'দ্য বেঙ্গল ফাইলস' সিনেমায় কলকাতা-নোয়াখালীর দাঙ্গা, ভারতের রাজনীতিতে উত্তাপ

ভূ-রাজনৈতিক ইতিহাস নিয়ে সিনেমা বানানোর জন্য বলিউড পরিচালক বিবেক অগ্নিহোত্রী বেশ পরিচিত। ২০২১ ও ২০২৩ সালে তার নির্মিত পরপর দু'টি সিনেমা “তাসখেন্দ ফাইলস” ও “দ্য কাশ্মীর ফাইলস” জাতীয় চলচ্চিত্র পুরস্কার পেয়েছে। তবে তার ফাইলস সিরিজের তৃতীয় সিনেমা “দ্য বেঙ্গল ফাইলস” মুক্তির আগেই ভারতের রাজনীতির মাঠে উত্তাপ ছড়িয়েছে। সিনেমাটি নিয়ে পক্ষে-বিপক্ষে অবস্থান নিয়েছে বিজেপি ও তৃণমূল কংগ্রেস।

জানা গেছে, দেশভাগের আগে ১৯৪৬ সালে কলকতায় সংঘটিত সাম্প্রদায়িক দাঙ্গা এবং এ ঘটনায় বর্তমান বাংলাদেশের নোয়াখালীতে সেই সময়কার উত্তাপ নিয়ে সিনেমাটি নির্মিত হয়েছে। আর এই বিষয়টি নিয়েই বিজেপি ও তৃণমূল কংগ্রেসের পক্ষে-বিপক্ষে অবস্থান।

“দ্য বেঙ্গল ফাইলস” সিনেমার পরিচালক বিবেক অগ্নিহোত্রী গত প্রায় মাসখানেক ধরে তার টুইটার ও ফেসবুক অ্যাকাউন্ট থেকে ১৯৪৬ সালের অক্টোবরে ঘটে যাওয়া নোয়াখালীর দাঙ্গা নিয়ে একের পর এক পোস্ট করছেন।

একটি পোস্টে তিনি লিখেছেন, “লক্ষ্মীপুজোর রাতে হিন্দু গণহত্যা সংঘটিত হয় গোলাম সারওয়ার ও তার ভাই ছোট মিঁয়ার ষড়যন্ত্রে।”

আরেকটি পোস্টে লিখেছেন, “গোলাম সরকারের হাড় হিম করা ফতোয়া: সুচেতা কৃপালনীকে ধর্ষণ করলেই মিলবে 'গাজী' খেতাব!”

বিবেক অগ্নিহোত্রী আরেকটি পোস্টে লিখেছেন, “নোয়াখালীতে কংগ্রেস নেতার বাড়িতে হামলা করে তার ছেলেকে খুন, জ্বালিয়ে দেওয়া হলো দলের অফিস।” এরকম বিভিন্ন পোস্ট দিচ্ছেন তিনি।

জানা গেছে, আগামী ৫ সেপ্টেম্বর ভারতে মুক্তি পেতে যাচ্ছে “দ্য বেঙ্গল ফাইলস”। সিনেমাটির প্রচারণার জন্যই সোশ্যাল মিডিয়ায় এমন পোস্ট দিচ্ছেন বিবেক অগ্নিহোত্রী।

প্রসঙ্গত, সুচেতা কৃপালনী ছিলেন মোহনদাস গান্ধীর অনুগামী তরুণ কংগ্রেস নেত্রী, যিনি দাঙ্গা ঠেকানোর মিশন নিয়ে তখন নোয়াখালীতে গিয়েছিলেন।

অন্যদিকে, গোলাম সারোয়ার হুসেইনি ছিলেন নোয়াখালীর শ্যামপুর দায়রা শরীফের গদ্দিনশীর পীর এবং নোয়াখালি কৃষক সমিতির অত্যন্ত প্রভাবশালী মুসলিম নেতা।

সংবাদমাধ্যম বিবিসি বাংলা এক প্রতিবেদনে উল্লেখ করেছে, “বিবেক অগ্নিহোত্রী সিনেমাটি তৈরি করেছেন ভারতে দেশভাগের ঠিক আগের বছর যেভাবে কলকাতায় ভয়াবহ দাঙ্গায় ('দ্য গ্রেট ক্যালকাটা কিলিং') হাজার হাজার হিন্দু ও মুসলিম প্রাণ হারিয়েছিলেন এবং সেই দাঙ্গার ঝড় আছড়ে পড়েছিল নোয়াখালীতে– সেই মর্মান্তিক কাহিনি নিয়ে।”

এদিকে পশ্চিমবঙ্গে তৃণমূল কংগ্রেস নেত্রী মমতা ব্যানার্জীর সরকার ইতোমধ্যেই ঘোষণা করেছে, রাজ্যে সিনেমাটি কোনো হলে প্রদর্শনের অনুমতি দেওয়া হবে না। অগ্নিহোত্রীর বিরুদ্ধে আইনি পদক্ষেপ নেবেন বলেও জানিয়েছেন মমতা।

অন্যদিকে, সিনেমাটির সমর্থনে সরব কেন্দ্রে ক্ষমতাসীন দল বিজেপি। দলটি বলছে, “এই সিনেমার মাধ্যমে দেশভাগের সময় বাংলার হিন্দুদের ওপর নির্মম অত্যাচার ও গণহত্যার ইতিহাস তুলে ধরা হয়েছে, যা এতদিন রূপালী পর্দায় কেউ বলার সাহসই দেখাতে পারেননি।”

তৃণমূল কংগ্রেসের যুক্তি, “সাম্প্রদায়িকতায় উসকানি দিয়ে এই সিনেমাটি পশ্চিমবঙ্গে রাজনৈতিক পরিবেশ বিষিয়ে তুলতে চাইছে – এবং আগামী বছর (২০২৬) রাজ্যে বিধানসভা নির্বাচনের ঠিক আগেই ছবিটি কেন মুক্তি পাচ্ছে, সেই উদ্দেশ্যটাও বোঝা কঠিন নয়।”

এদিকে, ভারতে এখনও মুক্তি না পেলেও পরিচালক বিবেক অগ্নিহোত্রীর বিরুদ্ধে সিনেমাটিতে ইতিহাস বিকৃতিরও অভিযোগ এনেছেন কেউ কেউ। এমনকি সিনেমার ট্রেলার নিয়েও তীব্র সমালোচনা হচ্ছে।

পাশাপাশি “দ্য বেঙ্গল ফাইলস” নির্মাতাদের পাশে দাঁড়িয়েও অনেকে পাল্টা যুক্তি দিচ্ছেন, “পশ্চিমবাংলা বাকস্বাধীনতা আর মুক্তচিন্তা নিয়ে এতো গর্ব করে – সেখানে কেন একজন পরিচালক তার সিনেমা দর্শকদের সামনে তুলে ধরতে পারবেন না?”

সব মিলিয়ে “দ্য বেঙ্গল ফাইলস” নিয়ে বিতর্ক এখন তুঙ্গে – আর এই আবহেই আবার সামনে চলে এসেছে ঠিক উনআশি বছর আগে অবিভক্ত বাংলার বুকে এক রক্তাক্ত ইতিহাস।

বিবিসি বাংলা জানিয়েছে, গতবছর যখন এই সিনেমাটির নির্মাণকাজ শুরু হয়, তখন এটির নাম ছিল “দিল্লি ফাইলস”। পরে নির্মাতারা এর নাম পাল্টে রাখেন “দ্য বেঙ্গল ফাইলস”। সিনেমাটির পটভূমি বাংলাকেন্দ্রিক বলেই নাম বদল করা হয় বলে জানান সিনেমার পরিচালক।

সিনেমাটিতে অভিনয় করেছেন মিঠুন চ্যাটার্জি, অনুপম খের, পল্লবী জোশী, শাশ্বত চ্যাটার্জি, প্রিয়াংশু চ্যাটার্জি, দর্শন কুমারের মতো তারকারা। কলকাতায় সেই সময় “গোপাল পাঁঠা” নামে যে চরিত্রটি দাঙ্গার সময় হাজার হাজার হিন্দুর প্রাণ রক্ষা করেছিলেন বলে  জানা যায়, সেই ভূমিকায় আছেন অভিনেতা সৌরভ দাস।

উল্লেখ্য, মাসখানেক ধরে নিউ জার্সি, শিকাগো, সান হোসে, সানফ্রান্সিসকো-সহ মার্কিন মুলুকের বিভিন্ন শহরে সিনেমাটির বিশেষ প্রিমিয়ার অনুষ্ঠিত হয়েছে। সেখানে প্রচুর সংখ্যায় ভারতীয় দর্শক উপস্থিত ছিলেন। গত ১৬ আগস্ট সিনেমাটির ট্রেলার প্রকাশ করা হয়।

সেদিন কলকাতার একটি মাল্টিপ্লেক্স চেইনে ছবিটির ট্রেলার লঞ্চ করার কথা থাকলেও শেষ মুহূর্তে “রাজনৈতিক চাপে”র কারণ দেখিয়ে কর্তৃপক্ষ সে অনুষ্ঠান বাতিল করে দেয় বলে জানিয়েছে বিবিসি বাংলা।

পরে শহরের একটি পাঁচতারা হোটেলে সে অনুষ্ঠানের আয়োজন করা হলেও কলকাতা পুলিশ মাঝপথে ঢুকে সেখানেও বাধা দেয়। পর্দায় ট্রেলার দেখানোর আগেই পাওয়ার কেবল-এর সংযোগ বিচ্ছিন্ন করে দেওয়া হয়। জব্দ করা হয় নির্মাতাদের একটি ল্যাপটপও।

পুলিশ পরে জানায়, এ ধরনের অনুষ্ঠানে কোনো ফিল্মের ট্রেলার দেখানোর জন্য আয়োজকদের যে “বিনোদন লাইসেন্স” থাকার কথা সেটা তারা দেখাতে পারেননি।

এই ঘটনা নিয়ে যথারীতি রাজনৈতিক দোষারোপ ও পাল্টা দোষারোপও শুরু হয়ে গেছে।

তৃণমূল কংগ্রেসের মুখপাত্র কুনাল ঘোষ সটান বলেন, "পশ্চিমবঙ্গে বেঙ্গল ফাইলস দেখানো যাবে না – কারণ প্রোপাগান্ডা ফিল্ম বানিয়ে রাজ্যে সাম্প্রদায়িকতার বিষ ছড়ানোর চেষ্টা রাজ্য সরকার কিছুতেই মেনে নেবে না।"

শুধু তাই নয়, পরিচালক বিবেক অগ্নিহোত্রীকে তিনি পরামর্শ দিয়েছেন – "বেঙ্গল ফাইলস বানানোর আগে গুজরাট দাঙ্গার সময় ধর্ষিতা বিলকিস বানানোর ঘটনা নিয়ে 'গুজরাট ফাইলস', কিংবা উত্তর প্রদেশের হাতরাস বা উন্নাও-এর নির্যাতিতা নারীদের নিয়ে 'ইউপি ফাইলস' আগে বানান ... তারপর না হয় বাংলায় ঢোকার সাহস দেখাবেন!"

সিনেমাটিতে ইতিহাস বিকৃতির অভিযোগ উঠছে কেন?

বিবিসি বাংলা বলছে, এই সিনেমার একটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ চরিত্র গোপাল পাঁঠা। যাকে দাঙ্গার সময় কলকাতায় “হিন্দুদের রক্ষাকর্তা” হিসেবে তুলে ধরা হয়েছে। সিনেমার ট্রেলার থেকেও সে রকমই আভাস মিলেছে।

গোপাল পাঁঠা ওরফে গোপাল মুখোপাধ্যায়ের বর্তমান প্রজন্মের উত্তরাধিকারীরা অভিযোগ করেছেন, সিনেমাটিতে তাকে যেভাবে একজন “মুসলিম-বিদ্বেষী কসাই” হিসেবে চিত্রিত করা হয়েছে, সেটা কোনো মতেই মানা যায় না।

গোপাল পাঁঠার পৌত্র শান্তনু মুখার্জি দ্য টাইমস অব ইন্ডিয়া পত্রিকাকে বলেছেন, তার পিতামহ দাঙ্গার সময় বহু মুসলিমেরও প্রাণ বাঁচিয়েছিলেন এবং বহু মুসলিমের সঙ্গেই তার দারুণ সম্পর্ক ছিল।

তবে বিবেক অগ্নিহোত্রীর অভিযোগ, শান্তনু মুখার্জী একজন “তৃণমূলের লোক”। দলের নির্দেশনা মানার বাধ্যবাধকতা থেকেই তাকে ওই মন্তব্য করতে হয়েছে।

তবে অগ্নিহোত্রীর “অতীত ট্র্যাক রেকর্ড” যা, তাতে তার ছবি নিয়ে সন্দেহ প্রকাশের অবকাশ থেকে যায় বলেই কোনো কোনো পর্যবেক্ষকের অভিমত।

তাছাড়া দেশভাগের আগে অবিভক্ত বাংলায় হিন্দু-মুসলিম দাঙ্গার বিষয়টি আজও এতই স্পর্শকাতর ও সংবেদনশীল একটি ইস্যু – সেটি খুব সতর্কতা ও সাবধানতার সঙ্গে “ডিল” করা উচিত বলেও অনেকে মনে করেন।

এ বিষয়ে দিল্লির রাজনৈতিক বিশ্লেষক সুকল্যাণ গোস্বামী বিবিসি বাংলাকে বলেন, "কাশ্মীর ফাইলসেও বহু জায়গাতেই তিনি সত্যের অপলাপ করেছেন, বা হিন্দুদের ওপর নির্যাতনের ঘটনাকে অতিরঞ্জিত করে দেখিয়েছেন।"

যখন একজন পরিচালক সমকালীন ইতিহাসের কোনো ঘটনা নিয়ে সিনেমা বানান, তখন নির্মাতার স্বাধীনতার নামে তার এরকম তথ্য বিকৃতির অধিকার থাকে না বলেই সুকল্যাণ গোস্বামীর অভিমত।

তাছাড়া সোশ্যাল মিডিয়াতে এর আগেও অগ্নিহোত্রী নানা ধরনের “ভুল তথ্য” ছড়িয়েছেন বলে অভিযোগ রয়েছে, যার কোনো কোনোটি তাকে প্রত্যাহারও করতে হয়েছে।