কলকাতা হাইকোর্ট: গরু কোরবানি ঈদ বা ইসলামের বাধ্যতামূলক অংশ নয়

ভারতে পবিত্র ঈদুল আজহায় প্রয়োজনীয় সনদপত্র ছাড়া ষাঁড়, বলদ, গরু, বাছুর ও মহিষ জবাইয়ের ওপর নিষেধাজ্ঞা বহাল রেখেছেন কলকাতা হাইকোর্ট। ভারতীয় সংবাদমাধ্যম ইন্ডিয়া টুডে এক প্রতিবেদনে এই তথ্য নিশ্চিত করেছে। রায় প্রদানের সময় আদালত তার পূর্ববর্তী পর্যবেক্ষণের কথা উল্লেখ করে পুনরায় জানান, ইসলাম ধর্মে গরু কোরবানি করা কোনো বাধ্যতামূলক ধর্মীয় প্রথা নয়।

বৃহস্পতিবার (২১ মে) প্রধান বিচারপতি জয় পাল এবং বিচারপতি পার্থ সারথি সেনের সমন্বয়ে গঠিত ডিভিশন বেঞ্চ এই সংক্রান্ত পশ্চিমবঙ্গ সরকারের জারি করা বিজ্ঞপ্তিতে হস্তক্ষেপ করতে অস্বীকৃতি জানান।

মামলার শুনানিতে আদালত পর্যবেক্ষণ করেন যে, গত ১৩ মে ২০২৬ তারিখে রাজ্য সরকার কর্তৃক জারি করা বিজ্ঞপ্তিটি মূলত ২০১৮ সালে হাইকোর্টের পূর্ববর্তী নির্দেশনারই একটি ধারাবাহিক বাস্তবায়ন। ফলে এই মুহূর্তে সরকারি এই বিজ্ঞপ্তি স্থগিত বা বাতিল করার মতো কোনো আইনি ভিত্তি নেই।

পশ্চিমবঙ্গ রাজ্য সরকারের ওই বিজ্ঞপ্তিতে স্পষ্ট বলা হয়েছে, ষাঁড়, বলদ, গরু, বাছুর ও মহিষের মতো পশু সুনির্দিষ্ট সনদপত্র ছাড়া কোনোভাবেই জবাই করা যাবে না। একই সঙ্গে নির্দেশনায় উল্লেখ করা হয়, শুধুমাত্র স্থানীয় কর্তৃপক্ষ কর্তৃক অনুমোদিত ও নির্ধারিত কসাইখানাতেই (স্লটার হাউস) এসব পশু জবাই করা যাবে।

অবৈধভাবে বা যত্রতত্র পশু জবাই ঠেকাতে প্রশাসন ও সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষকে বিভিন্ন স্থাপনা ও এলাকা পরিদর্শনের বিশেষ ক্ষমতা দেওয়া হয়েছে। আদালত আরও জানান, আইন অনুযায়ী প্রয়োজনীয় স্বাস্থ্য ও জবাই সংক্রান্ত সনদপত্র দেওয়ার জন্য পর্যাপ্ত অবকাঠামো এবং দায়িত্বপ্রাপ্ত কর্মকর্তা নিয়োজিত আছেন কিনা, তা খতিয়ে দেখার মূল দায়িত্ব সংশ্লিষ্ট রাজ্যের।

এই মামলায় তৃণমূল কংগ্রেসের বিধায়ক আখরুজ্জামান আদালতের সামনে যুক্তি প্রদর্শন করে বলেন, ঈদুল আজহার আগে রাজ্য সরকার ‘পশ্চিমবঙ্গ পশু জবাই নিয়ন্ত্রণ আইন’-এর ১২ ধারার অধীনে ধর্মীয় উদ্দেশ্যে পশু জবাইয়ের ক্ষেত্রে কোনো বিশেষ ছাড় বা অব্যাহতি দেয়নি। এর ফলে সাধারণ মুসলমানরা তাঁদের ধর্মীয় বিধান অনুযায়ী সহজে কোরবানি করতে সমস্যায় পড়বেন।

তিনি আরও দাবি করেন, পশ্চিমবঙ্গের অধিকাংশ সাধারণ মুসলমানের জন্য মহিষ, ষাঁড় বা বলদের মতো বড় পশু কোরবানি করা অর্থনৈতিকভাবে অনেক বেশি সাশ্রয়ী। কারণ ঈদের ঠিক আগে বাজারে ছাগল ও ভেড়ার দাম ব্যাপক হারে বেড়ে যায়, যা সবার পক্ষে বহন করা সম্ভব নয়।

বিপক্ষের যুক্তি খণ্ডন করে আদালত তাঁর পর্যবেক্ষণে উল্লেখ করেন, দেশের সর্বোচ্চ আদালত সুপ্রিম কোর্ট আগেই এক রায়ে পরিষ্কার করে দিয়েছেন যে, গরু কোরবানি করা ঈদুল আজহার কোনো অপরিহার্য অংশ নয় এবং ইসলামে এটি বাধ্যতামূলক ধর্মীয় কোনো প্রথাও নয়। হাইকোর্টের এই বেঞ্চ রাজ্য সরকারকে নির্দেশ দিয়েছেন, এই আইনি পর্যবেক্ষণটি যুক্ত করে মূল বিতর্কিত বিজ্ঞপ্তিটি সংশোধন করতে।

তবে আদালত একই সঙ্গে স্পষ্ট করে দিয়েছেন যে, আইনের ১২ ধারার অধীনে মুসলমানদের জন্য বিশেষ ছাড় দেওয়া হবে কিনা, সে বিষয়ে রাজ্য সরকার সম্পূর্ণ স্বাধীনভাবে আলাদা সিদ্ধান্ত নেওয়ার পূর্ণ অধিকার রাখে। কয়েকজন আবেদনকারীর পক্ষ থেকে যে বিশেষ ছাড় বা অব্যাহতি চাওয়া হয়েছে, সে বিষয়টি বিবেচনা করে আগামী ২৪ ঘণ্টার মধ্যে একটি চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নিতে পশ্চিমবঙ্গ রাজ্য সরকারকে নির্দেশ দিয়েছেন কলকাতা হাইকোর্ট।