আমাদের সমাজে নারী ও পুরুষদের নিয়ে যেসব মিথ রয়েছে, তার মধ্যে অন্যতম হলো- নারীবাদ লিঙ্গ-পার্থক্য অস্বীকার করতে চায়। কিন্তু, এর কতটা সত্য? চলুন, জেনে নেওয়া যাক সে সম্পর্কে-
মিথ: নারীবাদ লিঙ্গ-পার্থক্য অস্বীকার করতে চায়
সারসংক্ষেপ: নারীবাদ বৃহত্তর অর্থে সর্বসাধারণের ন্যায্য অধিকার, জীবন ও শ্রমের অধিকার এবং সর্বোপরি, লিঙ্গ নির্বিশেষে সকলের জন্য বৈষম্যহীন মানবাধিকার প্রতিষ্ঠার কথা বলে।
বাস্তবতা: আক্ষরিক অর্থে, নারীবাদ মানবতাবাদের বহির্ভূত কিছু নয়। এই যাত্রার অভ্যুত্থানই ঘটেছে নারীদের সামাজিক, রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক সমঅধিকার প্রতিষ্ঠার লক্ষ্যে। লিঙ্গের বিচারে সকল প্রকার বৈষম্য ও অবমাননা থেকে মুক্ত হয়ে সমতার অধিকারবোধ থেকেই এই আন্দোলনের সূত্রপাত ঘটেছিল। ফলে যেকোনো ‘অসমতা'র পরিপ্রেক্ষিতে নারীবাদ সমতা প্রতিষ্ঠার কথা বলে। তবে এই অসমতার ব্যাপ্তি কতটুকু? এই অসমতা কি কেবলই নারীর ওপর পুরুষের কর্তৃত্বের অসমতা? অন্যদিকে, যেই সমতার কথা বলা হচ্ছে, এই সমতা কি কেবল সামাজিক প্রাঙ্গণ পর্যন্ত নাকি এর বিস্তৃত আরও বহুদূর? স্পষ্টত, নারীবাদ যখন সমঅধিকার নিয়ে কথা বলে এটি কেবলই নারীর অধিকার পর্যন্ত সীমাবদ্ধ থাকে না। এই সমঅধিকার প্রকৃত অর্থে আমাদের শ্রমিকের অধিকার, সংখ্যালঘুর অধিকার, মানুষের অধিকার। অর্থাৎ এটি মানবাধিকারেরই ভিন্ন ভিন্ন রূপমাত্র। কেননা শ্রমের অধিকার প্রতিষ্ঠিত হলেই শ্রমিক ন্যায্যতা পাবে, এতে স্বয়ংক্রিয়ভাবেই নারীর অধিকার প্রতিষ্ঠিত হয়ে যাবে। এজন্যই নারী অধিকার ও মানবাধিকার পরস্পরের সাথে ওতোপ্রোতোভাবে জড়িত।
কিন্তু নারীবাদীতা নিয়ে আমাদের সমাজে একধরনের অচ্ছুত ভাব বিদ্যমান। বিশ্বের জনসংখ্যার মাত্র ২৬% মানুষ "নারীবাদ"কে একটি ইতিবাচক শব্দ হিসেবে বিশ্বাস করেন। পুরুষদের প্রায় এক-তৃতীয়াংশ বিশ্বাস করেন যে নারীবাদ ভালোর চেয়ে ক্ষতিই বেশি করে। তার মধ্যে একটি কারণ হচ্ছে, একে ‘পশ্চিমা জ্ঞান’ মনে করে একে সামাজিকভাবে ক্ষতিকর দাবি করা। আবার আরেকটি ভ্রান্ত ধারণা হলো— নারীবাদ লিঙ্গ পার্থক্য ঘুচিয়ে নারী-পুরুষকে ‘এক’ করতে চায়। যেমন, নারীরা শার্ট-প্যান্ট পড়বে, চুল ছোট রাখবে, সিগারেট খাবে; আবার নারীবাদীরা পুরুষ বিদ্বেষী ও পরিবার বিদ্বেষী ইত্যাদি। এসব কারণবশত, আমাদের সমাজে নারীবাদকে নিয়ে নেতিবাচক ধারণা প্রদশর্ন করা হয়। একথা ঠিক যে, এই সমতা আদায়ের দীর্ঘ সংগ্রামের সূচনা ও এর বিভিন্ন ধাপের বিকাশ ঘটে পশ্চিমা সমাজেই। তাই অনেক সময় সেটার সাথে মিলিয়ে ফেলতেও এটি নিয়ে নেতিবাচক ধারণা তৈরি হয়। অন্যদিকে, যারা এই দীর্ঘ সংগ্রামী চেতনার মর্মার্থ পরখ না করেই, কেবল ভাসাভাসা জ্ঞানের বলে নারীবাদকে ভুলভাবে প্রচার করে, তারাই প্রকৃতপক্ষে সম্পূর্ণ ধারণাটিকে জলঘোলা করে। কিন্তু, এই ভুল প্রচারণা ও ভ্রান্ত বিশ্বাসের কারণে নারীবাদের মূল উদ্দেশ্য ও কার্যক্রম না বুঝে একে বাতিলের ঘরে ফেলে দেওয়াও ভুল।
নারীবাদ আসলে কী?
আমেরিকান নারীদের নিয়ে ২০২০ সালে পিউ রিসার্চ সেন্টারে একটি সমীক্ষা হয় যেখানে দেখা যায়, অংশগ্রহণকারীদের মধ্যে ৬১ শতাংশ নারীই মনে করেন "নারীবাদ" এই শব্দটি পরিষ্কারভাবে এর অর্থ ও পরিচয় বহন করে না। তাহলে ‘নারীবাদ’ প্রকৃতপক্ষে কী অর্থ বহন করে? এর একটি সহজ ও সাবলীল উত্তর হচ্ছে — লিঙ্গ আধিপত্য ও লিঙ্গ বৈষম্যকে নির্দ্বিধায় প্রশ্ন করতে পারা। বিভিন্ন তত্ত্ব ও সংজ্ঞায় নারীবাদকে বিভিন্নভাবে সংজ্ঞায়িত করা হলেও, প্রত্যেকেরই মর্মার্থ ঘুরেফিরে এক। Oxford English Dictionary অনুসারে নারীবাদ হল "লিঙ্গ সমতার প্রচারণা এবং নারীর রাজনৈতিক, সামাজিক এবং অর্থনৈতিক অধিকার প্রতিষ্ঠা"। নারীবাদ নিয়ে এরূপ অসংখ্য আভিধানিক সনজ্ঞা আছে যার সবক’টির সারাংশ এক— লিঙ্গ সমতার ভিত্তিতে নারীর অধিকারের প্রচারণা"। কিন্তু বাস্তবিকপক্ষে, যারা প্রকৃতপক্ষে নারীবাদের আদর্শ সম্পর্কে অবহিত তাদের লক্ষ্য শুধু নারীর অধিকার পর্যন্তই সীমিত থাকেনা। কিংবা, তাদের আন্দোলনও কোনো বিশেষ শ্রেণীর নারীদের জন্য সীমাবদ্ধ থাকেনা। নারীবাদ চায় ন্যায়পরায়ণতার অধিকার। এবং এই অধিকার যেন জাতি, ধর্ম, বর্ণ এমনকি ভিন্ন লিঙ্গ পরিচয়, রাজনৈতিক বিশ্বাস, জাতীয়তার কারণেও যেন কারো এই অধিকার ক্ষুণ্ণ হতে না পারে নারীবাদ সেটিই সুনিশ্চিত করতে চায়।
প্রকৃতপক্ষে, পুরুষতান্ত্রিকতার খাঁচা থেকে নারীকে মুক্ত করার প্রয়াসের নামই নারীবাদ। কারণ পুরুষতন্ত্র চায় না লিঙ্গসমতা আসুক। কেননা পুরুষতান্ত্রিক সমাজব্যবস্থা লিঙ্গ আধিপত্যের উপরই প্রতিষ্ঠিত। লিঙ্গ বৈষম্যই পুরুষতান্ত্রিক সমাজের মূল চালিকাশক্তি। নারীবাদ চায় পুরুষতান্ত্রিক ক্ষমতার জোর থাবা থেকে মুক্তি পাবে লিঙ্গ নির্বিশেষে সকলেই। যেহেতু, পুরুষতন্ত্র লিঙ্গসমতা বিদ্বেষী। অতঃপর, নারীবাদ এই পুরুষতন্ত্র বিরোধী। কিন্তু আমাদের পুরুষতান্ত্রিক সমাজে নারীবাদকে পুরুষতন্ত্রবিদ্বেষী দেখানোর পরিবর্তে পুরুষ বিদ্বেষী হিসেবে দেখিয়ে বিভেদ সৃষ্টির চেষ্টা করা হয়।
একটি প্রশ্ন উঠতে পারে— নারীবাদ যদি পুরুষতন্ত্র বিরোধী হয় এবং পুরুষ বিরোধী না হয়, তাহলে কেন নারীবাদীরা প্রায়শই পুরুষদের এবং তাদের কর্মের সমালোচনা করে? এর উত্তর সহজ। যেহেতু পিতৃতন্ত্র স্বয়ংক্রিয়ভাবে পুরুষদেরকে নারীর চেয়ে উচ্চতর অবস্থানে অধিষ্ঠিত করে, অগণিত পুরুষ অনাদিকাল থেকে, জ্ঞাতসারে বা অজ্ঞাতসারে নারীদের নিপীড়ন করেছে, তাদের সাফল্যের পথে বাধা ও প্রতিবন্ধকতা তৈরি করেছে। যেহেতু পিতৃতন্ত্র এবং অনেক পুরুষের ক্রিয়াকলাপ (নারী এবং পুরুষরা বিষাক্ত লিঙ্গ ভূমিকা মেনে চলতে অস্বীকার করে) প্রায়শই একে অপরের সাথে জড়িত, প্রশ্নে সমাজ ব্যবস্থার সমালোচনা করার সময় নির্দিষ্ট পুরুষদের সমালোচনা না করা কঠিন।
বাংলাদেশে জন্য নারীবাদ ইস্যুটি ভীষণ গুরুত্বপূর্ণ। কারণ, বাংলাদেশের উন্নয়নের অন্যতম প্রধান কারিগর নারী। শুধু পোশাকশিল্পেই নয়, কৃষি ও অকৃষি খাতে, গৃহকর্মে ক্রমবর্ধমান হারে নারীর কর্মে নিযুক্তি বাংলাদেশে এই উন্নয়ন এনে দিয়েছে। নারীর ক্ষমতায়নই নারীবাদের মূলকথা কিন্তু সত্যিকার অর্থে এ দেশে কি নারীর ক্ষমতায়ন হয়েছে? সোজাসাপ্টা কথা: না, এ দেশে নারীর ক্ষমতায়ন হয়নি। নারী-পুরুষের মধ্যে মজুরি বৈষম্য, দুই পরিবারে, সমাজে, কর্মক্ষেত্রে ও রাষ্ট্রে সিদ্ধান্ত গ্রহণের ক্ষমতা। বস্তুত, সিদ্ধান্ত গ্রহণের ক্ষমতাই ক্ষমতায়নের মাপকাঠি। দুই ক্ষেত্রেই বাংলাদেশ এখনো অনেক পিছিয়ে।