এক দশক আগে পাকিস্তানকে আন্তর্জাতিকভাবে বিচ্ছিন্ন করার ঘোষণা দিয়েছিলেন ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি। ২০১৬ সালে ভারত-নিয়ন্ত্রিত কাশ্মীরে উরি হামলায় ১৮ ভারতীয় সেনা নিহত হওয়ার পর দক্ষিণ ভারতের কেরালা রাজ্যে এক সমাবেশে তিনি বলেছিলেন, “ভারত পাকিস্তানকে একঘরে করতে সফল হয়েছে এবং আমরা সেই প্রচেষ্টা আরও জোরদার করব।”
আন্তর্জাতিক সংবাদ মাধ্যম আল-জাজিরার একটি বিশেষ প্রতিবেদনে উঠে এসেছে অন্য রকমের চিত্র।
প্রতিবেদনে বলা হয়, পাকিস্তান বর্তমানে শুধু চীনের ঘনিষ্ঠ কৌশলগত মিত্রই নয়, বরং যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প প্রশাসনের কাছেও একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশীদার হিসেবে পুনরায় প্রতিষ্ঠিত হয়েছে।
সম্প্রতি পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী শাহবাজ শরিফ চীন সফর করেছেন। অন্যদিকে গত এক বছরে পাকিস্তানের সেনাপ্রধান ফিল্ড মার্শাল আসিম মুনির এবং প্রধানমন্ত্রী শাহবাজ শরিফ দুজনই হোয়াইট হাউসে প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পের সঙ্গে বৈঠক করেছেন। পাশাপাশি ইরান-যুক্তরাষ্ট্র চলমান সংকটে মধ্যস্থতাকারীর ভূমিকাও পালন করছে ইসলামাবাদ।
বিশ্লেষকদের মতে, ট্রাম্প প্রশাসনের সঙ্গে সম্পর্ক উন্নয়ন এবং আঞ্চলিক ভূরাজনৈতিক পরিবর্তনকে কাজে লাগিয়ে পাকিস্তান কূটনৈতিকভাবে নিজেদের অবস্থান শক্তিশালী করেছে। একই সঙ্গে ভারতের কিছু নীতিগত ভুলও পাকিস্তানের জন্য সুযোগ তৈরি করেছে।
২০২৫ সালের ১০ মে যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প ঘোষণা দেন যে, তার মধ্যস্থতায় ভারত ও পাকিস্তান পূর্ণাঙ্গ যুদ্ধবিরতিতে সম্মত হয়েছে।
এর আগে কাশ্মীরের পেহেলগামে সশস্ত্র হামলায় ২৬ পর্যটক নিহত হওয়ার পর ভারত পাকিস্তানের ভেতরে কথিত সন্ত্রাসী ঘাঁটিতে হামলা চালায়। পরবর্তীতে চার দিন ধরে দুই দেশের মধ্যে ক্ষেপণাস্ত্র, ড্রোন ও যুদ্ধবিমান ব্যবহার করে তীব্র সংঘর্ষ হয়।
যুদ্ধবিরতির ঘোষণার পর পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী শাহবাজ শরিফ ট্রাম্পকে ধন্যবাদ জানান। কিন্তু ভারত সরকার শুরু থেকেই দাবি করে আসছে, যুদ্ধবিরতি ছিল দুই দেশের মধ্যে সরাসরি আলোচনার ফল; এতে কোনো তৃতীয় পক্ষের ভূমিকা ছিল না।
তবে ট্রাম্প বারবার দাবি করেছেন, তিনিই যুদ্ধবিরতি নিশ্চিত করেছেন এবং সম্ভাব্য পারমাণবিক সংঘাত ঠেকিয়েছেন। এমনকি তিনি পাকিস্তানের দাবি অনুযায়ী কয়েকটি ভারতীয় যুদ্ধবিমান ভূপাতিত হওয়ার কথাও উল্লেখ করেন।
বিশ্লেষকদের মতে, আন্তর্জাতিক অঙ্গনে পেহেলগাম হামলায় পাকিস্তানের সম্পৃক্ততার বিষয়ে ভারত যথেষ্ট সমর্থন আদায় করতে পারেনি। ফলে বৈশ্বিক জনমত ও কূটনৈতিক বয়ানে পাকিস্তান তুলনামূলক সুবিধাজনক অবস্থানে ছিল।
প্রথম মেয়াদে ট্রাম্প পাকিস্তানকে “প্রতারণা ও মিথ্যার দেশ” বলে সমালোচনা করেছিলেন। কিন্তু সাম্প্রতিক সময়ে তিনি পাকিস্তানি নেতৃত্বের প্রশংসা করেছেন একাধিকবার।
বিশেষ করে সেনাপ্রধান আসিম মুনিরকে হোয়াইট হাউসে আমন্ত্রণ জানানো ভারতীয় কূটনৈতিক মহলে অস্বস্তির কারণ হয়ে ওঠে। কারণ, পাকিস্তানের কোনো সামরিক শাসক নন এমন সেনাপ্রধানকে মার্কিন প্রেসিডেন্টের এমন আনুষ্ঠানিক আমন্ত্রণ বিরল ঘটনা।
পাকিস্তান ট্রাম্পকে শান্তিতে অবদানের জন্য নোবেল শান্তি পুরস্কারের মনোনয়নও দিয়েছে, যা দুই দেশের সম্পর্ক আরও ঘনিষ্ঠ হওয়ার ইঙ্গিত হিসেবে দেখা হচ্ছে।
দীর্ঘদিন ভারত পাকিস্তানের প্রতি ‘কৌশলগত সংযম’ নীতি অনুসরণ করেছে। ২০০৮ সালের মুম্বাই হামলার পরও তৎকালীন কংগ্রেস সরকার সরাসরি সামরিক হামলা চালায়নি।
তবে নরেন্দ্র মোদির নেতৃত্বে ক্ষমতায় আসার পর ভারতের অবস্থান বদলাতে শুরু করে। ২০১৬ সালের উরি হামলার পর ভারত পাকিস্তান-নিয়ন্ত্রিত কাশ্মীরে ‘সার্জিক্যাল স্ট্রাইক’ চালায়। ২০১৯ সালে পুলওয়ামা হামলার পর পাকিস্তানের বালাকোটে বিমান হামলাও চালানো হয়।
মোদি সরকারের মূল বার্তা ছিল, “সন্ত্রাস ও আলোচনা একসঙ্গে চলতে পারে না।”
২০১৪ সালে প্রথমবার প্রধানমন্ত্রী হিসেবে শপথ নেওয়ার সময় দক্ষিণ এশিয়ার রাষ্ট্রপ্রধানদের আমন্ত্রণ জানিয়েছিলেন মোদি। তখন তিনি ‘নেইবারহুড ফার্স্ট’ নীতির কথা বলেছিলেন।
কিন্তু ২০১৬ সালের পর পাকিস্তানকে বিচ্ছিন্ন করার কৌশলের অংশ হিসেবে ভারত দক্ষিণ এশীয় আঞ্চলিক সহযোগিতা সংস্থা (সার্ক) সম্মেলন বর্জনের ঘোষণা দেয়। পাকিস্তানে অনুষ্ঠিত হওয়ার কথা থাকা ওই সম্মেলন বাতিল হয় এবং এরপর আর কোনো সার্ক শীর্ষ সম্মেলন অনুষ্ঠিত হয়নি।
পরবর্তীতে ভারত পাকিস্তানকে বাদ দিয়ে বিমসটেককে গুরুত্ব দিতে শুরু করে। তবে বিশ্লেষকদের মতে, সেটি এখনো সার্কের বিকল্প শক্তিশালী আঞ্চলিক প্ল্যাটফর্ম হয়ে উঠতে পারেনি।
ইসলামাবাদের কায়েদে-আজম বিশ্ববিদ্যালয়ের আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিভাগের অধ্যাপক ইশতিয়াক আহমদ বলেন, “পাকিস্তানকে বিচ্ছিন্ন করার চেষ্টায় ভারত কার্যত সার্ককে অকার্যকর করে ফেলেছে।”
বিশ্লেষকদের মতে, পাকিস্তানকে কূটনৈতিকভাবে একঘরে করার যে কৌশল ভারত এক দশক আগে গ্রহণ করেছিল, বর্তমান ভূরাজনৈতিক বাস্তবতায় সেটি প্রত্যাশিত ফল না দিয়ে উল্টো নতুন চ্যালেঞ্জ তৈরি করেছে। একই সঙ্গে দক্ষিণ এশিয়ার আঞ্চলিক সহযোগিতার ক্ষেত্রেও এর প্রভাব স্পষ্ট হয়ে উঠেছে।