পুরুষ সহকর্মীর শর্টসে অস্বস্তি, আলোচনায় ‘লেগ হেয়ার হ্যারাসমেন্ট’

ইউরোপ ও যুক্তরাষ্ট্রের মতো জাপানেও গ্রীষ্মকালে তাপমাত্রা অস্বাভাবিকভাবে বেড়ে গেছে। এমন পরিস্থিতিতে গরম থেকে একটু স্বস্তি পেতে দেশটিতে কর্মক্ষেত্রে অফিসে পুরুষ সহকর্মীরা পরে আসছেন শর্টস। আর তাতেই প্রবল অস্বস্তিতে পড়েছেন জাপানি নারীরা। অভিযোগ তুলেছেন ‘লেগ হেয়ার হ্যারাসমেন্ট’ !

সম্প্রতি ‘কুল বিজ’ নামক উদ্যোগ নিয়েছে জাপান সরকার। চিরাচরিত ‘স্যালারিমান’ বা কর্পোরেট পোশাক ছেড়ে এই গ্রীষ্মে শর্টস ও পোলো শার্ট পরার আহ্বান জানানো হয় পুরুষদের।  

আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যম দ্য টেলিগ্রাফ-এর প্রতিবেদনে এমন তথ্য তুলে ধরা হয়েছে।

কিন্তু অফিসে পুরুষদের এই অনাবৃত পায়ের উপস্থিতি বিতর্কের ঝড় তুলেছে। সহকর্মীদের লোমশ পা দেখতে বাধ্য হওয়ায় নারীদের মধ্যে যে অস্বস্তি তৈরি হয়েছে, তা বোঝাতে জাপানি সংবাদমাধ্যমে জন্ম নিয়েছে নতুন শব্দবন্ধ ‘সুনে-হারা’, যার অর্থ ‘লেগ হেয়ার হ্যারাসমেন্ট’।

৫২ বছর বয়সি রিয়েল এস্টেট এজেন্ট সাচি কোইকে সংবাদমাধ্যম এএফপিকে বলেন, “লোমশ পা দেখতে মোটেও পরিচ্ছন্ন লাগে না আমার কাছে।”

জাপানে গ্রীষ্মের দাবদাহ ক্রমেই অসহনীয় হয়ে উঠছে। গত আগস্টেই থার্মোমিটারের পারদ ছুঁয়েছিল রেকর্ড ৪১.৮ ডিগ্রি সেলসিয়াস। তাপমাত্রা ৪০ ডিগ্রি সেলসিয়াস ছাড়ালে সতর্কবার্তা দিতে এ বছর একটি নতুন ক্যাটাগরিই চালু করেছে জাপানের আবহাওয়া দপ্তর। এ অবস্থার নাম দেওয়া হয়েছে ‘কোকুশোবি’, অর্থাৎ নির্মম গরমের দিন।

গত বুধবার টানা দ্বিতীয় দিনের মতো এই চরম সতর্কতা জারি করা হয়। জাপানের ফায়ার অ্যান্ড ডিজাস্টার ম্যানেজমেন্ট এজেন্সির সাম্প্রতিক তথ্যমতে, ৬ থেকে ১২ জুলাই মাত্র এক সপ্তাহের ব্যবধানে হিটস্ট্রোকে আক্রান্ত হয়ে হাসপাতালে ভর্তি হয়েছেন ৪,৫৮০ জন এবং প্রাণ হারিয়েছেন সাতজন।

গরম মোকাবিলা করত এপ্রিলে ‘টোকিও কুল বিজ’ উদ্যোগ চালু করেন টোকিওর গভর্নর ইউরিকো কোইকে। ২০০৫ সালে পরিবেশমন্ত্রী থাকাকালীন এরকমই একটি পরিকল্পনার সূচনা করেছিলেন তিনি।

ওই সময় এক সংবাদ সম্মেলনে তিনি বলেছিলেন, “গরমে মানুষ একে একে গায়ের সব পোশাকই প্রায় কমিয়ে ফেলেছে। পরিস্থিতি এখন এমন পর্যায়ে এসে ঠেকেছে যে, শর্টস পরা ছাড়া আর কোনো উপায় নেই।”

এই পরিবর্তন যদিও ধীরগতিতে হচ্ছে, তবে ব্যবসায়ীদের শর্টস বিক্রি বেড়েছে চোখে পড়ার মতো। জাপানের প্রথম সারির পোশাক বিক্রেতা প্রতিষ্ঠান ইয়োফুকু নো আওইয়ামা বাজারে এনেছে অফিসে পরার উপযোগী ‘কুল বিজ’ কালেকশনই । হালকা  কাপড়, মার্জিত রং আর ফর্মাল কাটের মিশেলে তৈরি হয়েছে এই পোশাক।

প্রতিষ্ঠানটির মুখপাত্র ইউই হামানো নিউইয়র্ক টাইমসকে বলেন, “প্যান্টের ঝুল কতটুকু হবে, সেদিকে আমরা কড়া নজর রেখেছি। এমনভাবে নকশা করা হয়েছে যাতে পা খুব বেশি অনাবৃত না থাকে।”

তিভে জাপানের লেজার হেয়ার রিমুভাল সেবাদানকারী প্রতিষ্ঠান গরিলা ক্লিনিকের এক সমীক্ষায় উঠে এসেছে, সমীক্ষায় অংশ নেওয়া ৫৩.৫% মানুষই কর্মক্ষেত্রে শর্টস পরার বিরোধিতা করেছেন।

নতুন এই ড্রেস কোড নিয়ে বিরক্ত এক নারী বলেন, “মাঝবয়সি পুরুষদের কাছে আমার অনুরোধ, দয়া করে শর্টস পরবেন না। এটা আমাকে চরম অস্বস্তিতে ফেলে। দয়া করে আপনাদের পায়ের লোমশ গোছা বের করে রাখবেন না। আমি ওগুলো দেখতে চাই না।”

কাগজে-কলমে এই নিয়ম সবার জন্য প্রযোজ্য হলেও অনেক নারীর অভিযোগ, এখনও তাদের পাতলা টাইটস বা লম্বা স্কার্ট দিয়ে পা ঢেকে রাখার অলিখিত সামাজিক চাপে থাকতে হয়।

জাপানের চুবু ইউনিভার্সিটির ফরাসি সাহিত্যের অধ্যাপক আতসুকো তামাদা বলেন, “রূপচর্চা ও পরিপাটি পোশাকের পেছনে সময় ও অর্থ ব্যয় করার জন্য নারীদের ওপর আগে থেকেই বিরাট সামাজিক চাপ রয়েছে। এখন পুরুষদের যদি অফিসে শর্টস বা স্যান্ডেল পরে আসার জন্য উৎসাহ দেওয়াই হয়, তবে কি পরিপাটি থাকার সেই একই মানদণ্ড তাদের ক্ষেত্রেও প্রযোজ্য হওয়া উচিত নয়?”

এই তীব্র গরমে জনসাধারণকে পর্যাপ্ত পানি পান করার এবং এয়ার কন্ডিশনার ব্যবহারের পরামর্শ দিচ্ছে প্রশাসন। তবে মধ্যপ্রাচ্যে যুদ্ধ পরিস্থিতির কারণে ব্যাহত হচ্ছে জ্বালানি সরবরাহ, ফলে বাড়ছে দাম।

পোশাকের এই পরিবর্তনের মাধ্যমে বিদ্যুতের ব্যবহার কিছুটা হলেও কমানো যাবে বলে আশা করছে জাপান সরকার।