গাজাগামী মানবিক সাহায্যবাহী নৌবহরের (ফ্লোটিলা) কর্মী ও ফিলিস্তিনপন্থী জার্মান অধিকারকর্মী অ্যানা লিডকে ইসরায়েলি হেফাজতে থাকার সময় ভয়াবহ যৌন নিপীড়ন ও ধর্ষণের শিকার হয়েছেন। ইসরায়েলের বন্দিশালায় তার ওপর চালানো এই বর্বরতার বিরুদ্ধে এবার দেশটির আদালতেই আইনি লড়াই শুরু করেছেন ২৫ বছর বয়সী এই তরুণী।
ব্রিটিশ সংবাদমাধ্যম দ্য গার্ডিয়ান-কে দেওয়া এক বিশেষ সাক্ষাৎকার এবং ইসরায়েলে দায়ের করা একটি ফৌজদারি অভিযোগ থেকে এই লোমহর্ষক নির্যাতনের তথ্য সামনে এসেছে।
লিডকের এই সাহসী পদক্ষেপের পর আরও অন্তত এক ডজন ফ্লোটিলা কর্মী ইসরায়েলি হেফাজতে যৌন নিপীড়নের অভিযোগ এনেছেন, যাদের অনেকেই নিরাপত্তার স্বার্থে নাম প্রকাশ করেননি।
অভিযোগপত্র থেকে জানা গেছে, ইউরোপ থেকে গাজাগামী ফ্লোটিলায় যোগ দেওয়া লিডকেসহ অন্য কর্মীদের ৮ অক্টোবর আন্তর্জাতিক জলসীমা থেকে আটক করে ইসরায়েলি বাহিনী। এরপর তাকে ইসরায়েলে নিয়ে গিয়ে পাঁচ দিন বন্দী রাখা হয়।
গিভন কারাগারে বন্দী থাকাকালীন তৃতীয়বারের মতো বেআইনিভাবে শরীর তল্লাশির (স্ট্রিপ-সার্চ) সময় নারী কারারক্ষীরা তাকে জোর করে হাঁটু গেড়ে বসতে বাধ্য করেন। লিডকে চিৎকার শুরু করলে তার মুখ চেপে ধরে তাকে ধর্ষণ করা হয়। লিডকে জানান, নির্যাতনের সময় কারাগারের বারান্দা থেকে আংশিক টানা একটি পর্দার ওপাশ থেকে পুরুষ রক্ষীদের হাসির শব্দ আসছিল। তার প্রবল ধারণা, পুরুষ রক্ষীরা সেই নির্যাতন দেখছিলেন এবং তা ভিডিও ধারণ করছিলেন।
লিডকে জানান, ফ্লোটিলা কর্মীদের ওপর এই যৌন সহিংসতার একমাত্র উদ্দেশ্য ছিল তাদের ভয় দেখানো। তিনি বলেন, “এটি স্পষ্ট যে তারা আমাদের মনোবল ভেঙে দিতে চায় এবং আমাদের চুপ করাতে চায়, যাতে আমরা আর কখনো ফিলিস্তিন নিয়ে কথা না বলি। কিন্তু আমার লজ্জা পাওয়ার কোনো কারণ নেই। আমরা চুপ থাকলে তারা অন্য কারও সঙ্গেও একই কাজ করবে।”
ইসরায়েলে কর্মরত ফিলিস্তিনি মানবাধিকার সংস্থা ‘আদালাহ’-এর আইনজীবী মুনা হাদ্দাদ এই ঘটনার সুষ্ঠু তদন্তের দাবি জানিয়ে ইসরায়েলের অ্যাটর্নি জেনারেল, কারা কর্তৃপক্ষ ও কারারক্ষী তদন্ত বিভাগের (ইয়াহাস) কাছে আনুষ্ঠানিক অভিযোগপত্র পাঠিয়েছেন।
আইনজীবী হাদ্দাদ বলেন, “গত প্রায় তিন বছর ধরে ফিলিস্তিনি বন্দীদের ওপর পদ্ধতিগতভাবে যৌন সহিংসতা ও ধর্ষণের মতো অপরাধ চালানো হচ্ছে। এখন এর মাত্রা আরও বেড়েছে এবং ফিলিস্তিনিদের প্রতি সংহতি জানানো বিদেশি নাগরিকদের ওপরও ইসরায়েল এই নির্যাতন শুরু করেছে। আমাদের লক্ষ্য হলো ইসরায়েলের এই ‘বিচারহীনতার সংস্কৃতি’কে চ্যালেঞ্জ করা।”
ইসরায়েলি কারাগারে বন্দীদের ওপর এমন অমানবিক নির্যাতন ও ধর্ষণের একাধিক অভিযোগের ভিত্তিতে গত মে মাসে জাতিসংঘ ইসরায়েলকে ‘সংঘাতকালীন যৌন সহিংসতার কালো তালিকায়’ যুক্ত করেছে। চলতি মাসে যুক্তরাজ্যও জাতিসংঘের নিরাপত্তা পরিষদে এ নিয়ে গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করেছে।
এদিকে, ফ্লোটিলা কর্মীদের দেওয়া অভিযোগের ভিত্তিতে অস্ট্রেলীয় পুলিশ ইতিমধ্যেই ঘটনার তদন্ত শুরু করেছে। অন্যদিকে, ফরাসি প্রসিকিউটররা ইসরায়েলি হেফাজতে তাদের নাগরিকদের ওপর নির্যাতনের অভিযোগে সরাসরি ‘যুদ্ধাপরাধের’ তদন্ত শুরু করেছেন।
লজ্জা ও ট্রমা ভেঙে অ্যানা লিডকে এখন ইসরায়েলি কারাগারে বন্দী হাজারো ফিলিস্তিনি ও মানবাধিকার কর্মীদের কণ্ঠস্বরে পরিণত হয়েছেন। তিনি স্পষ্ট করে বলেন, “এটি কেবল আমার ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতা নয়, এটি ইসরায়েলি কারাগারের একটি নিয়মিত নিয়মে পরিণত হয়েছে। আমি একজন রাজনৈতিক সচেতন নারী হিসেবে এর বিরুদ্ধে লড়াই চালিয়ে যাব।”