দক্ষিণ-পশ্চিম মৌসুমি বায়ু বিদায় নেওয়ার সঙ্গে সঙ্গে দিল্লি-এনসিআরে শীতকালীন বায়ুদূষণ বাড়ার আশঙ্কা তৈরি হয়েছে। এ পরিস্থিতি মোকাবিলায় স্থায়ী একটি প্রাতিষ্ঠানিক কর্মপরিকল্পনা চূড়ান্ত করতে সোমবার (২৮ সেপ্টেম্বর) বৈঠক করেছে ভারত সরকার।
কেন্দ্রীয় পরিবেশমন্ত্রী ভূপেন্দ্র যাদবের সভাপতিত্বে অনুষ্ঠিত বৈঠকে উপস্থিত ছিলেন দিল্লির মুখ্যমন্ত্রী রেখা গুপ্তা, পরিবেশমন্ত্রী মণিন্দর সিরসা এবং বায়ুমান ব্যবস্থাপনা কমিশনের (সিএকিউএম) ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা।
ভারতীয় সংবাদমাধ্যম দ্য হিন্দু-এর প্রতিবেদনে এ তথ্য জানানো হয়েছে।
বৈঠক শেষে ঘোষিত পরিকল্পনায় বলা হয়েছে, আগামী ১ নভেম্বর থেকে দিল্লির বাইরে নিবন্ধিত যেসব গাড়ি বিএস-সিক্স নির্গমন মানদণ্ড পূরণ করে না, সেগুলো রাজধানীতে প্রবেশে বিধিনিষেধের মুখে পড়বে। একই সময়ে সরকারি ও বেসরকারি অফিসের ৫০% কর্মীকে বাসা থেকে কাজ করতে হবে। ২০২৪ ও ২০২৫ সালেও একই ধরনের ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছিল।
গাড়ির দূষণ কমাতে ‘পলিউশন আন্ডার কন্ট্রোল সার্টিফিকেট (পিইউসিসি) ছাড়া জ্বালানি নয়’ নামে অভিযান চালানো হবে। অর্থাৎ বৈধ দূষণ নিয়ন্ত্রণ সনদ না থাকলে কোনো গাড়িতে জ্বালানি দেওয়া হবে না। স্বয়ংক্রিয় নম্বরপ্লেট শনাক্তকরণ প্রযুক্তি থাকা দিল্লির ৫০০ জ্বালানি স্টেশনেই এ নিয়ম কার্যকর হবে।
বৈঠকে উপস্থাপিত তথ্যে বলা হয়, গত ১২ মাসে এই প্রযুক্তির মাধ্যমে প্রায় ৭,০৫৫টি বিএস-থ্রি ও আয়ুষ্কাল শেষ হয়ে যাওয়া পুরোনো গাড়ি শনাক্ত করা হয়েছে।
এসব বিধিনিষেধ ২০২৬ সালের ১ নভেম্বর থেকে ২০২৭ সালের ৩১ জানুয়ারি পর্যন্ত কার্যকর থাকবে। এ সময় অনুমোদিত পার্কিং এলাকায় পার্কিং ফি দ্বিগুণ করা হবে। তবে দিল্লি মেট্রোরেল কর্পোরেশনের নিজস্ব মালিকানা ও ব্যবস্থাপনায় থাকা পার্কিংয়ের ক্ষেত্রে এ নিয়ম প্রযোজ্য হবে না।
দূষণ কমানোর পরিকল্পনার অংশ হিসেবে সরকারি অফিসের সময়সূচিও আলাদা করা হয়েছে। দিল্লি মিউনিসিপ্যাল করপোরেশনের অফিস সকাল সাড়ে ৮টা থেকে বিকেল ৫টা পর্যন্ত এবং দিল্লি সরকারের অফিস সকাল ১০টা থেকে সন্ধ্যা সাড়ে ৬টা পর্যন্ত চলবে।
এছাড়া আগামী ১০ ডিসেম্বর থেকে ২০২৭ সালের ২০ জানুয়ারি পর্যন্ত সব ধরনের নির্মাণ ও ভাঙার কাজ পুরোপুরি বন্ধ থাকবে। ধুলা তৈরি করে এমন ভাঙার কাজ এবং বাইরের সাধারণ নির্মাণকাজ ১ নভেম্বর ২০২৬ থেকে ৩১ জানুয়ারি ২০২৭ পর্যন্ত বন্ধ রাখা হবে।
সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এক্সে দেওয়া এক পোস্টে ভূপেন্দ্র যাদব বলেন, “বায়ুর মান উন্নয়নের জন্য নির্দিষ্ট ঝুঁকিপূর্ণ স্থানগুলোতে লক্ষ্যভিত্তিক ব্যবস্থা, সমন্বিতভাবে তা কার্যকর করা, নাগরিকদের অংশগ্রহণ এবং নিয়মিত পর্যালোচনা গুরুত্বপূর্ণ।”
দিল্লিতে সড়ক সংস্কারেও বড় লক্ষ্যমাত্রা নেওয়া হয়েছে। গত তিন বছরে বছরে গড়ে প্রায় ১,০০০ কিলোমিটার রাস্তা সংস্কার করা হলেও ২০২৬ সালে ৩,০৬৫ কিলোমিটার রাস্তা সংস্কারের লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়েছে। ২০ সেপ্টেম্বর পর্যন্ত ১,১৯৩ কিলোমিটারের কাজ শেষ হয়েছে। বাকি রয়েছে ১,৮৭২ কিলোমিটার। সিমেন্ট-কংক্রিটের কাজ ৩১ অক্টোবর এবং বিটুমিনের কাজ ১৫ নভেম্বরের মধ্যে শেষ করার লক্ষ্য রয়েছে।
দিল্লিতে প্রতিদিন প্রায় ১৩,৫০০ টন কঠিন বর্জ্য উৎপন্ন হয়। এর মধ্যে প্রক্রিয়াজাত করা হয় ৭,৬৪২ টন। তবে অক্টোবরের মধ্যে নতুন ব্যবস্থার মাধ্যমে দৈনিক আরও ৫,৯০০ টন বর্জ্য প্রক্রিয়াজাত করার সক্ষমতা তৈরি হবে বলে আশা করা হচ্ছে। একইসঙ্গে যান্ত্রিকভাবে সড়ক পরিষ্কারের কাজে ব্যবহৃত গাড়ির সংখ্যা ২০২৫ সালের ৭৬ থেকে বাড়িয়ে ৯৮ করা হয়েছে।
অলাভজনক সংস্থা এনভায়রনমেন্টাল ডিফেন্স ফান্ডের ভারতবিষয়ক প্রধান উপদেষ্টা হিশাম মুন্ডোল দ্য হিন্দুকে বলেন, সারা বছর নির্মল বাতাস নিশ্চিত করাই লক্ষ্য হওয়া উচিত। এজন্য পরিবহন, শিল্পকারখানা, নির্মাণ, বর্জ্য ব্যবস্থাপনা এবং ফসলের অবশিষ্টাংশ পোড়ানোর বিষয়ে ধারাবাহিক ব্যবস্থা নেওয়ার প্রয়োজন রয়েছে। তার মতে, এ ধরনের পরিকল্পনা শুধু দিল্লিকে কেন্দ্র করে নয়, পুরো অঞ্চলকে বিবেচনায় নিয়ে করা উচিত।
শিল্পকারখানায় দূষণ নিয়ন্ত্রণে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তাসম্পন্ন কমান্ড অ্যান্ড কন্ট্রোল সেন্টারের মাধ্যমে নজরদারি ও নিয়ম প্রয়োগ আরও জোরদার করা হবে। বায়ুর মান পর্যবেক্ষণের স্টেশনের সংখ্যা ৪৭ থেকে বাড়িয়ে ৬০ করা হয়েছে। পাশাপাশি গঠন করা হয়েছে ৩৩৪টি প্রয়োগকারী দল।
উপস্থাপিত তথ্যে বলা হয়, ২০২৫ সালের ডিসেম্বর থেকে ২০২৬ সালের ২৬ সেপ্টেম্বর পর্যন্ত ১১,২৭১টি শিল্পকারখানায় জরিপ চালানো হয়েছে। এর মধ্যে দূষণকারী ২,২৮৩টি কারখানা বন্ধ বা সিলগালা করা হয়েছে।
পরিকল্পনায় আরও রয়েছে ঝুঁকিপূর্ণ স্থানগুলোতে সাপ্তাহিক পরিদর্শন, স্থানীয় দূষণ নিয়ে নাগরিকদের অভিযোগ জানানোর ব্যবস্থা, নাগরিকদের পরামর্শ নেওয়ার জন্য নতুন পোর্টাল চালু এবং প্রতিদিন সন্ধ্যায় বায়ুমান সূচক (একিউআই) প্রকাশ। এছাড়া ‘এয়ারশেড’ বা বায়ু অঞ্চলভিত্তিক পদ্ধতিতে এনসিআরের বিভিন্ন শহরের সঙ্গে সমন্বিতভাবে দূষণ নিয়ন্ত্রণের উদ্যোগ নেওয়া হবে।
সোমবার দিল্লির মুখ্যমন্ত্রীর কার্যালয় (সিএমও) জানিয়েছে, নির্ধারিত আয়ুষ্কাল পার হয়ে যাওয়া গাড়িতে ফিলিং স্টেশনগুলো থেকে আর জ্বালানি দেওয়া হবে না। পেট্রলচালিত গাড়ির ক্ষেত্রে নির্ধারিত আয়ু ১৫ বছর এবং ডিজেলচালিত গাড়ির ক্ষেত্রে ১০ বছর। তবে এই নিয়ম কবে থেকে কার্যকর হবে, তা সিএমও নির্দিষ্ট করে জানায়নি।