টেকসই উন্নয়ন, জীববৈচিত্র্য রক্ষা ও বন্য প্রাণী সংরক্ষণে অবদানের স্বীকৃতিস্বরূপ ভারতের তেল ও গ্যাস খাতের ধনকুবের পরিবার রিলায়েন্স ইন্ডাস্ট্রিজের উত্তরাধিকারী অনন্ত আম্বানিকে টেকসই উন্নয়ন বিষয়ক ‘প্রফেসরশিপ অব প্র্যাকটিস’ পদ প্রদান করেছে যুক্তরাজ্যের মর্যাদাপূর্ণ নিউক্যাসল বিশ্ববিদ্যালয়। তবে আন্তর্জাতিকভাবে বিতর্কিত এক শিল্পগোষ্ঠীর উত্তরাধিকারীকে প্রাতিষ্ঠানিক মর্যাদায় ভূষিত করার এই সিদ্ধান্ত বিশ্বজুড়ে বুদ্ধিজীবী, পরিবেশবিদ এবং বিশ্ববিদ্যালয়ের নিজস্ব শিক্ষক-কর্মচারীদের মধ্যে তীব্র সমালোচনা ও বিতর্কের জন্ম দিয়েছে।
অনন্ত আম্বানি ভারতের শীর্ষ ধনকুবের মুকেশ আম্বানির ছোট ছেলে। মুকেশ আম্বানির তেল ও গ্যাস ব্যবসার পাশাপাশি রিলায়েন্স ইন্ডাস্ট্রিজের অধীনে বিশ্বের সর্ববৃহৎ তেল শোধনাগার পরিচালিত হয়। ৩১ বছর বয়সী অনন্ত আম্বানি বর্তমানে রিলায়েন্সের নবায়নযোগ্য জ্বালানি বিভাগের প্রধান হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন। গুজরাটের জামনগরে তাদের তেল শোধনাগারের কাছে ৩,৫০০ একর এলাকাজুড়ে গড়ে তোলা হয়েছে ‘ভান্তারা’ নামে এক বিশাল ব্যক্তিগত চিড়িয়াখানা ও বন্য প্রাণী পুনর্বাসন কেন্দ্র, যেখানে ১ লাখ ৫০ হাজারের বেশি প্রাণী রয়েছে।
নিউক্যাসল বিশ্ববিদ্যালয়ের এই সিদ্ধান্তের কড়া সমালোচনা করেছেন ভারতের প্রখ্যাত বুদ্ধিজীবী ও ইতিহাসবিদ রামচন্দ্র গুহ। এটিকে ‘রহস্যজনক ও বিভ্রান্তিকর পছন্দ’ হিসেবে আখ্যা দিয়ে তিনি বলেন, “ভারতসহ সারা বিশ্বে পরিবেশ বিজ্ঞানে অবদান রাখা অন্তত ৫০ থেকে ১০০ জন বিজ্ঞানী ও গবেষক রয়েছেন, যাঁরা প্রাতিষ্ঠানিক স্বীকৃতির জন্য আরও বেশি যোগ্য। এটি বিশ্ববিদ্যালয়ের বুদ্ধিবৃত্তিক মর্যাদা ও বিশ্বস্ততাকে প্রশ্নবিদ্ধ করবে।”
যুক্তরাজ্যের সাসেক্স বিশ্ববিদ্যালয়ের জলবায়ু বিশেষজ্ঞ অধ্যাপক লায়লা মেহতা উদ্বেগ প্রকাশ করে জানান, সরকারি অর্থায়ন কমে যাওয়ায় করপোরেট ও ধনকুবেরদের অর্থ শিক্ষা ও গবেষণার স্বাধীনতার ওপর নেতিবাচক প্রভাব ফেলছে। শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের মূল কাজ করপোরেট ক্ষমতাকে প্রশ্নবিদ্ধ করা, তাদের একাডেমিক স্বীকৃতি দেওয়া নয়। একই ধরনের অসন্তোষ প্রকাশ করেছেন নিউক্যাসল বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক ও কর্মীদের সংগঠন ‘ইউনিভার্সিটি অ্যান্ড কলেজ ইউনিয়ন’-এর প্রতিনিধিরাও।
অনন্ত আম্বানির এই নিয়োগকে ঘিরে বিতর্কের অন্যতম মূল কারণ তার পরিচালিত ‘ভান্তারা’ চিড়িয়াখানায় প্রাণী সংগ্রহের স্বচ্ছতা। বিভিন্ন আন্তর্জাতিক সংস্থা ও আন্তর্জাতিক গণমাধ্যমের অনুসন্ধানে উঠে আসে, ভান্তারায় আনা অনেক বিলুপ্তপ্রায় প্রাণী গণতান্ত্রিক কঙ্গো প্রজাতন্ত্র (ডিআর কঙ্গো) ও সংযুক্ত আরব আমিরাতের মাধ্যমে আনা হয়েছে, যেখানে আন্তর্জাতিক বন্য প্রাণী পাচার চক্র অত্যন্ত সক্রিয়।
বিপন্ন প্রজাতির প্রাণী বাণিজ্য তদারককারী জাতিসংঘের সংস্থা 'সাইটিস'-এর এক প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়, ভান্তারায় প্রাণী আমদানিতে ব্যবহৃত কয়েকটি ছাড়পত্র সম্ভবত জাল ছিল। যদিও আম্বানি পরিবার ও ভান্তারা কর্তৃপক্ষ সবসময়ই অবৈধ পাচারের অভিযোগ অস্বীকার করে দাবি করেছে, প্রাণীদের উদ্ধার ও সঠিক সেবা প্রদানই তাদের মূল লক্ষ্য।
বিতর্ক থাকা সত্ত্বেও বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ তাদের সিদ্ধান্ত সমর্থনে জানিয়েছে, বন্য প্রাণী ও পরিবেশ রক্ষায় অনন্ত আম্বানির কাজের স্বীকৃতি হিসেবেই এই পদ দেওয়া হয়েছে। অন্যদিকে পরিবেশবিদদের মতে, জলবায়ু সংকটের মুখে দাঁড়িয়ে জীবাশ্ম জ্বালানি ব্যবসার সাথে যুক্ত ধনকুবেরদের এভাবে মূলধারার শিক্ষায় প্রতিষ্ঠিত করার প্রয়াস উচ্চশিক্ষার নিরপেক্ষতা নিয়ে বড় প্রশ্ন তুলে ধরল।