ব্যবসা নিয়মিত করার কথা ভাবলাম। স্ত্রী সায় দিলেন না। একদিন তার ডেকচিই চুরি করে এনে দোকানে বসালাম।”

‌‘আমরা তাদের কমিউনিস্ট বলি'

কমিউনিস্ট রাজনীতিতে পথচলার গল্প শোনালেন স্বপন, “এক লোক আমাকে পিটুনি দিচ্ছে। অবৈধভাবে আমার দোকান ভেঙে ফেলছে। শত মানুষের ভিড়ে আমার পক্ষে একজন প্রতিবাদ করলেন। তখন বিপ্লবীরা, কমিউনিস্ট পার্টির নেতা মঞ্জুরুল আহসান খান প্রতিবাদ করলেন, পাশে দাঁড়ালেন।”

“চিনলাম এরা তো বিপ্লবী মানুষ। পরে তো কমিউনিস্ট পার্টি চিনলাম। সবাইকে চিনলাম। আমার ধারণা, পৃথিবীর যে প্রান্তে মানুষ বসবাস করে সেখানেই অত্যাচার সৃষ্টি হয়, শোষণ সৃষ্টি হয়। আবার সেখানেই প্রতিবাদকারীরা জন্ম নেন। এই প্রতিবাদকারীদের আমরা বলি কমিউনিস্ট। বিপ্লব আমি মাতৃগর্ভে করে এসেছি। মাতৃগর্ভে কোটি কোটি ভ্রুণকে পেছনে ফেলে একাই লড়াই করে জয়ী হয়েছি এবং পৃথিবীতে চলে এসেছি। রক্তে যদি বিপ্লব থাকে, ওটাকে হয়তো ধামাচাপা দেওয়া যায় না। আমার মা বিপ্লবী ছিলেন।”

বাম কিংবা ডানপন্থী। বাংলাদেশের রাজনৈতিক অঙ্গনে লাল (র) চায়ের একটা আবেদন আছে। দোকানে কেন লাল চা বিক্রি করেন না জানতে চাইলে স্বপন বলেন, ‍“চাহিদার সাপেক্ষে অনেক কিছুই সংস্কারের প্রয়োজন হয়। চায়েরও তেমনি সংস্কারের প্রয়োজন।”

আজীবন সংগ্রামী মানুষটি এখন ক্লান্ত। তাই একসময় ১,২০০ কাপ চা থেকে কমিয়ে দৈনিক এখন ৩০০ কাপ চা বিক্রি করেন। তবে তার মতে, প্রতিটি কাপ ওঠে একেকজন ভালো মানুষের হাতে। এই বিপ্লবীদের চা সারাদেশে ছড়িয়ে দেওয়ার স্বপ্ন দেখেন স্বপন।

ক্রেতারা সন্তুষ্ট

স্বপনের এক নিয়মিত গ্রাহকের সঙ্গে কথা হয় ঢাকা ট্রিবিউনের। তিনি একজন অবসরপ্রাপ্ত প্রকৌশলী। সাত-আট বছর ধরে এই দোকানে আসেন। দোকানে টাঙানো চে গুয়েভারা-ফিদেল ক্যাস্ট্রোর ছবি দেখিয়ে বললেন, “এসব ভদ্রলোকরে ছবি তো আজকাল চায়ের দোকানে দেখা যায় না।”

“ওনার চা চমৎকার, ব্যবহার ভালো, রুচিশীল মানুষ। তাই তার কাছেই আসি হেঁটে হেঁটে।”

একই ধরনের সন্তুষ্টির কথা বলেছেন আরও অনেক ক্রেতা।